Logo
Logo
×

Advertisement

শেষ পাতা

৮৫০০ কিমি. খননের উদ্যোগ

নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে ভূখণ্ড

Advertisement

Icon

শেখ মামুনুর রশীদ ও নেসারুল হক খোকন

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে ভূখণ্ড

Advertisement

নদী গিলে খাচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি ও জনপদ। দিনে দিনে ছোট হচ্ছে দেশের নদী উপকূলীয় এলাকার ভূখণ্ড। কোথাও ভাঙনের মুখে মানুষের শেষ আশ্রয়, কোথাও নদী-খাল ভরাট আর নাব্য সংকটে বাড়ছে জলাবদ্ধতা। ভিটেমাটি ভাঙনের সঙ্গে প্রতিদিন লড়ছেন জনপদের মানুষও। এই বিপর্যয় ঠেকাতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কিলোমিটার নদী-খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি প্রতিরক্ষা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধার, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় সদস্যরা জানিয়েছেন, কোথাও বসতি হারানোর আতঙ্ক, কোথাও নদী-খাল নাব্য হারিয়ে বাড়ছে জলাবদ্ধতা। এই বিপর্যয় ঠেকাতে হবে। পাশাপাশি ভাঙনপ্রবণ এলাকায় জরুরি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিতে হবে। অস্তিত্ব সংকটে উপকূলের জনপদ। নদী দখল ও ভরাটে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানিপ্রবাহ। অপরিকল্পিত অবকাঠামো আর অকার্যকর স্লুইসগেটে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে নদী-খাল খনন, ভাঙন রোধ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জিও ব্যাগ ও বাঁশের বান্ডলিং পদ্ধতি প্রয়োগের পাশাপাশি পাউবোর জমি অবৈধ দখলমুক্ত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শফিউল হক মিলন। উপস্থিত ছিলেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. একেএম শাহাবুদ্দিন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং কমিটির সদস্যরা।

৮৫০০ কিমি. খননের উদ্যোগ : নদী-খালের নাব্য ফিরিয়ে আনা ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কিলোমিটার নদী-খাল খননের উদ্যোগ নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে দ্রুত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া নদী-খালের অবস্থান, প্রবাহ, দখল ও সংশ্লিষ্ট তথ্য সংরক্ষণে জিআইএসভিত্তিক মানচিত্র ও ডেটাবেজ তৈরির জন্য ৩১ কোটি ৫৭ লাখ টাকার একটি প্রকল্পের কথা তুলে ধরা হয়। এ ধরনের তথ্যভান্ডার নদী-খালের প্রকৃত অবস্থা চিহ্নিত করা এবং পরিকল্পিত খনন ও ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে।

বৈঠকে ঝুঁকিপূর্ণ নদী তীরের ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত জিও ব্যাগ ও বাঁশের বান্ডলিং পদ্ধতি ব্যবহারের ওপরও জোর দেওয়া হয়। নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা জনপদে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের অপেক্ষায় না থেকে জরুরি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

পাউবোর জমি উদ্ধার : বৈঠকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিগ্রহণ করা জমির বড় একটি অংশ বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ দখলে থাকার অভিযোগ উঠেছে। এসব জমি চিহ্নিত করে উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন কমিটির সদস্যরা। ফকিরহাট, মোল্লাহাট ও চিতলমারী এলাকায় পাউবোর জমি দখলের বিষয়টি তুলে ধরেন বাগেরহাট-১ আসনের সংসদ-সদস্য মো. মশিউর রহমান খান। তিনি এসব জমি উদ্ধারের পাশাপাশি ছোট বলেশ্বর নদ পুনঃখননের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। জমি উদ্ধারের ক্ষেত্রে শুধু উচ্ছেদ অভিযান চালানো নয়, সংশ্লিষ্ট জমির রেকর্ড, সীমানা ও দখলের অবস্থা যাচাই করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নদী ও খালের জায়গা দখল হয়ে গেলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ফারাক্কা চুক্তি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ : বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় আন্তঃসীমান্ত নদীর পানিপ্রবাহ এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পায়। ফারাক্কা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় আসে। একই সঙ্গে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারের তাগিদ দেওয়া হয়। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ ফারাক্কা চুক্তি, ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল পুনঃখননের লক্ষ্য, পদ্মা ব্যারাজ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনাকে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসাবে তুলে ধরেন।

ভাঙন ও জলাবদ্ধতায় বিপর্যস্ত এলাকার চিত্র : বৈঠকে দেশের বিভিন্ন এলাকার নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও খননসংক্রান্ত সমস্যা তুলে ধরেন সংসদ-সদস্যরা। জামালপুর-২ আসনের সংসদ-সদস্য এ. ই. সুলতান মাহমুদ বাবু যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন এবং নদী থেকে তোলা বালু কৃষিজমিতে ফেলার কারণে ফসলের ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি এ সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ-সদস্য মো. ইজ্জত উল্লাহ তালা উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নের বড়কাশিপুর-শাখিন এলাকায় প্রায় ৫০০ একর জমিতে জলাবদ্ধতার কথা বলেন। পানি নিষ্কাশনের জন্য খালের মুখে চারটি স্লুইসগেট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। ফেনী-১ আসনের সংসদ-সদস্য মুন্সি রফিকুল আলম ২০২৪ সালের বন্যায় পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও ফেনী এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশনের জন্য স্লুইসগেট নির্মাণের দাবি জানান তিনি। কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ-সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ কুতুবদিয়া দ্বীপের আয়তন কমে যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে নদীভাঙন ও ঢেউয়ের আঘাত থেকে দ্বীপ রক্ষায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন। দ্বীপটির আয়তন এক সময় ১০০ বর্গকিলোমিটার ছিল এবং এখন ৩৩ বর্গকিলোমিটারে নেমেছে। গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ-সদস্য একেএম ফজলুল হক মিলন তার এলাকার পানি উন্নয়ন প্রকল্প, খাল খনন এবং জলাবদ্ধতার সমস্যা তুলে ধরেন। প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকার পরিবর্তন ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত সমস্যার কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল ব্যাহত হচ্ছে কিনা, তা পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা আলোচনায় আসে। বরগুনা-১ আসনের সংসদ-সদস্য মো. ওলি উল্লাহ দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের ধীরগতির বিষয় তুলে ধরেন। তিনটি ইউনিয়নকে ভাঙন ও অন্যান্য ঝুঁকি থেকে রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

মন্ত্রণালয়ের ৯০ শতাংশ কাজ পাউবোর মাধ্যমে : বৈঠকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ও চলমান প্রকল্পের তথ্য তুলে ধরেন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. একেএম শাহাবুদ্দিন জানান, মন্ত্রণালয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। বাকি কাজের সঙ্গে নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো), বাংলাদেশ হাওড় ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর এবং যৌথ নদী কমিশন সংশ্লিষ্ট।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) খন্দকার আজিম আহমেদ বৈঠকে দেশের ১৪১টি নদী, চলমান ৯৩টি প্রকল্প এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ৭ হাজার ৮০২ কোটি টাকা বরাদ্দের তথ্য তুলে ধরা হয়। নদী-খাল খনন, ভাঙন প্রতিরোধ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে এসব প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে বৈঠকে আলোচনায় উঠে আসে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে নজরদারির প্রয়োজন : বৈঠকে উঠে আসা বিভিন্ন এলাকার সমস্যা থেকে স্পষ্ট, নদী ব্যবস্থাপনায় শুধু খনন নয়, ভাঙন প্রতিরোধ, দখলমুক্তকরণ, পানি নিষ্কাশন এবং প্রকল্পের কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও নদীভাঙনে বসতি ও কৃষিজমি হারানোর ঝুঁকি, কোথাও খাল ভরাট ও অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনে জলাবদ্ধতা মানুষের জীবন-জীবিকাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

৮৫০০ কিমি. খননের উদ্যোগ নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে ভূখণ্ড

নদীভাঙনে ছোট হচ্ছে ভূখণ্ড

এক দশক পর আজ খুলছে জুলাই স্মৃতিতে সেজেছে ওসমানী উদ্যান

জুলাই স্মৃতিতে সেজেছে ওসমানী উদ্যান

মুক্তি পাননি ককরোচ নেতা সৌরভ-আশুতোষ

মুক্তি পাননি ককরোচ নেতা সৌরভ-আশুতোষ

ইয়েমেনে লড়াই তীব্র, বাড়ছে মানবিক সংকট

ইয়েমেনে লড়াই তীব্র, বাড়ছে মানবিক সংকট

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম