রাঙ্গুনিয়ায় এক পরিবারে অঙ্গার ৫
আগুন যেন পিছু ছাড়ছে না খোকন বসাকের
‘স্রেফ দুর্ঘটনা নাকি অন্য রহস্য তা ভগবান জানেন’
Advertisement
এমএ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৯৯৬ সালে দাঙ্গার সময় আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা খোকন বসাকের ঘর। ২০০৮ সালে পুড়িয়ে দেওয়া হয় তার বিয়ের জন্য বানানো গেট। এর আট বছর পর ২০১৬ সালে ফের আগুন লেগেছিল রান্নাঘরে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার গভীর রাতে আবারও আগুন লাগে তার ঘরে। তবে আগের আগুনের মতো নয়, এবারের আগুন ছিল সর্বগ্রাসী। এ আগুন থেকে খোকন বসাক প্রাণে রক্ষা পেলেও তার স্ত্রী, দুই শিশুসন্তান ও বৃদ্ধ মা-বাবা পুড়ে অঙ্গার হয়েছে।
তাই আগের ঘটনাগুলো মনে করে সজল চোখে খোকন বসাক বলছেন, এসব কি সে ফ দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে? চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন খোকন বসাক শনিবার সকালে এমন প্রশ্ন ছুড়ে দেন এ প্রতিবেদকের কাছে। তার শরীরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পুড়ে গেছে। আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেন?
কেউ ইচ্ছাকৃত এ আগুন লাগিয়েছে এমনটি মনে করেন? তাকে এমন প্রশ্ন করা হলে উত্তরে খোকন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, না, কারও প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। সব ভগবান জানেন।
সরেজমিন শনিবার সকালে চমেক হাসপাতালে বার্ন ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, বাম হাত এবং শরীরে ব্যান্ডেজ মোড়ানো অবস্থায় বেডে শুয়ে আছেন খোকন বসাক। মাথায় আগুন লাগায় ফেলে দেওয়া হয়েছে চুল। পাশে রয়েছেন তার স্বজন প্রিয়ন্তী দাশ। যন্ত্রণাকাতর খোকন বসাকের চোখ দিয়ে তখনো গড়িয়ে পড়ছিল পানি।
উপজেলার পারুয়া গ্রামের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে দগ্ধ হন সিএনজি অটোরিকশা চালক খোকন বসাক। তিনি বলেন, আগুন লাগার সময় আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। ১২ বছরের ছেলে সৌরভ ও পাঁচ বছর বয়সি মেয়ে শায়ন্তী তাদের দাদির সঙ্গে অন্য কক্ষে ঘুমাচ্ছিল। হঠাৎ ছেলেমেয়ের ‘বাবা আগুন-আগুন’ চিৎকারে ঘুম ভাঙে আমার। ঘুম থেকে ওঠার পর সবাই এক রুমে একত্রিত হই। সে সময় বের হওয়ার দরজায় দেখি আগুনের লেলিহান শিখা। আগুনের তাপ সহ্য করা যাচ্ছিল না।
ছেলেমেয়েসহ সবাইকে আমার পিছু পিছু আসতে বলে আগুনের মধ্যেই আমি ঘর থেকে বের হয়ে যাই। কিন্তু তারা পারেনি। সেখানেই পুড়ে অঙ্গার হয় আমার সোনামণিরা। পুড়ে মারা যান আমার স্ত্রী লাকি, আমার বৃদ্ধ বাবা-মা।
খোকন বসাক বলেন, ২৭ বছর আগে আমাদের বাড়িতে আগুন লেগেছিল। সে সময় আগুনে সবকিছু পুড়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেউ হতাহত হয়নি। এরপর ২০০৮ সালে আমি বিয়ে করে যখন শহর থেকে স্ত্রীকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলাম তখন রাতে বিয়ের গেটে কে বা কারা আগুন ধরিয়ে দেয়। পোড়া গেট দিয়েই নববধূকে নিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করেছিলাম। ২০১৬ সালেও একবার রাতে রান্নাঘরে আগুন লাগে। আশপাশের মানুষ এবং নিজেরা নিভিয়ে ফেলতে সক্ষম হই। কিন্তু বৃহস্পতিবার রাতের আগুনে আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।
খোকন বলেন, এখন আমার মনে হচ্ছে, এসব আগুনের ঘটনার নেপথ্যে কোনো রহস্য আছে। বৃহস্পতিবার রাতে আমি রান্নাঘর দেখে ঘুমাতে গেছি। চুলার ওপর পানির পাতিল ছিল। সেখান থেকে কীভাবে আগুন লাগতে পারে? আমি যে সিএনজি অটোরিকশা চালাই সেটাতেই আগুন লাগানো হয়। এ আগুন ঘরে ছড়িয়ে পড়ে।
পারুয়া ইউনিয়নের মহাজনপাড়ার কাঙ্গাল বসাকের মেঝো ছেলে খোকন বসাক। তার আরও দুই ভাই ও দুই বোন রয়েছে। এর মধ্যে বড় ভাই রিকন বসাক ও ছোট ভাই সুজন বসাক অনেক আগেই ভারতে চলে গেছেন। তারা সেখানেই স্থায়ী হয়েছেন। দুই বোন রিনি ও ঝর্ণা দেশেই আছেন।
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. লিটন কুমার পালিত যুগান্তরকে বলেন, ‘দগ্ধ খোকন বসাকের শরীর ছাড়াও শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। বর্তমানে তার অবস্থা স্থিতিশীল। আমরা সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে এ ধরনের রোগীর অবস্থা যে কোনো সময় খারাপ হতে পারে।
