Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

শ্রমিক অসন্তোষ, হামলা-ভাঙচুর

পোশাকশিল্পে উৎপাদন ক্ষতি ১৫০০ কোটি টাকা

Advertisement

সাদ্দাম হোসেন ইমরান

সাদ্দাম হোসেন ইমরান

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পোশাকশিল্পে উৎপাদন ক্ষতি ১৫০০ কোটি টাকা

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

শ্রমিক অসন্তোষ, কারখানায় হামলা-ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা থেকে পিছলে যাচ্ছে পোশাকশিল্প। বারবার এমন পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিকবাজারে বাংলাদেশের ইমেজ ক্রমাগত ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বাড়ছে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকি। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে নতুন ক্রয়াদেশ, রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে। শুধু গত ৩ দিনে পোশাক খাতে উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৫৫৯ কোটি টাকার।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো যখন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। চলমান অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে শুধু তাৎক্ষণিক উৎপাদন ক্ষতিই নয়, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বাজার অন্য দেশের দখলে চলে যেতে পারে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই অস্থিরতার প্রভাব এখন কারখানার সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সিদ্ধান্তেও পড়তে শুরু করেছে। বিদেশি ক্রেতারা উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহের সময়সূচি জানতে চাইছেন। কোনো কোনো ক্রেতা আগামী ২ মাসের ক্রয়াদেশ কমানোর চিন্তা করছেন। এমনকি বাংলাদেশের কিছু ক্রয়াদেশ ভারত, পাকিস্তানসহ প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাওয়ার তথ্যও জানিয়েছেন তারা।

তাদের মতে, রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে এক দিনের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অর্থ শুধু ওই দিনের পণ্য উৎপাদন না হওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কাঁচামাল, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ-গ্যাস, ব্যাংক ঋণের সুদ, জাহাজীকরণ এবং ক্রেতার নির্ধারিত সময়সীমা। উৎপাদন পিছিয়ে গেলে পরবর্তী ক্রয়াদেশের কাজও বাধাগ্রস্ত হয়। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে বাড়তি খরচে আকাশপথে পণ্য পাঠাতে হয়। অন্যথায় ক্রেতার কাছ থেকে মূল্যছাড় বা ক্রয়াদেশ বাতিলের ঝুঁকি তৈরি হয়। একবার কোনো ক্রেতা অন্য দেশে উৎপাদন সরিয়ে নিলে তাকে আবার বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। বিশ্বের তৈরি পোশাকের বাজারে বাংলাদেশ এককভাবে ব্যবসা করছে না। ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও ক্রেতা আকর্ষণে প্রতিযোগিতা করছে। বিশেষ করে উৎপাদন ব্যয়, সরবরাহের সক্ষমতা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা রয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে বারবার উৎপাদন বন্ধ, সড়ক অবরোধ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে নেতিবাচক বার্তা যায়। ক্রেতারা শুধু পণ্যের দাম বিবেচনা করেন না, নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাওয়া যাবে কিনা, কারখানার উৎপাদন অব্যাহত থাকবে কিনা এবং শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হবে কিনা, তাও বিবেচনায় নেন।

বিজিএমইএর তথ্যমতে, ১ থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত তিন দিনে পোশাক খাতে রপ্তানি মূল্য বাবদ আনুমানিক ৮৫৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ৪৬১টি কারখানা বন্ধ থাকার কারণে এ ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে। আর বিকেএমইএ বলছে, গত ৩ দিনে আনুমানিক ৭০০ কোটি টাকার উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে।

বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিক আন্দোলনের যৌক্তিকতা নেই। এখন শ্রমিক আন্দোলনের নামে শুধু নৈরাজ্য-তাণ্ডব চালানো হচ্ছে। দেশের সম্পদের ক্ষতি করা হচ্ছে। সাধারণ শ্রমিকরা এর সঙ্গে জড়িত নন। একটা কথা শ্রমিকদের মনে রাখতে হবে-শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, শিল্প না বাঁচলে শ্রমিক বাঁচবে না। তিনি আরও বলেন, কিছুদিন পরপর এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্প বন্ধ হতে বাধ্য। মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে বিদেশি ক্রেতারা তাদের উদ্বেগ জানিয়েছেন। অর্ডার স্থানান্তরের আলোচনাও চলছে। মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত ৩ দিনের আন্দোলনে নিট গার্মেন্টসের আনুমানিক ৭০০ কোটি টাকার মতো উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে। উৎপাদন ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু দেশের ইমেজ সংকটের দায় কে নেবে?

বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, নারায়ণগঞ্জে সকাল থেকে সুষ্ঠুভাবে শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন। লাঞ্চের বিরতির পর শিবু মার্কেট এলাকায় কয়েকটি গার্মেন্টসের শ্রমিক আন্দোলন শুরু করলে পার্শ্ববর্তী গার্মেন্টসের শ্রমিকরাও এতে যোগ দেন। তবে অনেক কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল। তিনি আরও বলেন, এ ধরনের শ্রমিক আন্দোলনে উৎপাদন ক্ষতির চাইতে বেশি ক্ষতি হয় ইমেজের। বিদেশি ক্রেতাদের কাছে দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বার্তা যায়। যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পড়ে। ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের প্রভাব এখন দেখা যাচ্ছে গার্মেন্টস শিল্পে। তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ বছর পণ্য রপ্তানি বাড়লেও আয় কমেছে। অর্থাৎ ওজনে রপ্তানি বেড়েছে, কিন্তু টাকার অঙ্কে কমেছে।

শামীম এহসান বলেন, নানা ইস্যুতে শ্রমিক আন্দোলনের কারণে বাংলাদেশকে বিদেশি ক্রেতারা ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন। এ কারণে উচ্চ মূল্যের বা বিলাসবহুল পোশাকের অর্ডার দেওয়া কমিয়ে দিচ্ছেন। সাধারণ বা কম দামের পোশাকের অর্ডার দিচ্ছেন। এখন কারখানাগুলো আগামী শীত মৌসুমের অর্ডার গ্রহণ করছে। অনেক ক্রেতা অর্ডার দিতে সংকোচবোধ করছেন। তারা নানাভাবে সময়মতো অর্ডার জাহাজীকরণের নিশ্চয়তা চাচ্ছেন। তাই বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ রক্ষায় সরকার, মালিক, শ্রমিক-সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, শ্রমিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। এখন মজুরি বোর্ডকে কাজ করার সময় দিতে হবে। যদি মজুরি বোর্ডের সুপারিশে শ্রমিকদের দাবি প্রতিফলিত না হয়, তাহলে আবারও আন্দোলনে নামা হবে। কিন্তু এখন যা হচ্ছে, তাতে বাইরে থেকে কেউ ইন্ধন দিচ্ছে বলে মনে হয়। কারণ কারখানা হচ্ছে শ্রমিকের রুটি-রুজির জায়গা। কোনো শ্রমিকই তার রুটি-রুজির জায়গায় আগুন দিতে পারে না। তিনি আরও বলেন, বহির্বিশ্বে শিল্পের ইমেজ সম্পর্কে শ্রমিকদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। কেননা আন্দোলনের কারণে ক্রেতারা অর্ডার স্থানান্তর করলে দিনশেষে সবার ক্ষতি হবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

পোশাক খাতে অস্থিরতা ১৪৪ উসকানিদাতা চিহ্নিত

১৪৪ উসকানিদাতা চিহ্নিত

শ্রমিক অসন্তোষ, হামলা-ভাঙচুর পোশাকশিল্পে উৎপাদন ক্ষতি ১৫০০ কোটি টাকা

পোশাকশিল্পে উৎপাদন ক্ষতি ১৫০০ কোটি টাকা

শান্তিচুক্তির আড়ালে অশান্তির পাহাড় (১) পাহাড়ে ৩ গোষ্ঠীর অস্ত্রের শাসন

পাহাড়ে ৩ গোষ্ঠীর অস্ত্রের শাসন

শেভরনের আংশিক প্রস্তাবের পক্ষে পেট্রোবাংলা

শেভরনের আংশিক প্রস্তাবের পক্ষে পেট্রোবাংলা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম