শেভরনের আংশিক প্রস্তাবের পক্ষে পেট্রোবাংলা
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানি শেভরনকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সিলেটে তাদের পুরোনো এলাকা (১২ নম্বর ব্লক) দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে পেট্রোবাংলা। তবে এক্ষেত্রে কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। এ এলাকায় শেভরন নতুন করে গ্যাসের ক্ষেত্র আবিষ্কার করলে প্রস্তাবিত অনশোর মডেল পিএসসি (উৎপাদন বণ্টন চুক্তি) অনুযায়ী গ্যাসের দাম দেওয়া হবে মার্কিন এই কোম্পানিকে। তবে তাদেরকে আপাতত পেট্রোবাংলা বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকা নিয়ে গঠিত ১১ নম্বর ব্লক দেওয়ার পক্ষে নয়। এ ব্যাপারে শেভরনের সঙ্গে সমঝোতা বৈঠকে এ তথ্য জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র যুগান্তরকে নিশিচত করেছে।
বৃহস্পতিবার শেভরনের সঙ্গে সর্বশেষ পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কমিটির বৈঠক হয়। এতে বলা হয়, ১১ ও ১২ নম্বর নয়, শুধু ১২ নম্বর ব্লকের বাকি এলাকা (যে এলাকা শেভরন একসময় ছেড়ে দিয়েছিল) দেওয়া যেতে পারে। এ প্রস্তাবের ব্যাপারে শেভরন তাৎক্ষণিকভাবে পেট্রোবাংলার কাছে কোনো মন্তব্য করেনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেভরনের মুখপাত্র শেখ জাহিদুর রহমান সোমবার যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের পলিসি এবং বাণিজ্যিক ইস্যু নিয়ে শেভরন কোনো মন্তব্য করবে না। তবে শেভরন বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পেট্রোবাংলা এবং সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাবে।
এর আগে ১৬ জুলাই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা চুক্তির (এমওইউ) আওতায় শেভরন ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকের ৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি এলাকা বরাদ্দ নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এ প্রস্তাবে বলা হয়, সিলেট এলাকায় আরও ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এজন্য তারা প্রাথমিকভাবে আড়াই হাজার কোটি টাকা (২০ কোটি ডলার) বিনিয়োগে আগ্রহী। এ প্রস্তাব নিয়ে শেভরনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি দল ১৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে।
এরপর পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে এই প্রস্তাবের ব্যাপারে মতামত দিতে একটি কমিটি এবং কর্মচারীদের কল্যাণ ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ) নিয়ে মতামত দিতে পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) এসএম মাহবুব আলমের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি গঠন করে দেয় জ্বালানি বিভাগ। সেই দুই কমিটি শেভরনের সঙ্গে তাদের প্রস্তাব নিয়ে একাধিকবার বৈঠক করেছে। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে পেট্রোবাংলার পরিচালক মিজানুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে কমিটি এখনো তাদের রিপোর্ট চূড়ান্ত করেনি বলে জানা গেছে।
শেভরনের প্রস্তাব এবং কমিটির ভিন্নচিন্তা : মার্কিন কোম্পানিটির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, চারটি শর্তে ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকের নির্ধারিত এলাকা শেভরনকে দিলে বাংলাদেশে দুই বছরের মধ্যে ৫ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস আবিষ্কার হতে পারে। দেশে এখন গ্যাসের মজুত মাত্র ৭ টিসিএফ-এর মতো। সেই শর্তের একটি হচ্ছে-বর্তমান খসড়া অনশোর পিএসসি-২০২৬ (এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি) অনুযায়ী গ্যাসের দাম নির্ধারণ করতে হবে। শর্ত পালন করলে নতুন দাম পাবে শেভরন। প্রস্তাবিত এই পিএসসি অনুযায়ী ব্যানড ক্রডের ৮ শতাংশ গ্যাসের দাম ধরা হয়েছে। সেই অনুযায়ী এখনকার আন্তর্জাতিক বাজার অনুযায়ী প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম আসে ৮ দশমিক ৬ ডলার (মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগে এই দাম ছিল ৫ দশমিক ৯৭ ডলার)। এর মধ্যে বাংলাদেশের লাভের গ্যাস বাদ দিলে এই গ্যাসের দাম পড়ে আনুমানিক ৪ দশমিক ৯৭৭ ডলার। এখন সরকার শেভরনের কাছ থেকে কিনছে ২ দশমিক ৭৬ ডলারে। তবে শেভরন নতুন এই দাম পাবে একটি শর্তে-সেটি হচ্ছে সিলেট এলাকায় তাদের গভীর কূপ (৫ হাজার মিটার পর্যন্ত) খনন করতে হবে।
সরকারি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেছেন, ১১ নম্বর ব্লক অনেক আগে থেকে বাপেক্সের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটিতে ছাতক, টেংরাটিলা ও সুনেত্র ক্ষেত্র আছে। সুনেত্রে নতুন করে কূপ খনন করতে ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) করা হচ্ছে। এছাড়া ১৫০ কূপ খননের কর্মসূচির আওতায় মদন-১ ও ২ খননের পরিকল্পনা আছে। তাই ১১ নম্বর ব্লক শেভরনকে দেওয়ার মতো কোনো সুযোগ আপাতত নেই। তবে শেভরন ছাতক, টেংরাটিলা এবং সুনেত্র ক্ষেত্র তাদের ম্যাপ থেকে বাদ রাখবে বলে সমঝোতা বৈঠকে জানিয়েছে। তবে ব্লক ১২ অর্থাৎ সিলেট এলাকায় বিবিয়ানা ক্ষেত্র আছে। সেখান থেকে এখন দৈনিক ৭৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। একসময় শেভরনের কাছে ১২ নম্বর ব্লকের আওতাধীন বিশাল এলাকা দেওয়া হয়েছিল। সেটি আবার তাদের কাছে ফেরত দেওয়ার পক্ষে পেট্রোবাংলার কমিটি। তবে এ এলাকায় গভীর কূপ খনন করে গ্যাস পাওয়া গেলে গ্যাসের ওই নতুন বা বেশি দাম দেবে সরকার।
শেভরনের ওই প্রস্তাবে ১২ নম্বর ব্লকের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবের ব্যাপারে পেট্রোবাংলা ইতিবাচক বলে জানা গেছে। ২০৩৩ সালে বিবিয়ানা ক্ষেত্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। এর মধ্যে বিবিয়ানার উৎপাদন ২০৩০-২০৩২ সালে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসতে পারে। কিন্তু নতুন বিনিয়োগ করে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করলে এই খাতের সম্ভাবনা আছে। তাই তারা ১২ নম্বর ব্লকে বা বিবিয়ানা ক্ষেত্রের চুক্তির মেয়াদ ২০৩৪ থেকে ১৫ বছর বাড়িয়ে ২০৪৯ সাল পর্যন্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
শেভরনের প্রস্তাবে বাপেক্সকে ১০ শতাংশ লাভের অংশীদার করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু কমিটি ১০ নয়, ২০ শতাংশ বাপেক্সকে অপারেটিং পার্টনার রাখার সুপারিশ করতে চায়।
ডব্লিউপিপিএফ নিয়ে কমিটির সিদ্ধান্ত : শেভরনের প্রস্তাবে বলা হয়, ডব্লিউপিপিএফ-এর টাকা বিনিয়োগ উসুল ফান্ড (কস্ট রিকভারি) থেকে দিতে হবে। অর্থাৎ, শেভরন কর্মকর্তা-কর্মচারীর লাভের দেড় শতাংশের একটি বড় অংশ পেট্রোবাংলাকে দিতে হবে। এই অর্থ বছরে কয়েকশ কোটি টাকা হতে পারে। কমিটির সিদ্ধান্ত হচ্ছে, বিষয়টি নিয়ে এখন পেট্রেবাংলার সঙ্গে শেভরনের মামলা চলছে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত ইকসিডে। সেখানকার রায় অনুযায়ী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। এছাড়া শ্রমিকদের তহবিল নিয়ে বাংলাদেশের শ্রম আদালতে শেভরনের বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শেভরনের প্রধান কার্যলয়ের কর্মকর্তারা। শেভরন জানিয়েছে, এলএনজি আমদানি করে এখন বাংলাদেশ বছরে বিল দিচ্ছে ৩৮০ কোটি ডলার। ২০৩৫ সালে এই বিল বেড়ে দাঁড়াবে ৫৭০ কোটি ডলারে। শেভরন নতুন করে ১১ ও ১২ নম্বর ব্লকে (বৃহত্তর সিলেট) কাজ করার সুযোগ পেলে সম্ভাবনাময় বিভিন্ন গ্যাস কাঠামোতে কূপ খনন করবে। এতে নতুন গ্যাস আবিষ্কার হলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের এলএনজি আমদানি ব্যয় কমবে ১৮০ কোটি ডলার। শেভরন ২০২৩ সাল থেকে গ্যাস খাতে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও তারা এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু জ্বালানি খাত নিয়ে তখন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো এমওইউ ছিল না। ১৪ মে ওয়াশিংটনে জ্বালানি খাত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এমওইউ হয়। এতে স্বাক্ষর করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইট। এরপর এমওইউ-এর আওতায় শেভরনকে কাজ দিতে প্রস্তাব দেওয়া হয়।

