ঢাকায় ভর্তি ১৪ জনের অনেকেরই অবস্থা সংকটাপন্ন
Advertisement
শিপন হাবীব
প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে দগ্ধ একজন -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডে মারাত্মক দগ্ধদের মধ্যে ১৪ জনকে রাজধানীর শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১৯ মিনিটে ৭ জনকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে করে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আনা হয়।
এর আগে ভোর সাড়ে ৬টা থেকে দুপুর পৌনে ২টা পর্যন্ত ৪ জনকে এনে ভর্তি করা হয়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে আরও ৩ জনকে ভর্তি করা হয়। দগ্ধদের মধ্যে তিনজন আইসিইউতে ভর্তি রয়েছেন। এর মধ্যে গাউছুল আজম (২২) নামে একজনকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। তার শরীর ৮৪ শতাংশ পুড়ে গেছে।
বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন দগ্ধদের মধ্যে রয়েছেন-সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চল থানার এসআই কামরুল হাসান, বিএম কনটেইনার ডিপোর সিকিউরিটির প্রধান ইনচার্জ মাকফারুল ইসলাম, ডিপোর প্রশাসনিক ম্যানেজার খালেদুর রহমান ও শেখ মঈনুল হক।
হেলিকপ্টারে করে দমকল বাহিনীর সদস্য রবিন মিয়া ও গাউসুল আজম, আমিন (২২), রাসেল (৪২), মাসুম (৩২), মহিবুল্লাহ (২৭), ফারুক হোসেন (১৬), রুবেল মিয়াকে (৩৪) ঢাকায় আনা হয়। এর মধ্যে ৮৮ শতাংশ দগ্ধ গাউসুলকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।
৭৭ শতাংশ দগ্ধ রবিনকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্য ছয় জনকে রেড ইউনিটে রাখা হয়েছে। রাত ৮টার দিকে আনা ফারুক হোসেন (৩২) ও ফরমানুল ইসলামের (৩০) চিকিৎসা চলছে।
চিকিৎসকরা জানান, ভর্তি চারজনের কাউকেই শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না। সবারই শরীর দগ্ধ হয়েছে, বিশেষ করে শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। পুলিশের এসআই কামরুল হাসানের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে।
কামরুলের স্ত্রী মেহরুন নেসা লিনা জানান, চিকিৎসকরা বলছেন-কান্না না করতে। কিন্তু বিছানায় শুয়ে দগ্ধ শরীর নিয়ে কামরুল শুধু মেয়ে রশ্মিকে দেখার জন্য কাঁদছেন। দুর্ঘটনার পর জ্ঞান ফিরতেই তিনি মেয়েকে খুঁজছেন। তার কান্না দেখে আর সহ্য করতে পারছি না।
এদিকে, ছোট্ট রশ্মি জানেও না তার প্রিয় বাবা অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন। লিনা আরও জানান, সীতাকুণ্ডে বেসরকারি বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের খবর শোনার পর তার স্বামী সাধারণ মানুষকে উদ্ধার করতে ডিপোতে চলে যান। স্বামীর সর্বোচ্চ চিকিৎসার জন্য তিনি সরকারের কাছে অনুরোধ জানান।
বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি একেএম মাকফারুল ইসলামের (৬৫) শ্বাসনালিসহ সারা শরীর দগ্ধ হয়েছে। বিএম কনটেইনার ডিপোর সিকিউরিটির ইনচার্জ মাকফারুলের শরীরের ৪৪ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।
তিনি পুলিশের এএসপি ছিলেন। অবসর নিয়ে তিনি ২০১৩ সালে ডিপোর ইনচার্জ হিসাবে যোগ দেন। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়া জেলা সদরে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার স্ত্রী নাজমা ইসলাম বলেন, তার স্বামীকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সে সময় তার শ্বাসপ্রশ্বাস নিয়ে মারাত্মক সমস্যা হচ্ছিল। এরপর তাকে ঢাকায় আনা হয়। নাজমা জানান, সহকর্মীদের বাঁচাতে, উদ্ধার করতে জীবনবাজি রেখে তিনি দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্বামীর সর্বোচ্চ চিকিৎসা হোক-এমনটা জানিয়ে তিনি বলেন, দগ্ধদের সুস্থ করতে যা যা প্রয়োজন সরকার যেন সেসব করে।
বিএম কনটেইনার ডিপোর প্রশাসনিক ম্যানেজার খালেদুর রহমান (৫৮) বার্ন ইউনিট এইচডিইউতে ভর্তি হয়েছেন। তারও শ্বাসনালিসহ চোখ, মুখ, পা ও তলপেট পুড়ে গেছে। দগ্ধ দুচোখ ফুলে গেছে।
পুরো মুখমণ্ডল পুড়ে গেছে। দুই পায়ের কবজি পর্যন্ত মারাত্মক দগ্ধ হয়েছেন। চিকিৎসকরা জানান, তাকেও আইসিইউতে ভর্তি করা হবে। শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় তিনি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছেন না।
আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এইচডিইউর সামনে স্বামীর জন্য প্রার্থনা করছিলেন খালেদুরের স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস শিল্পী। তিনি জানান, শনিবার বিকালে তিনি ডিপো থেকে বাসায় আসেন।
দুর্ঘটনার কথা শুনতে পেয়েই তিনি ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। এরপর গাড়িচালক ফারুককে সঙ্গে নিয়ে তিনি দ্রুত ডিপোতে চলে যান। আমি বারবার তাকে বলছিলাম-তুমি যেও না।
এ অবস্থায় তুমি গেলে ক্ষতি হতে পারে। তখন তিনি বলেছিলেন- এমন বিপদে আমি ঘরে বসে থাকতে পারি না। আমার জন্য চিন্তা করো না। এরপর রাত ১০টা পর্যন্ত তার মোবাইল ফোনে কল দিয়ে কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
রাত ১১টার দিকে খবর আসে চট্টগ্রাম পার্কভিউ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তিনি রয়েছেন। ওখান থেকে রাতেই ঢাকার উদ্দেশে রওয়ানা হই। রোববার ভোর সাড়ে ৬টায় বার্ন ইউনিটে আনা হয়।
রোববার দুপুর পৌনে ৩টার দিকে শেখ মঈনুল হক নামের এক দগ্ধ ব্যক্তিকে বার্ন ইউনিটে আনা হয়। তারও শ্বাসনালিসহ শরীরের ২৮ শতাংশ পুড়ে গেছে। জরুরি বিভাগে চিকিৎসার পর তাকে রেড ইউনিটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, তার শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাথায়ও বড় ধরনের আঘাত রয়েছে।
চট্টগ্রামে যাচ্ছে তিন সদস্যের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল : রোববার বিকালে জাতীয় বার্ন ইউনিটের প্রধান সমন্বয়কারী ডা. সামন্ত লাল সেন জানান, বার্ন ইউনিটে আসা সব দগ্ধ রোগীর সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিতে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করছি।
সোমবার আমিসহ আরও দুজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চট্টগ্রাম যাচ্ছি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটসহ অন্য সব হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দগ্ধ রোগীদের দেখব।
ডা. সামন্ত লাল সেন আরও জানান, দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মোবাইল ফোনে আমার কথা হয়েছে। তিনি সর্বদা খোঁজখবর নিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন-দগ্ধদের মধ্যে যাদের দ্রুততম সময়ে ঢাকা আনা প্রয়োজন তাদের যেন আকাশপথে দ্রুত আনা হয়।
এজন্য আমরা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করছি। প্রয়োজন হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে আকাশপথে তাদের ঢাকায় আনা হবে। দগ্ধ রোগীদের ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। আমরা চট্টগ্রাম যাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সব করা হবে।
