Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সৎ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা কেন

Advertisement

Icon

স্নেহাশীষ বড়ুয়া

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রাজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি করা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রতিবছরই প্রত্যক্ষ করনীতিতে নানা পরিবর্তন এনে থাকে। তবে কর সংস্কারের মূল সুর হওয়া উচিত করজাল সম্প্রসারণ এবং সৎ করদাতাদের উৎসাহিত করা। কিন্তু যখন কোনো আইনি বা কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে সৎ ও নিয়মিত করদাতাদের ওপর হঠাৎ মাত্রাতিরিক্ত করের বোঝা চেপে বসে, তখন তা অর্থনীতির জন্য বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে।

২০২৬-২৭ করবর্ষে এসে উচ্চ আয়ের ব্যক্তি করদাতারা, বিশেষ করে শীর্ষস্থানীয় করপোরেট পেশাজীবীরা, ঠিক এমনই এক নজিরবিহীন করের চাপের মুখে পড়েছেন। একদিকে আয়করের হার ও কাঠামোর রদবদল, অন্যদিকে সম্পদ সারচার্জ গণনার নিয়মে একটি আপাত-ছোট কিন্তু সুদূরপ্রসারী আইনি পরিবর্তন এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

সারচার্জ গণনায় ‘সূক্ষ্ম’ কিন্তু বড় পরিবর্তন : দেশের আয়কর আইন অনুযায়ী কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার নিট সম্পদের পরিমাণ ৪ কোটি টাকা অতিক্রম করলে তাকে প্রদেয় আয়করের ওপর নির্দিষ্ট হারে (১০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত) সম্পদ সারচার্জ দিতে হয়। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ করবর্ষ পর্যন্ত প্রচলিত নিয়মটি ছিল বেশ যুক্তিযুক্ত ও সহজবোধ্য। আইন অনুযায়ী করদাতার করযোগ্য আয়ের ওপর নিয়মিত করের হার প্রয়োগের পর তিনি যেসব অনুমোদিত খাতে (যেমন-পুঁজিবাজার, সরকারি ট্রেজারি বন্ড, সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি) বিনিয়োগ করেছেন, তার বিপরীতে প্রাপ্য ‘বিনিয়োগ কর রেয়াত’ বাদ দেওয়া হতো। রেয়াত বাদ দেওয়ার পর যে প্রকৃত কর বা নিট প্রদেয় কর অবশিষ্ট থাকত, তার ওপর নিট সম্পদের ভিত্তিতে সারচার্জ হিসাব করা হতো। কিন্তু অর্থ আইন ২০২৫ ও ২০২৬-এর মাধ্যমে সারচার্জের অনুচ্ছেদে ভাষা পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন নিয়মে বলা হয়েছে-কর রেয়াত বাদ দেওয়ার আগেই করযোগ্য আয়ের ওপর সরাসরি করহার প্রয়োগ করে যে ‘গ্রস কর’ হিসাব হবে, সারচার্জ বসবে সেই পুরো অঙ্কের ওপর! অর্থাৎ, একজন করদাতা দেশীয় অর্থনীতি বা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে কর রেয়াত পেলেও সারচার্জ আরোপের ক্ষেত্রে সেই রেয়াতকে কার্যত উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে করদাতাকে এমন একটি অংশের ওপরও ২০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ দিতে হচ্ছে, যা প্রকৃতপক্ষে তার প্রদেয় করই ছিল না।

২০২৬-২৭ করবর্ষে উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর চতুর্মুখী আঘাত

এই একটি পরিবর্তনই শেষ নয়; ২০২৬-২৭ করবর্ষে উচ্চ আয়ের পেশাজীবীদের ওপর একইসঙ্গে চারটি বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে : ১. ব্যক্তি শ্রেণির সর্বোচ্চ আয়করের হার ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। ২. সর্বনিম্ন করের ৫ শতাংশের ধাপটি তুলে দেওয়ায় শূন্য করসীমার পরপরই করদাতাদের সরাসরি ১০ শতাংশ হারে কর দিতে হচ্ছে। ৩. দেশের আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার প্রধান হাতিয়ার হলো বিনিয়োগ কর রেয়াত। অথচ এর সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে এক ধাক্কায় কমিয়ে ৭.৫ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে এবং রেয়াতের হারও যৌক্তিকীকরণ করা হয়েছে। ৪. কর রেয়াতের সুবিধা ছোট করার পরও অবশিষ্ট করের বদলে রেয়াতপূর্ব সম্পূর্ণ করের ওপর বর্ধিত সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।

বাস্তব চিত্র : এক বছরে কর বাড়ল ২৫ লাখ টাকারও বেশি

আইনের এ পরিবর্তনের আর্থিক প্রভাব কতটা গভীর, তা একটি সহজ উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব। ধরা যাক, একটি বহুজাতিক কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিস্টার রহমান। তার বার্ষিক বেতন ও বোনাস বাবদ মোট আয় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তিনি কর ছাড় পাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশের অনুমোদিত সিকিউরিটিজে ৭৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তার নিট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১২ কোটি থেকে ১৪ কোটি টাকা, যার কারণে তিনি ২০ শতাংশ সারচার্জের আওতায় পড়েন। হিসাব করে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ করবর্ষে একই আয়ের বিপরীতে মিস্টার রহমানের মোট আয়কর ও সারচার্জ বাবদ প্রদেয় ছিল প্রায় ৯৭ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। অথচ আয় একই থাকা সত্ত্বেও ২০২৬-২৭ করবর্ষে এসে তাকে কর ও সারচার্জ বাবদ পরিশোধ করতে হবে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ ৮২ হাজার টাকা!

মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তার করের বোঝা বেড়েছে ২৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা বা প্রায় ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু সারচার্জের পরিমাণই বেড়েছে প্রায় ৫ লাখ ৪৫ হাজার টাকা (+৩৩.৫৪ শতাংশ)। ফলে তার মোট আয়ের প্রায় ৩২ দশমিক ৩ শতাংশই চলে যাচ্ছে কর ও সারচার্জের পেছনে।

যে নেতিবাচক প্রভাবগুলো দৃশ্যমান হতে পারে

মাত্রাতিরিক্ত করভার কখনো টেকসই রাজস্ব আয়ের নিশ্চয়তা দেয় না, বরং অর্থনীতিতে নানা ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। যেমন-

সৎ বেতনভোগীদের ওপর বৈষম্য : বহুজাতিক বা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আয় শতভাগ আনুষ্ঠানিক এবং উৎস থেকেই সম্পূর্ণ কর কেটে (TDS) নেওয়া হয়। তাদের কোনো আয় গোপনের সুযোগ থাকে না। ফলে এ অতিরিক্ত করভার কার্যত সৎ করদাতাদের ওপর এক ধরনের আর্থিক শাস্তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সম্পদ অপ্রদর্শিত রাখার ঝুঁকি : নিট সম্পদ ৪ কোটি, ১০ কোটি বা ২০ কোটি টাকার সীমা পেরোলেই যদি অতিরিক্ত লাখ লাখ টাকার সারচার্জ গুনতে হয়, তবে অনেকেই বৈধ পথে অর্জিত সম্পদকে অবমূল্যায়ন করে দেখানো কিংবা অপ্রদর্শিত রাখার ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটতে পারেন। এতে সমাজে অপ্রদর্শিত অর্থের বিস্তার বাড়বে।

মূলধন বাজার ও আনুষ্ঠানিক বিনিয়োগে অনাগ্রহ : বিনিয়োগ করে যদি কোনো করদাতা কর রেয়াত পান, কিন্তু সেই রেয়াতের অঙ্কের ওপরও পরোক্ষভাবে সারচার্জ দিতে হয়, তাহলে পুঁজিবাজার বা বন্ডের মতো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের প্রণোদনা নষ্ট হয়ে যাবে।

মেধা ও মূলধন পাচারের শঙ্কা : শীর্ষস্থানীয় পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের ওপর অস্বাভাবিক করভারের ফলে ব্রেন ড্রেন এবং বিদেশে মূলধন পাচারের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।

নমনীয়তার দৃষ্টান্ত ও সরকারের কাছে প্রত্যাশা

নীতি প্রণয়ন একটি গতিশীল প্রক্রিয়া। মাঠপর্যায়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনুধাবন করে নীতি সংশোধন করা সরকারের প্রজ্ঞারই লক্ষণ। বর্তমান সরকার সম্প্রতি অর্থ আইন ২০২৬ পাসের পরও ব্যবসায়ীদের বাস্তব সংকট বিবেচনায় নিয়ে বিক্রয়ের ওপর ন্যূনতম কর হ্রাস করে একটি প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একই ধরনের বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি সারচার্জের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত জরুরি। সারচার্জ কোনো একক কর নয়, এটি আয়করের ওপর একটি বাড়তি লেভি। তাই এর ভিত্তি হওয়া উচিত করদাতার ‘প্রকৃত প্রদেয় নিট কর’, রেয়াত-পূর্ব গ্রস কর নয়। একটি সামান্য এসআরও’র মাধ্যমে সারচার্জ গণনার এ ভিত্তিটিকে আগের নিয়মে (রেয়াত-পরবর্তী প্রদেয় করের ওপর) পুনর্বহাল করা হলে তা রাজস্ব আদায়ে বিরাট কোনো ঘাটতি তৈরি করবে না; বরং সৎ করদাতাদের আশ্বস্ত করবে, আনুষ্ঠানিক খাতে সম্পদ ঘোষণাকে উৎসাহিত করবে এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখবে।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এসএমএসি এডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেড

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

নিউইয়র্কের চিঠি প্রবাসী বাঙালির অর্থহীন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয়

প্রবাসী বাঙালির অর্থহীন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয়

সৎ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা কেন

সৎ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা কেন

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম