এলডিসি সংকট মোকাবিলায় সিপিডির সেমিনার
রাজনৈতিক কারিগরি বক্তব্যে সমন্বয়ের তাগিদ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এলডিসি উত্তরণের সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক এবং কারিগরি বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় থাকা দরকার। কেননা রাজনৈতিকভাবে বলা হয় আমরা অনেক উন্নতি করেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কারিগরি কমিটির সদস্যরা বলেন, আমাদের এটা সমস্যা, ওটা সমস্যা। আরও বলেন, এ খাতে সহায়তা দরকার ও খাতে সহায়তা দরকার। তখন বিদেশি মানুষেরা হিসাব মেলাতে পারেন না। একটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান। তারা ভাবেন এত উন্নত হলো তাহলে সহায়তার কেন দরকার। এ অবস্থায় রাজনৈতিক বক্তব্য এবং কারিগরি বক্তব্যের মধ্যে সমন্বয় দরকার।
সেন্টার ফর পলিস ডায়লগের (সিপিডি) সেমিনারে বক্তারা এমন তাগিদ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে ডব্লিউটিও সম্মেলনে বাংলাদেশসহ এলডিসি উত্তরণ হতে যাওয়া দেশগুলোর জন্য সমবেদনা থাকলেও প্রতিশ্রুতি নেই বলে জানানো হয়েছে। রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
গত জুন মাসে অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিওর ১২তম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে (এমসি-১২) এলডিসিভুক্ত দেশগুলোর জন্য প্রাপ্তি কী ছিল সে বিষয়ে আলোকপাত করার জন্য ‘ডব্লিউটিও-এমসি ১২ আউটকামস : নেকস্ট স্টেপস ফর বাংলাদেশ অ্যাজ এ গ্রাজুয়েটিং এলডিসি’ শীর্ষক এ সেমিনার আয়োজন করা হয়।
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব তপন কান্তি ঘোষ, অতিথি ছিলেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। বক্তব্য দেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক হাফিজুর রহমান।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয় ডব্লিউটিও মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন। সেখানে কোভিড ও বর্তমান পরিস্থিতিতে এলডিসি উত্তরণ ঘটতে যাওয়া দেশগুলোর জন্য সমবেদনা জানানো হয়। কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, এর আগে ৬টি দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলেও সেগুলো ছোট দেশ এবং জনসংখ্যাও কম। আর্ন্তজাতিক অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকাও ছিল কম। কিন্তু বাংলাদশে এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। কেননা বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ব্যাপক। সেই সঙ্গে আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে এলডিসি দেশ হওয়ার যেসব সুবিধা বিদ্যমান সেগুলোর সর্বোত্তম ব্যবহার করছে বাংলাদেশ। কিন্তু এলডিসি উত্তরণের পর কোটামুক্ত ও শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল হবে। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রেই বাণিজ্য সুবিধা কমবে। সেই সঙ্গে ওষুধ শিল্পের প্যাটেন্ট সুবিধাও একটি নিদিষ্ট সময়ের পর বাদ যাবে। স্বল্প সুদের ঋণ কমে যাবে। এতগুলো ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তুতি হতে হবে সেই রকমই। কেননা শূন্য ট্যারিফ সুবিধা বাতিল হলে রপ্তানিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। তবে এলডিসি থেকে উত্তোরণের পরও ডব্লিউটিওর কাঠামোর মধ্যে কিছু সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশ যেহেতু এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে, কাজেই এখন থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে বাংলাদেশ যেসব নীতি প্রণয়ন করবে সেগুলো একটি উন্নয়নশীল দেশের নীতিমালার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য ডব্লিউটিও সেলের আদলে একটি নেগোশিয়েশন সেল গঠন করা যেতে পারে। বাংলাদেশকে নতুন নতুন রপ্তানি গন্তব্যের অনুসন্ধান করতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর ও পণ্যের বহুমুখীকরণ করা জরুরি।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে তিনটি বিষয় আমাদের পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। এগুলো হলো-এলডিসি থেকে উত্তোরণ, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জন ও কভিডের অভিঘাত থেকে পুনরুদ্ধার। জাতীয় পরিকল্পনা দলিল অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বা অন্য কোনো পরিকল্পনা দলিলে এগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আমাদের একটি পরিকল্পনা দলিল দেখেই সব অগ্রাধিকার ও উদ্যোগগুলো সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তোরণের পর বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে জিএসপি সুবিধা হারাবে। কিন্তু সে সময় জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সে সুযোগ পাওয়ার জন্য নানা ধরনের সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। এখন থেকেই সেই পদক্ষেপ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।’ বাণিজ্য সংগঠনগুলোর গবেষণা কার্যক্রমে জোর দেওয়া উচিত। পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার ওপর কর আরোপের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে।
তপন কান্তি ঘোষ বলেন, এবারের মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য আশাবাদী হওয়ার মতো কোনো আলোচনা হয়নি। সম্মেলনে যে প্রক্রিয়ায় আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, সেখানে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কোনো ভূমিকাই ছিলো না। বিশেষ করে চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনায় এলডিসিগুলোকে একপ্রকার উপেক্ষা করা হয়েছে। এ ধরনের আচরণে আমরা যারপরনাই হতাশ। বাংলাদেশকে এখন থেকেই পণ্যের বহুমুখীকরণ ও নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। আর এলডিসি থেকে উত্তোরণের পর বাংলাদেশ ইউরোপের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা হারাবে। ফলে রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে হবে। পণ্যের বহুমুখীকরণের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, তৈরি পোশাক খাতেও মনুষ্য সৃষ্ট ফাইবারের ব্যবহার বৃদ্ধিসহ নতুন নতুন পণ্য উদ্ভাবনের দিকে নজর দিতে হবে।
হাফিজুর রহমান বলেন, ডব্লিউটিও থেকে আমাদের খুব বেশি প্রত্যাশা করা ঠিক হবে না। এবারের মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে আমাদের তেমন উপলব্ধি হয়েছে। এবারের সম্মেলনে যে ১০টি ঘোষণা এসেছে তার মধ্যে চারটিই কভিড-পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধার-সংক্রান্ত। সেখানে এলডিসিভুক্ত দেশগুলো নিয়ে তেমন কোনো আলোচনাই ছিল না। বিষয়টি আমাদের জন্য হতাশা ব্যঞ্জক। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে স্বউদ্যোগে এগিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
জসিম উদ্দিন বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এলডিসিভুক্ত দেশগুলো চ্যালেঞ্জ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে দেশে নতুন স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগ বিঘ্নিত হচ্ছে। এলডিসি থেকে উত্তোরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য তিনি রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, দক্ষতার উন্নয়ন, শুল্ক যৌক্তিকীকরণ ও জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে দরকষাকষির সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।
