নিউইয়র্কের চিঠি
প্রবাসী বাঙালির অর্থহীন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয়
Advertisement
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
উন্নত দেশগুলোতে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অবদান। তাদের জীবনমানের উন্নতি ঘটেছে এবং আমেরিকান মূলধারায় তাদের সন্তানদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কিছু অর্থহীন কর্মকাণ্ডও হাস্যকর ও সংক্রামকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নব্বইয়ের দশক থেকে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের অন্যতম আকর্ষণীয় দেশে পরিণত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৯ সালে সংক্ষিপ্ত মেয়াদের জন্য চালু করা ‘ওপি-১ ভিসা’ কর্মসূচি এবং ১৯৯০ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদের জন্য চালু করা ‘ডিভি ভিসা’ কর্মসূচি চালু করার ফলে। এ দুটি কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ থেকে অন্তত ৫০ হাজার আবেদনকারী ও তাদের পরিবার বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। অন্যান্য ভিসা ক্যাটাগরিতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছেন। অবৈধভাবেও প্রচুর বাংলাদেশি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।
‘ডিভি ভিসা’ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হওয়ার কোটা পূর্ণ হওয়ায় ২০১২ সালের পর এ কর্মসূচিতে বাংলাদেশ থেকে বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বন্ধ হয়েছিল। সিকি শতাব্দী কেটে যাওয়ার পর এ ভিসা কর্মসূচিতে আবারও বাংলাদেশিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে বৈধ অভিবাসনের সুযোগ আসছে বলে জানা গেছে। গত সাড়ে তিন দশকে যেসব বাংলাদেশি এদেশে থিতু হয়েছেন, তারা তাদের নিজস্ব পেশাগত কাজকর্মের বাইরে গড়ে তুলেছেন মসজিদ, মন্দির, স্কুল, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং গঠন করেছেন নানা আঞ্চলিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও জনবহুল সিটি নিউইয়র্ক, যেখানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অধিক। এখানে ছোট-বড় যে কোনো কাজের সুযোগ প্রায় অবারিত এবং অভিবাসীবান্ধব ডেমোক্রেট নিয়ন্ত্রিত নগরী হওয়ার কারণে নিউইয়র্ক সিটি বাংলাদেশিসহ বহু দেশের বৈধ-অবৈধ অভিবাসীদের জন্য অনেকটা ‘অভয়ারণ্য’। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের অর্ধেকই বসবাস করেন নিউইয়র্ক সিটিতে। এ সংখ্যা আনুমানিক দেড় লাখ।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, নিউইয়র্ক সিটিতে বাংলাদেশিদের প্রায় তিনশ আঞ্চলিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে। এ সংগঠনগুলোর অধিকাংশই জেলা-উপজেলাভিত্তিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক, পেশাভিত্তিক; এমনকি বাংলাদেশে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের ব্যাচভিত্তিক সংগঠনও আছে। এসব ছাড়া নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ বিভাগ, নিউইয়র্ক সিটি প্রশাসনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাংলাদেশিদেরও পৃথক সমিতি রয়েছে। কোনো কোনো জেলা ও উপজেলাভিত্তিক সংগঠনে নেতৃত্বের কোন্দলে, তহবিল তছরুপের অভিযোগে একই জেলা-উপজেলার নামে একাধিক সংগঠনের আবির্ভাব ঘটেছে। অভিন্ন কারণে বাংলাদেশিদের দ্বারা পরিচালিত মসজিদ-মন্দির কমিটিতে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে এবং কাছাকাছি দূরত্বে নতুন মসজিদ গড়ে ওঠার দৃষ্টান্তও আছে। লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এসব সংগঠনের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের কোনো সংস্রব বা সম্পর্ক নেই।
নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশিদের গড়ে তোলা বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে ব্যতিক্রম হিসাবে বিবেচনা করা হয় ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’কে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৭৫। বাংলাদেশ সোসাইটির ভোটার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার। যেসব বাংলাদেশি আমেরিকান নাগরিকত্ব লাভ করেছেন, গ্রিন কার্ড বা স্থায়ী বসবাসের জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং যারা যুক্তরাষ্ট্রে অন্যান্য ক্যাটাগরিতে বৈধতা নিয়ে বসবাস করছেন, কেবল তারাই এ সংগঠনের সদস্য হতে পারেন। আগামীকাল বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন ঘিরে নিউইয়র্কজুড়ে বাংলাদেশিদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সোসাইটির কার্যনির্বাহী পদসংখ্যা একুশ। দুটি প্যানেলে প্রার্থীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কমিটির মেয়াদ আগে দুই বছরের জন্য থাকলেও আগামী কমিটি হবে তিন বছরের জন্য। নিউইয়র্ক সিটিতে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে পাঁচটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
বিপুলসংখ্যক সদস্যসমৃদ্ধ পাঁচ দশকের পুরোনো একটি সংগঠনের নির্বাচন নিয়ে লেখা এ নিবন্ধের শিরোনামে অনেকের মাঝে সংশয়ের সৃষ্টি হতে পারে। অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশ সোসাইটি যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য অনেক মানবিক কার্য সম্পাদনে নিয়োজিত, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে নির্বাচিত কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগও অনেক। এ নির্বাচনে প্রার্থীরা কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছেন, তা যুগপৎ সংশয় সৃষ্টি করে এবং প্রশ্ন জাগায়। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া থেকে শুরু করে নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যয়ের পরিমাণ ২০ লাখ ডলারে দাঁড়াবে বলে উল্লেখ করেছে নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৫ কোটি টাকা। মনোনয়ন ফি’র দিকে দৃষ্টি দিলে যে কারও মনে প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক-প্রবাসীদের একটি সামাজিক সংগঠনের কমিটি নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পেছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?
