প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন কার স্বার্থে?

  ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন

কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসক নির্যাতন আজকাল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে জনসাধারণের সুচিকিৎসার স্বার্থে বারবার চিকিৎসক সুরক্ষা আইনের দাবি জানানো হলেও যথাযথভাবে তা কখনও মেনে নেয়া হয়নি।

স্বাস্থ্যসেবা আইন-২০১৪ নামে ২০১৪ সালে একটি আইনের খসড়া প্রস্তাব করা হয়েছিল; যার ফলে সুরক্ষার পরিবর্তে চিকিৎসক নিগ্রহের ঝুঁকিই বেশি ছিল। চিকিৎসকদের প্রতিবাদের মুখে সেই প্রস্তাবিত আইনের কিছুটা ঘষামাজা হলেও এখনও গ্রহণযোগ্যতার পর্যায়ে পৌঁছেনি। সম্প্রতি আমরা প্রস্তাবিত ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন ২০১৮’-এর খসড়া পেয়েছি, যা অচিরেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাঠানোর কথা শুনছি।

প্রস্তাবিত আইনটি পর্যালোচনা করে আমাদের মনে হয়েছে, এটি এখনও মন্ত্রিসভায় পাঠানোর মতো উপযুক্ত হয়নি; বরং বর্তমান অবস্থায় এ আইনে চিকিৎসাসেবাপ্রত্যাশী জনগণ ও চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলেই আমার ধারণা।

প্রস্তাবিত আইনের শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘যেহেতু, স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহীতার সুরক্ষা প্রদান এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন অত্যাবশ্যকীয়; যেহেতু দেশে নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে The Medical

Practice and Private Clinics and Laboratories (Regulation) Ordinance, 1982 রহিতক্রমে একটি নতুন যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন সমীচীন ও প্রয়োজনীয়; সেই হেতু, এতদ্বারা নিুরূপ আইন প্রণয়ন করা হইল।’ প্রস্তাবিত আইনের শুরুতে কতিপয় সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে, যার বেশ কয়েকটি বিভ্রান্তিকর বা অসম্পূর্ণ। যার ফলে পরবর্তী সময়ে এ আইনের ব্যাখ্যায় সংশয়ের সৃষ্টি হতে পারে।

যেমন- ২(৮) চেম্বার, ২(৯) তথ্য, ২(১১) নমুনা, ২(১৭) হাসপাতাল, ২(২৭) স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি, ২(২৮) ক্ষতি শব্দগুলোর সংজ্ঞা অসম্পূর্ণ কিংবা বিভ্রান্তিকর। প্রস্তাবিত আইনের চতুর্থ ৪(৩) ও ৪(৪) ধারানুযায়ী, ইতঃপূর্বে স্থাপিত সব বেসরকারি হাসপাতালকে নতুন করে কেন এ আইনের আওতায় আবার লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। পর্যাপ্ত ভাবনা-চিন্তা না করেই ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ থেকে এ ধারাগুলো যোগ করা হয়েছে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে আদৌ প্রাসঙ্গিক নয়। ধারা ৬(১) ও ৬(২)-এ বর্ণিত যে কোনো হাসপাতালে যে কোনো সময়ে প্রবেশ, পরিদর্শন, তল্লাশি ও জব্দ করার ক্ষমতাকে আমাদের কাছে স্বৈরাচারী পদক্ষেপ বলেই প্রতীয়মান হয়েছে। এখানে স্পষ্ট নয়, এ ক্ষমতা কেবল বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে, নাকি সরকারি হাসপাতালও এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

আমরা সবাই জানি, নির্ধারিত অফিস সময়ে বা পালাক্রমিক দাফতরিক দায়িত্ব পালনের সময়ে অন্য কোনো হাসপাতালে বা ব্যক্তিগত চেম্বারে চিকিৎসা প্রদান করা প্রচলিত চাকরিবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে নতুন করে এটি প্রস্তাবিত আইনে অন্তর্ভুক্ত করার কী প্রয়োজন? এই ধারা ১০(১) লঙ্ঘন করলে অনধিক এক লাখ টাকা জরিমানার বিষয়টিও এখানে অপ্রয়োজনীয়; বরং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়ন করে ও প্রয়োজনে প্রচলিত চাকরিবিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ সমস্যার সমাধান করা যায়।

তবে লঙ্ঘনকারী বেসরকারি হাসপাতালকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে তিন মাসের জেলের প্রস্তাবনাটি সমর্থনযোগ্য। প্রস্তাবিত আইনের ১০(২) ধারায় ছুটির দিনে স্ব-স্ব কর্মস্থলের জেলার বাইরে বেসরকারি হাসপাতালে বা ব্যক্তিগত চেম্বারে ফি গ্রহণপূর্বক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন বলা হয়েছে।

আমরা মনে করি, এর ফলে বিভিন্ন জেলার সাধারণ রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার অভাবে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম।

