ইলিশের নামে ‘রুপালি ধোঁকা’
Advertisement
শিপন হাবীব
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের রুপালি ইলিশ স্বাদে-সুগন্ধে অনন্য। তাই চড়া দামেও ইলিশ কিনতে দ্বিধা করেন না ভোজনরসিক বাঙালি। এ সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে একটি চক্র। বিদেশ থেকে আমদানি করা ইলিশের মতো দেখতে সার্ডিন, চৌক্কা, চন্দনা, চকোরি ও টাকিয়া মাছকে দেশীয় ‘আসল ইলিশ’ হিসাবে বিক্রি করা হচ্ছে। শুধু বাজারে নয়, এসব মাছ আসল ইলিশের সঙ্গে মিশিয়ে নদী-সাগর থেকে আসা টাটকা মাছের তকমা দিয়েও বিক্রি করা হচ্ছে। এতে কেজিতে ৩০০-৪০০ টাকার আমদানি করা মাছ বিক্রি হচ্ছে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকায়।
চট্টগ্রাম মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ (এফআইকিউসি) দপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিনিয়ত হিমায়িত সামুদ্রিক মাছ আমদানি হচ্ছে। ইলিশ কিংবা দেখতে ইলিশের মতো মাছও আসছে। গত অর্থবছরে প্রায় ৫০০ টন এবং চলতি মাসে ৮৭ টন সার্ডিনসহ কয়েক ধরনের ইলিশের মতো দেখতে মাছ আমদানি হয়েছে। প্রতি মাসে ৮০ থেকে ৯০ টন এসব মাছ আসছে। মূলত ভারত, মিয়ানমার, ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মাছগুলো আমদানি হচ্ছে। গ্রামের অনেক মানুষও আসল ইলিশ সহজে চিনতে পারেন না।
চট্টগ্রাম ফিশারি ঘাট এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, আমদানি করা হিমায়িত মাছগুলোর কিছু রক্তমাখা থাকে। কিছু মাছ দেখতে হুবহু ইলিশের মতো। ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের এসব মাছ ঘাট থেকে কিনে কোথায় বিক্রি করা হয়, তা তাদের জানা নেই। তবে এসব মাছের চাহিদা প্রচুর।
ফিশারি ঘাটের আরেক ব্যবসায়ী জানান, সার্ডিন, চন্দনা ও চৌক্কাসহ ইলিশ গোত্রের মাছের কিছু অংশ ঘাট থেকে কিনে কোল্ড স্টোরেজ থেকে ট্রলারে করে গভীর সমুদ্রে নেওয়া হয়। সেখানে জেলেদের কাছ থেকে কেনা আসল ইলিশের সঙ্গে এসব মাছ মিশিয়ে নদী-সাগরের টাটকা মাছের তকমা দিয়ে ঘাটে আনা হয়। সাধারণ ক্রেতাদের চোখে ধুলো দিতে চলছে এই ‘ইলিশ ভাঁওতাবাজি’। আরেক ব্যবসায়ী জানান, নকল-আসল মেশানো ইলিশের বড় অংশ গ্রামের হাট-বাজার ও শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বিক্রি হয়। কেটে রান্নার পর কোনটি আসল, কোনটি নকল-তা বোঝার উপায় থাকে না। তবে আস্ত মাছ দেখে অভিজ্ঞরা কিছুটা চিনতে পারেন।
চট্টগ্রামের মাছ আমদানিকারক খায়রুল ইসলাম রুমান বলেন, ভারত থেকে আসা ইলিশ আমদানি চলতি মাসের ২৩ তারিখ থেকে বন্ধ হয়েছে। এখন মিয়ানমার, ওমানসহ কয়েকটি দেশ থেকে ইলিশের মতো দেখতে মাছ আসছে। তিনি নিজেও সার্ডিনসহ ইলিশ গোত্রের মাছ আমদানি করছেন। সার্ডিন ৩০০-৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। তার ভাষ্য, পেটে ডিম থাকা দেশীয় ইলিশের সঙ্গে সার্ডিন মাছটির হুবহু মিল রয়েছে। চৌক্কা কিছুটা লম্বা, যা ডিমবিহীন লম্বা ইলিশের মতো।
মৎস্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট ৫২১ কোটি ২২ লাখ ৩০ হাজার টাকার মাছ আমদানি হয়েছে। হিমায়িত সামুদ্রিক মাছের তালিকায় চান্দা মাছের নাম থাকলেও সার্ডিনসহ ইলিশ গোত্রের মাছগুলো ‘অন্যান্য’ তালিকায় রয়েছে।
রাজধানীর কাওরান বাজারের মাছ ব্যবসায়ী হিরণ মোল্লা বলেন, তিনি প্রায় তিন যুগ ধরে ইলিশ বিক্রি করছেন। তার মতে, ইলিশের আকারও পরিবর্তন করা যায়। বরফ দিয়ে বাঁধার কৌশলে ডিমওয়ালা ইলিশকে লম্বাটে করা যায়। একইভাবে সার্ডিন ও চৌক্কা মাছকেও বরফ দিয়ে ইলিশের মতো আকৃতি দেওয়া হয়। এ কৌশলে বিদেশি ইলিশ গোত্রের মাছকে আসল ইলিশ হিসাবে বিক্রি করা হচ্ছে।
যাত্রাবাড়ীর মৎস্য আড়তের ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া বলেন, অনেক ক্রেতা জেনেশুনেই দেখতে ইলিশের মতো আমদানি করা মাছ কেনেন। এসব মাছের শরীরে দেশীয় ইলিশের মতো রুপালি ভাব কম, কিছুটা লালচে। তার ভাষ্য, দেশীয় ইলিশের স্বাদও আগের মতো নেই। ফলে আমদানি করা মাছের সঙ্গে স্বাদের পার্থক্য অনেক সময় বোঝা যাচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, আমদানি করা ইলিশ গোত্রের মাছ দেশীয় ইলিশের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করা ভয়াবহ অপরাধ। সার্ডিন বা ইলিশ গোত্রের মাছ আমদানি হতে পারে, তবে সেগুলোকে নিজ নিজ নামেই আলাদাভাবে বিক্রি করতে হবে। সাধারণ ক্রেতারা সব সময় আসল-নকল বুঝতে পারেন না। তাই বাজার মনিটরিং জরুরি। একই সঙ্গে মাছ চেনার বিষয়েও মানুষকে সচেতন করতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও মাছ চেনাতে হবে।