বাংলাদেশ সোসাইটির ২০২৬ সালের নির্বাচনি তফসিল অনুযায়ী সভাপতি পদের জন্য অফেরতযোগ্য জামানত ৬ হাজার ডলার, সিনিয়র সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে ৫ হাজার, সহ-সভাপতি পদে সাড়ে ৪ হাজার, সহ-সাধারণ সম্পাদক পদে ৩ হাজার ২০০, কোষাধ্যক্ষ পদে ৩ হাজার এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ২ হাজার ৫০০ ডলার। অন্যান্য পদে ২ হাজার এবং কার্যকরী সদস্য পদে ১ হাজার ৫০০ ডলার। তাছাড়া প্রতিটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহের জন্য প্রার্থীদের ৫০০ ডলার করে ফি দিতে হয়েছে। মনোনয়নপত্র বিক্রয় ও জমা খাতে প্রার্থীদের মোট ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ডলার। প্রার্থীদের বাদবাকি ব্যয় হবে প্যানেলভিত্তিক ও ব্যক্তিগত নির্বাচনি প্রচারণায়।
নিউইয়র্ক সিটির বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলো পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে। গত আড়াই মাস ধরে প্যানেলভিত্তিক মতবিনিময় সভাগুলো অনেক ক্ষেত্রে জনসমাবেশের রূপ নিয়েছে এবং নিউইয়র্কে বাংলাদেশিদের যে কোনো সমাবেশে ভোজে আপ্যায়ন করা প্রচলিত রীতিতে পরিণত হয়েছে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনের মতো উপলক্ষ্য এলে ভোটার আপ্যায়নে প্রার্থীরা উদারহস্ত হয়ে পড়েন। ভোটাররা আপ্যায়িত হতে দ্বিধা করেন না, কারণ বাংলাদেশের নির্বাচনি সংস্কৃতিতে অভ্যস্তরা ধরেই নেন যে, যারাই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দায়িত্ব পালন করবেন, তারা কোনো না কোনো কৌশলে তাদের নির্বাচনি ব্যয় তুলে নেবেন। অনেকে দায়িত্বকে লাভজনক করে তুলতে পারেন। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। বাংলাদেশ সোসাইটিও এর ব্যতিক্রম নয়।
বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে অর্থ ব্যয়কে ‘হরিলুট’ বলে বর্ণনা করেছেন তিন দশকের অধিক সময় ধরে নিউইয়র্কে বসবাসকারী হাবিব রহমান, যিনি শতাধিক দেশ ভ্রমণ ও ভ্রমণবিষয়ক সাতটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করে ‘বাঙালি ইবনে বতুতা’ খ্যাতি পেয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘হরিলুট’ শব্দটি বহু বছর গ্রাম-বাংলার উঠোনে নিরীহভাবে পড়েছিল। একদিন ভিসা ছাড়াই আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে সোজা ঢুকে গেল বাংলাদেশ সোসাইটির লাখো ডলারের হিসাবের খাতায়। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, সোসাইটির কয়েক লাখ ডলার ব্যয় হরিলুটের শামিল। অর্থের অঙ্ক শুনে সবার চোখ কপালে। কেউ বলছেন, ‘এত টাকা!’ কেউ বলছেন, ‘এ তো ছোটখাটো একটি মসজিদ বা মন্দির নির্মাণের বাজেট!’ কেউ কেউ চুপিচুপি ক্যালকুলেটরে হিসাব করছেন, ‘মাথাপিছু আমার ভাগে কত পড়ত!’
স্থানীয় কমিউনিটি সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই বাংলাদেশ সোসাইটির কর্মকাণ্ড, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না করা, আয়-ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতার অভাব এবং কোনো কোনো নির্বাহীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রকাশ ও প্রচার হয়ে আসছে। নির্বাহীরা বরাবর তাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রবাসীদের মাঝে প্রশ্ন ওঠে, সোসাইটির তহবিলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণে অর্থ জমা হয়, সেগুলো কোথায় যায়? এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর কখনো মেলেনি। প্রশ্ন শুধু তহবিল নয়-ছয় করা নিয়ে নয়, তাদের আরও প্রশ্ন আছে। এতবড় একটি সংগঠন, তাদের কাজের পরিসর এত সংকীর্ণ কেন? তাদের কাজ কি কেবল জাঁকজমকপূর্ণ অভিষেক অনুষ্ঠান, বার্ষিক বনভোজন ও ইফতার পার্টি আয়োজন, সহায়-সংগতিহীন কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি মারা গেলে তাকে কবরস্থ করার ব্যবস্থা এবং অসহায় পরিবারকে মানবিক সহায়তা করা? অভিবাসনের ঝামেলায় পড়া কোনো বাংলাদেশিকে আইনগত সহায়তা করতে তারা এগিয়ে আসে না, বেকারের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেয় না, বাংলাদেশি পরিবারে ডমেস্টিক ভায়োলেন্সের ঘটনা প্রতিরোধেও তাদের কোনো কর্মসূচি নেই। সোসাইটির নির্বাহীরা কি কেবল তাদের পরিচিতিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার জন্যই সংগঠনটিকে ব্যবহার করেন?
আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : সিনিয়র সাংবাদিক
