বৈষম্য দূর করতে পারলে সমাজে অস্থিরতা কমবে

  হাসান আজিজুল হক ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বৈষম্য
বৈষম্য। প্রতীকী ছবি

সমাজ মানেই কিছু মানুষ একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বসবাস করে। নির্দিষ্ট গণ্ডিগুলো ছোট ছোট। কিন্তু তার থেকে বড় গণ্ডি মানুষই তৈরি করে। সমাজের প্রয়োজনেই এগুলো তৈরি হয়। সমাজে মানুষের মধ্যে যে অস্থিরতা আছে সেটি স্বভাবগত। এ অস্থিরতা মোটামুটি চাপা দিয়ে মানুষের যে সমাজটা তৈরি করা হয়েছে, সেটা যাতে স্থির থাকে সে চেষ্টা করা হয়।

কিন্তু আমরা এক অর্থে বলতে পারি, পৃথিবীটাই তো অস্থির, সংস্কৃতি তো অস্থির হবেই। সমাজের সংগঠন যেমন হবে, এর সঙ্গে সঙ্গে তার মূল্যবোধগুলো তৈরি হবে। অনেক মূল্যবোধ আছে যেগুলো তৈরি হয়েছে বা তৈরি হচ্ছে; সেগুলোকে আমরা বলি নিয়ম। যেমন অস্থিরতা। কোনো ঘটনা যদি না ঘটে, তাহলে আমরা মনে করি সমাজ স্থির আছে।

সমাজের সব কিছু স্থির। আর যখনই আমরা দেখি মানুষ খুন হয়েছে, নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তখন আমরা বলি, সমাজে চরম নৈরাজ্য দেখা দিয়েছে। সবকিছুর কারণ কিন্তু সামাজিক সংগঠন। যে সংগঠনের মধ্যে আমরা বসবাস করি, সেই সামাজিক সংগঠনের ভেতরেই এর কারণগুলো নিহিত আছে।

এটাও ঠিক যে, পৃথিবীতে সমাজহীনভাবে মানুষ বাঁচতে পারবে না। সমাজে বসবাস করতে হলে সেই সমাজের কতগুলো নিয়মনীতি মেনে চলতেই হবে। তা না হলে মানুষ একে অপরকে খুন করবে। এটাকে স্টেট অব নেচার বলে। প্রকৃতির রাজ্য। প্রকৃতিতে আমরা দেখতে পাই বলবান, সামর্থ্যবানরা টিকতে পারে। আর যারা গরিব তারা টিকতে পারে না, দুর্বলরা জিততেও পারে না। সুন্দরবনে দুর্বল হরিণকে যেভাবে বাঘে খায়। আবার নিজস্ব কারণেও বাঘ ধ্বংস হয়।

কাজেই পৃথিবীতে একদম স্থির বা স্থায়ী বলে কোনো জিনিস নেই। সমাজ প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা খেয়াল করছি বা করছি না। কতগুলো পরিবর্তন হচ্ছে- সেগুলো খুবই নীরবে হচ্ছে। একজাতীয় মানুষ ভালো করে টেরও পাচ্ছেন, সমাজে এই পরিবর্তনগুলো ঘটছে। সংস্কৃতিরও পরিবর্তন হচ্ছে, একটি সংস্কৃতির বিবর্তনে নানা সংস্কৃতি হয়েছে।

আমাদের এই বাঙালি সংস্কৃতির কত রকম বিবর্তন। তার মানে হচ্ছে, বিভক্তিই নিয়ম। অস্থিরতাই কিন্তু নিয়ম। এই অস্থিরতাকে মেনে নিয়ে মোটামুটি একটা গণ্ডির মধ্যে একে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে মোটামুটিভাবে এই সমাজটা স্থায়ী হয়, স্থির থাকে। সেগুলো যদি ভেঙে যায়, নতুন যতদিন তৈরি না হবে ততদিন পর্যন্ত সমাজ অস্থির হবেই হবে।

মানুষের সমাজ উন্নত হয়েছে কেমন করে? সেটা হচ্ছে পরিবার। পরিবার প্রথা না থাকলে সভ্য সমাজ থাকত না। তাহলে তো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে কিছুতেই আমরা সমাজকে মানতে পারতাম না। সমাজকে কতগুলো প্রথা দিয়ে বেঁধে রেখেছি। এই প্রথাগুলোকে কখনও কখনও নিয়ম বলি।

যখন খুবই প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রথাগুলোকে অবলম্বন করি এবং আইন তৈরি করি। কিন্তু আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যত্নবান হই না। আইন কে ভঙ্গ করছে না করছে, শাস্তি দিতে হবে কী হবে না- সে বিষয়ে খেয়াল থাকে না।

