ঝালকাঠিতে ঝরল ১৭ প্রাণ
সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারান বাসচালক : আহত ২৫ যাত্রী হাসপাতালে
Advertisement
ঝালকাঠি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শনিবার সকাল ১০টা। পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থেকে যাত্রীবাহী বাসটি যাচ্ছিল বরিশালের দিকে। ৪০ আসনের বাসে যাত্রী ছিলেন ৬০ জন। ছাদেও ছিলেন কয়েকজন। কেউ মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন, কেউ দেখছিলেন ভিডিও, কেউ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত ছিলেন। ছাদে বসে হাওয়া খেতে খেতে আনমনে গলায় গান তুলেছিলেন কোনো যাত্রী। হঠাৎ সড়ক থেকে ডিগবাজি খেয়ে বাস পড়ে গেল পুকুরে। বিকট শব্দ আর যাত্রীদের গগনবিদারী আর্তনাদে ছুটে আসেন আশপাশের হাজারো মানুষ। খবর দেওয়া হয় পুলিশ ও স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসকে। শুরু হয় উদ্ধার কাজ। কিন্তু ততক্ষণে পানিতে দম বন্ধ হয়ে মারা যান নারী ও শিশুসহ ১৭ যাত্রী। আহত হন অন্তত ২৫ জন।
ঝালকাঠি-পিরোজপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ঝালকাঠির ছত্রকান্দার গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঝালকাঠি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাসির উদ্দিন সরকার জানান, নিহতদের মধ্যে ৮ জন নারী, ৬ জন পুরুষ ও তিন শিশু। তাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আহত যাত্রীদের প্রথমে ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে দুজনকে বরিশাল শের ই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, বাশার স্মৃতি পরিবহণ নামের যাত্রীবাহী বাসটির বেশিরভাগ অংশই পুকুরের পানিতে নিমজ্জিত। পুকুরের চারপাশ ও পাশের সড়কে উৎসুক শত শত মানুষের ভিড়। ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ সদস্যরা বাসের ভেতর থেকে হতাহতদের বের করে নিয়ে আসছেন। তাদের সহযোগিতা করছেন স্থানীয় লোকজন। আহত যাত্রী, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই, দ্রুতগতি ও চলন্ত অবস্থায় সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলার কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহতদের মধ্যে ৮ জনের বাড়ি ভান্ডারিয়া উপজেলায়। এদের অনেকেই বরিশালে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছিলেন। এরা হলেন-দক্ষিণ ভান্ডারিয়ার পান্না বেপারীর ছেলে তারেক বেপারী (৪২), উত্তর পূর্ব ভান্ডারিয়া গ্রামের ছালাম মোল্লা (৬৫) ও তার ছেলে শাহীন মোল্লা (২৫), পশারী বুনিয়া গ্রামের জালাল হাওলাদারের মেয়ে সুমাইয়া (৬), পূর্ব ধাওয়ার (পোদ্দার খাল) রহিমা বেগম (৭০) ও ছেলে আবুল কালাম হাওলাদার (৫০), উত্তর শিয়ালকাঠী গ্রামের ফজলুল হক মৃধার স্ত্রী রাবেয়া বেগম (৭৫) ও তেলিখালী গ্রামের রাসেল সিকদারের স্ত্রী সাদিয়া আক্তার (২৪)।
নিহত অন্যরা হলেন-বরিশালের হিজলার মা আইরিন আক্তার ও মেয়ে রিপা মনি (১৮ মাস) এবং আইরিনের ভাই মো. নয়ন (১৬)। ঝালকাঠির কাঁঠালিয়ার মৃত কাঞ্চন তালুকদারের ছেলে মো. ফারুক হোসেন (৫৫), সালমা আক্তার মিতা (৪২), রাজাপুরের খাদিজা বেগম (৪৩), খুশবু আক্তার (১৭), বাকেরগঞ্জের আব্দুল্লাহ (৮) ও বরিশালে মুখলাল বয়াতির মেয়ে পারভীন (৬০)।
নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় জানা গেছে তারা হলেন-ভান্ডারিয়ার পান্না মিয়ার ছেলে তারেক রহমান (৪৫), মুজাফফর আলীর ছেলে সালাম মোল্লা (৬০), মৃত মাওলানা নজরুল ইসলামের স্ত্রী খাদিজা বেগম (৪৩), মৃত সালাম মোল্লার ছেলে শাহীন মোল্লা (২৫), জালাল হাওলাদারের মেয়ে সুমাইয়া (৬), লাল মিয়ার স্ত্রী রহিমা বেগম (৬০), মৃত ফজলুল হক মৃধার স্ত্রী রাবেয়া বেগম (৮০), মেহেদীগঞ্জ সদরের রিপনের মেয়ে রিপামনি (২), রিপন হাওলাদারের স্ত্রী আইরিন আক্তার (২২), রাজাপুরের মাও. নজারুল ইসলামের মেয়ে খুশব আক্তার (১৭), নজরুল ইসলামের ছেলে নয়ন (১৬), বাখরগঞ্জের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে আবদুল্লাহ (৮), মৃত লাল মিয়া হাওলাদারের ছেলে আবুল কালাম হাওলাদার, কাঁঠালিয়ার তৈয়বুর রহমান বাঁশবুনিয়ার মেয়ে সালমা আক্তার মিতা (৪২)।
ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে রয়েছেন-ভান্ডারিয়ার রাসেল মোল্লা, মনিরুজ্জামান, ফাতিমা, রাসেল, কাঁঠালিয়ার আবুল বাশার, রিজিয়া, আরজু, নলছিটির মিফতা, আজিজুল, রাজাপুরের সোহেল, আবুল কালাম, মনোয়ারা, ভোলার সুইটি, বাউফলের রুকাইয়া, বরগুনার আকাশ, সাতক্ষীরার সোহাগ, মঠবাড়িয়ার নাঈমুল, বাউফলের সিদ্দিকিুর, ঝালকাঠির আল-আমিন ও বরিশালের সাব্বির। ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে হতাহতদের স্বজনরা ভিড় করেন। এ সময় তাদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠে হাসপাতাল অঙ্গন।
শেবাচিমে ভর্তি হওয়া দুজন হলেন-আল মামুন ও তার স্ত্রী শিল্পী বেগম। শেবাচিম হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মফিজুল ইসলাম জানান, মামুন হাতে, ঘাড়ে ও মাথায় আঘাত পেয়েছেন। শিল্পি কোথাও আঘাত না পেলেও জ্ঞান হারিয়েছিলেন।
ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক ফারাহ্ গুল নিঝুম বলেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মামুন শিবলীকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে আহত যাত্রী রাসেল মোল্লা বলেন, ৪০ আসনের বাসটি সকাল ৮.৪৫ মিনিটে ভান্ডারিয়া থেকে বরিশালের উদ্দেশে ছাড়ে। পথে বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রী ওঠানোর ফলে যাত্রী সংখ্যা হয় প্রায় ৬০-৭০ জন। বাসটির ছাদেও কয়েকজন যাত্রী ছিলেন। বাসটি দ্রুতগতিতে ঝালকাঠির ছত্রকান্দা ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ অতিক্রমকালে চালক সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি সড়কের বামদিকের পুকুরে পড়ে যায়।
ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল কালাম মাসুম বলেন, আমি পরিষদে লোকজন নিয়ে বসে ছিলাম। হঠাৎ শব্দ শুনে বের হয়ে দেখি পুকুরে বাস পড়ে গেছে। পরিষদে যারা ছিলেন তারা এবং আশপাশের লোকজন ছুটে এসে লোকজনকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন।
উদ্ধার কাজে অংশ নিয়ে আহত হওয়া স্থানীয় ইউপি সদস্য ফয়সাল রহমান বাবু বলেন, দুর্ঘটনার সময় আমি পরিষদের সামনেই ছিলাম। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আসার আগেই আমরা ৫০-৬০ জন মিলে উদ্ধার অভিযান শুরু করি। তিনি বলেন, সড়কের পাশে পুকুর থাকায় মৃতের সংখ্যা বেশি হয়েছে। মহাসড়কের কাছে পুকুর খনন বন্ধ করা উচিত। ঝালকাঠি বাস মালিক সমিতির নির্বাহী সদস্য জামাল হোসেন মিঠু বলেন, বাসের চালক মোহন সাইড জানালার কাচ ভেঙে আত্মরক্ষা করেন। সে সামান্য আহত হয়েছে। হেলপার আকাশও সুস্থ আছে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনা কবলিত বাসটির রুট পারমিট ও ফিটনেস সার্টিফিকেট সঠিক আছে এবং চালকেরও লাইসেন্স আছে।
ঝালকাঠির পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আফরুজুল হক টুটুল বলেন, আইজিপি স্যারের পক্ষ থেকে লাশ দাফন ও পরিবহণের জন্য এক লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
