রাজশাহীতে বাদীর বাড়িতে ওসিসহ দণ্ডপ্রাপ্ত আ.লীগ নেতা
মামলা না তুললে মেরে গুম করে ফেলব
আসামিদের বিএনপিকর্মী সাজিয়ে মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ এমপির
Advertisement
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহীর দুর্গাপুরে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতাদের নিয়ে গভীর রাতে মামলার বাদীর বাড়িতে হানা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে থানার ওসি ও দুই এসআইয়ের বিরুদ্ধে। এ সময় আসামিরা মামলা তুলে না নিলে বাদী ও তার বৃদ্ধ মা-বাবাকে মেরে গুম করার হুমকি দেন। শুধু তাই নয়, পারিবারিক বিরোধের এই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আ.লীগ নেতাদের বিএনপির কর্মী সাজিয়ে মামলাটি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছেন স্থানীয় সংসদ-সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মামলার বাদী দুর্গাপুরের নামুদরখালির বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ১টার দিকে দুর্গাপুর থানার ওসি পঞ্চনন্দ সরকারের নেতৃত্বে এসআই রিপনসহ পুলিশের একটি দল মামলার আসামিদের সঙ্গে নিয়ে বাদী গোলাম মোস্তফার বাড়িতে আসে। এ সময় বাড়িতে শুধু তার বৃদ্ধ বাবা সামীর আলী ও মা চায়না বিবি ছিলেন। পুলিশ ও আসামিরা বাড়ির দরজায় সজোরে লাথি মারতে থাকেন এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন।
বাদীর মা-বাবা দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেন, পুলিশের সঙ্গে মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরাও রয়েছেন। তারা হলেন-মামলার এক নম্বর আসামি দেলুয়াবাড়ী ইউনিয়ন যুবলীগের সদস্য সচিব শহীদুল ইসলাম, ৪ নম্বর আসামি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি সাহার আলী, ১০ নম্বর আসামি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ আলী এবং তিন নম্বর আসামি ওয়ার্ড কমিটির সদস্য জেকের মোল্লা। দরজা না খোলায় সাহার ও শহীদুল হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তোদের ছেলেকে মামলা তুলে নিতে বল। না হলে ছেলেসহ তোদের মেরে গুম করে ফেলব। আমাদের কেউ কিছুই করতে পারবি না।’ একপর্যায়ে রাত ২টার দিকে তারা চলে যান।
ঘটনার পরদিন সকালে বাদী বিষয়টি স্থানীয় বিএনপি নেতা ও দুর্গাপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র সাইদুর রহমান মন্টুকে জানান। মন্টু ও উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাইদুল রহমান ফোনে যোগাযোগ করলে এসআই রিপন কুমার দাস রাতে ওসিসহ ওই বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। এরপর গত ২২ সেপ্টেম্বর দুপুর ২টার দিকে থানার এসআই দেবাশীষ নন্দীর নেতৃত্বে ১০-১২ জন পুলিশ সদস্য আবারও বাদীর বাড়িতে ঢুকে দ্রুত মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন।
২০২১ সালের ৩১ মে বাদীর পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন ও বাড়িঘর ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ১২ নেতাকর্মীর নামে মামলা করেন গোলাম মোস্তফা। ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১ প্রত্যেক আসামিকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেন। বর্তমানে তারা জামিনে বেরিয়ে বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে আপিল করেছেন। বাদীর অভিযোগ, বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আসামিরা এখন দুর্গাপুর থানা-পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে তাদের হয়রানি করছেন।
এমপির বিতর্কিত সুপারিশপত্র : দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বাঁচাতে রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ-সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম গত ৩০ জুলাই জাতীয় সংসদের প্যাডে দ্বিতীয়বারের মতো মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেন। প্রত্যয়নপত্রে তিনি দাবি করেন, মামলার আসামিরা জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সক্রিয় সদস্য। আর বাদী নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে এই হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে।’ এর আগে গত ২৫ মেও তিনি একই ধরনের সুপারিশ করেছিলেন। এ নিয়ে ২৩ জুন যুগান্তরে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত আ.লীগ নেতাকর্মীদের মামলা : রাজনৈতিক দেখিয়ে প্রত্যাহারের সুপারিশ এমপি নজরুলের’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
অথচ আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন বাদী গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, আমি বা আমার পরিবার কখনোই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই।
এমপির এমন বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়ে জানতে তার ও ব্যক্তিগত সহকারী ইয়াসির আরাফাত প্রিন্সের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তারা রিসিভ করেননি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্গাপুর থানার ওসি পঞ্চনন্দ সরকার যুগান্তরকে বলেন, বাদীর বাড়িতে গভীর রাতে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। এ রকম কোনো ঘটনা আমার জানা নেই।
তবে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, একটি অভিযোগ পেয়েছি এবং সেটি তদন্ত করতে দিয়েছি। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