এ সবকিছুকে নিয়েই একটা রাষ্ট্র হয়। আমাদের বাংলাদেশ রাষ্ট্র এতসব সিঁড়ি পার করে এত উপরে উঠেছে। আমরা বাংলাদেশের দিকে তাকালে তা দেখতে পাই। এর সংস্কৃতিরও নানা রকমের পরিবর্তন ঘটেছে। কখনও সেগুলোকে বলি অস্থির অবস্থা, কখনও বলি স্থির।

সমাজ সংগঠনের মধ্যে যখন গোলযোগ দেখা দেয়, বিরোধিতা দেখা দেয়, মানুষ যখন একসঙ্গে বসবাস করার জন্য একটা স্থিতি পায় না, তখনই সেই সমাজ সংগঠনগুলো ভাঙতে শুরু করে। আমাদের সমাজের কথাও তা-ই।

আমাদের এই দেশটা উপনিবেশ ছিল। কোনো একটা সময় স্বাধীন রাজ্য ছিল, তারপর উপনিবেশ ছিল, অঙ্গরাজ্য ছিল, তারপর ভাগ হয়েছে। ভারত ভাগ হওয়ার পর আবার বাংলা ভাগ হয়েছে। বাংলা এখন এপার বাংলা, ওপার বাংলা। ওপার বাংলাকে আমরা বলি পশ্চিমবাংলা।

আমাদের অংশ হয়েছে বাংলাদেশ। এসব যখন ঘটেছে তখন কি সমাজে অস্থিরতা দেখা দেয়নি? তখনকার সমাজে যে মানুষ বসবাস করত, তারা অত্যন্ত ডিস্টার্বড্, অত্যন্ত বিপর্যস্ত বোধ করেছে।

পুরনো মানুষ যারা, তারা এসব ভালো করেই জানে। তারপর যখন সত্যিকারেই একটা রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে গেল; ২৩ বছরের একটা উপনিবেশ- পাকিস্তান উপনিবেশ করেছিল, আমাদের এখানে যা কিছু সম্পদ ছিল সেগুলো লুট করে নিয়ে গিয়েছিল। অস্থিরতার মূলটা ওখানে ঢুকে গেছে।

এই অস্থিরতা পূর্ণতা পেয়ে এমন একটা জায়গায় পৌঁছাল যে তখন আমরা বললাম, ওদের সঙ্গে আমরা একত্র থাকব না, অর্থাৎ সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হল, ওদের বিরুদ্ধে আমরা মুক্তিযুদ্ধে নেমে গেলাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশ পেলাম। স্বাধীন বাংলাদেশ হওয়ার পর এই রাষ্ট্রও একটা নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক।

আমরা একটু পেছনের দিকে তাকালেই দেখব, এক অর্থে সমাজ সবসময়ই অস্থির। যে মুহূর্তটা পার হয়ে যায় তার পরের মুহূর্তটা কিন্তু ওই মুহূর্তটাকে পেরিয়ে গেছে। ওটা কিন্তু অতীত হয়ে গেছে, স্থির হয়ে গেছে; ওটাকে বদলানোর সুযোগ নেই। বদলানোর উপায় নেই।

যে অতীতটা পার করে এসেছি, সেটিকে ফিরিয়ে এনে যে ঠিকঠাক করে নেব, তা সম্ভব নয়। এটার আর গতি নেই। সময় যেন এভাবেই প্রতিনিয়ত স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে। ফিরে আসছে না কখনও। যা বয়ে যাচ্ছে তা বয়েই যাচ্ছে।

সমাজেরও গতি ঠিক সেরকমই। বর্তমানে সমাজে অস্থিরতা দেখছি কেন? কারণ সমাজের সংগঠনগুলোতে নানা রকম বিরোধ তৈরি হয়েছে। পরস্পরের মধ্যে যে মানবিক সম্পর্ক, সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক সম্পর্ক, সেটাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রিক যে সম্পর্ক, সেটিও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

সমাজের ভেতরে যারা সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে, তারা তো সবাই একরকম নয়, তাদের মনোভাবও একরকম নয়। তবুও তো আমরা সমাজে বসবাস করি। সমাজে বসবাস করতে হয়। কতগুলো বিষয় আছে, যা আমাদের জন্য জরুরি নয়, আবার কতগুলো আছে, যা না থাকলে চলবে না বলা হয়। যার জন্য আইন তৈরি করতে হয়। সমাজের অস্থিরতা প্রতিদিন খবরের কাগজে দেখি।

সমাজের তৈরি করা নিয়মগুলো এবং বাংলাদেশে তৈরি নিয়মগুলো প্রতিনিয়ত অনেকেই লঙ্ঘন করছে। কোনো তোয়াক্কা করছে না। যেগুলো রাষ্ট্রীয় নিয়ম ও আইন, সেগুলোরও তোয়াক্কা করছে না। এজন্যই লুটপাট বেড়ে যাচ্ছে। এগুলো গায়ের জোরেই হচ্ছে। হত্যাকাণ্ড, কখনও গুপ্ত হত্যাকাণ্ড, কখনও ধর্মীয় হত্যাকাণ্ড। এটা শরীরের তাপমাত্রার মতো- কখনও বাড়ে, কখনও কমে। সেটার কারণ হল সামাজিক অস্থিরতা।

সামাজিক অস্থিরতার কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সমাজের সব লোক যদি অনশনে থাকে, আর চার ভাগের একভাগ যদি এই অনশনকারীদের খাবারটা খেয়ে নেয় বা নষ্ট করে দেয়, যদি অন্য দেশে চালান করে দেয়, তাহলে যারা অনশনে থাকে, তারা কতদিন এটা সহ্য করবে?

বর্তমান সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে যেটা লক্ষ করা যায়- অসম্ভব রকমের অপহরণ, অপরের জিনিস অপহরণ, সেই সঙ্গে অসম্ভব রকমের নৈতিক স্খলন। ভীষণ রকমের নৈতিক স্খলন। এর মধ্যে দেখা যায়, নৈতিক আইন নয়, মানুষের তৈরি করা আইন কিছু নৈতিক আইন বদলায়।

একটা সময় যখন মানুষের সমাজ ছিল না, তখন নর-নারীর মধ্যে বিশেষ সম্পর্ক, পারিবারিক সম্পর্ক, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক- এ ব্যাপারগুলো ছিল না। সমাজে এসবের বাইরে গেলেই আমরা বলি সামাজিক অস্থিরতা। বলি সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে।

এজন্য বাড়িতে বাড়িতে লুটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আগে এটা ছিল না। লুট করা, সেই সঙ্গে খুন করা। তারপর সেই বাড়ির মহিলাদের ধর্ষণ করা। কুমারী মেয়েদের একা পেলে ধর্ষণ করা। শুধু তাই নয়, অল্পবয়সী শিশুরাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। এতেই বোঝা যায় সমাজ কতটা বিকৃত, নষ্ট হয়ে গেলে এরকম ঘটে। এটা আইন দিয়ে ঠেকানো যাবে কতকটা, হয়তো খানিকটা।

সমাজে মানুষে মানুষে ধনসম্পদের যে বৈষম্য, তা যদি মোটামুটি একটা সহনীয় পর্যায়ে আনতে পারা যায়, তাহলে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধ অনেকটা কমে আসবে। অস্থিরতা কমে আসবে। অস্থিরতা দেখা দিলে সাধারণ মানুষ এগুলো রুখে দাঁড়াবে।

তবে মানুষের যে প্রতিরোধ স্পৃহা, সেটিও নষ্ট হয়ে গেছে। তার মানে সমাজটাই একটা জীর্ণ দশার মধ্যে চলে গেছে। মানুষ কিছুতেই মানুষকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় না। দয়া, মায়া এসব ভালো প্রবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে লোভ, ঈর্ষা, হিংসা ইত্যাদি ইতর প্রবৃত্তি আছে। এগুলোর বৃদ্ধি ঘটে কখন? যখন বৈষম্য দেখা যায়। তখন সমাজের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ে।

এটাকেই আমরা বলছি সিম্বলিক অস্থিরতা। এটাকেই আমরা বলছি সামাজিক অস্থিরতা। কাজেই সমাজের বৈষম্যগুলো যদি দূর করতে পারা যায়- শিক্ষার বৈষম্য, প্রতিভার বৈষম্য, সম্পদের বৈষম্য যদি অন্তত কমিয়ে আনা যায়, তাহলে অস্থিরতা কমে আসবে। তবে অবাস্তব কল্পনার দিকে গেলে চলবে না। যেমন, একদম সমান করে দাও। এটা সম্ভব হবে না। না হোক, তবু বৈষম্যগুলো কমিয়ে আনতে হবে।

আমাদের দেশে যে সম্পদ আছে তার কিছু ব্যবহার হয়, কিছু হয় না। জমি কিছু চাষ হয়, কিছু হয় না। এসব যদি ঢেলে সাজানো যায়, তার অর্থনৈতিক চেহারাটি বদলে ফেলা যায়, তাহলে সমাজের অস্থিরতা কিছুটা কমে আসবে।

আগে যে সরকারগুলো ছিল তাদের সময় কিন্তু সমাজ আরও বেশি অস্থির ছিল। তুলনামূলকভাবে সমাজ থেকে সেই অস্থিরতা কমে আসছে।

(অনুলিখন)

হাসান আজিজুল হক : কথাসাহিত্যিক ও লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×