পাশাপাশি সীমিত আয়ের অনেক রোগীর পক্ষেই নিজ এলাকার বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নেয়া ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। সে ক্ষেত্রে সপ্তাহান্তে মফস্বলের রোগীরা নিজ এলাকায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছ থেকে সরাসরি চিকিৎসা পেয়ে উপকৃতই হচ্ছেন। পূর্বানুমোদন গ্রহণের নামে প্রক্রিয়াগত জটিলতার মাধ্যমে মফস্বল এলাকার এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা প্রদান ব্যাহত হলে চিকিৎসাপ্রত্যাশী সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে; যা কারোরই কাম্য হওয়ার কথা নয়। তবে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে কোনো বিশেষ মুহূর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছুটির দিনে চিকিৎসকের কর্মস্থল ত্যাগ না করার আদেশ দিলে বিষয়টি নিয়ে কারোরই আপত্তি থাকার কথা নয়।

ধারা-১১ অনুসারে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো প্রদত্ত সেবা এবং রোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষার চার্জ বা মূল্য বা ফি’র তালিকা প্রদর্শন করা যেতে পারে। পাশাপাশি ল্যাবরেটরিতে সম্পাদিত রোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান এবং পরীক্ষার রিপোর্ট একজন চিকিৎসকই কেবল করতে পারবে, সেটা স্পষ্টভাবে আইন দ্বারা নির্ধারিত হতে পারত।

সেইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক চিকিৎসকদের ফি নির্ধারণের প্রস্তাবটি সমর্থনযোগ্য নয়। এর কারণ দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও এলাকার ভিত্তিতে চিকিৎসকদের ফি ভিন্ন ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া অন্যান্য পেশাজীবীর ক্ষেত্রে ফি নির্ধারণের ব্যবস্থা না থাকলেও কেবল চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে রোগী দেখার ফি নির্ধারণের এ প্রস্তাবটি গ্রহণযোগ্য নয়।

বিভিন্ন রোগ পরীক্ষা-নিরীক্ষার চার্জ আলোচনার ভিত্তিতে ঠিক করা যেতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে। চিকিৎসাসেবা বাবদ আদায়কৃত চার্জ বা মূল্য ফি’র রসিদ প্রদান বা অনুলিপি সংরক্ষণের বিষয়টি আয়কর প্রদানের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বর্তমানে এটি প্রচলিত। এর জন্য প্রস্তাবিত আইনে এটি অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয়নি।

ধারা ১২(১) ও ১২(২) আমাদের কাছে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। সেবাগ্রহীতাদের ন্যূনতম বসার জায়গা বলতে কী বোঝানো হয়েছে? সারা দেশে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। আবার একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক অ্যাটেনডেন্ট থাকেন, যারা ওই চেয়ারেই বসেন। সে ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের জন্য বসার জায়গা অপ্রতুল হতেই পারে।

তাছাড়া অনেক জুনিয়র ডাক্তারই ওষুধের দোকানে চেম্বার করেন, যেখানে সেবাগ্রহীতাদের বসার জায়গা সীমিত অথবা নেই বললেই চলে। সুতরাং সেবাগ্রহীতাদের বসার জায়গার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকই সিদ্ধান্ত নেবেন। সেবাগ্রহীতার বসার জায়গা না থাকলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানার প্রস্তাবিত দণ্ডটিও সঙ্গত কারণে গ্রহণযোগ্য নয়।

বিভিন্ন চিকিৎসক তার দক্ষতানুযায়ী চেম্বারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাদি রাখেন। এখানে ‘ন্যূনতম’ শব্দটা যেমন বিভ্রান্তিকর, তেমনি বিধি দ্বারা এটি নির্ধারণের প্রচেষ্টাও অপ্রয়োজনীয় বলে আমাদের ধারণা। ধারা ১২(৩) ও ১২(৪) বর্ণিত বিষয় দুটো ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।

এটি নতুন করে প্রস্তাবিত এ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। ধারা ১২(৩) ও ১২(৪) ও বিএমডিসি আইন ও মেডিকেল এথিকস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, এর জন্যও আলাদা আইনের প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। ধারা-১৩-তে উল্লিখিত ‘রোগী বা রোগীর অনুসঙ্গীকে (Attendant) চিকিৎসা সম্পর্কে অবহিতকরণ ও তথ্য প্রদানের’ ব্যাপারটি বিএমডিসি কর্তৃক নির্ধারিত ‘কোড অব কনডাক্টের’ আওতাধীন, একজন নিবন্ধিত চিকিৎসক যা মানতে বাধ্য। এ বিষয়টিকে আলাদা করে প্রস্তাবিত আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি না।

প্রস্তাবিত ধারা ১৪(১) আমাদের কাছে বাস্তবসম্মত মনে হয়নি। সরকারি বড় হাসপাতালগুলোতেই যেখানে জরুরি সেবা প্রদানের অবস্থা নাজুক, সেখানে মফস্বলের ছোট ছোট বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে ন্যূনতম জরুরি সেবা প্রদান নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে কেবল ১০০ বা ততধিক শয্যাসংবলিত বেসরকারি হাসপাতালে জরুরি সেবা প্রদানের সুযোগ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

মুক্তিযোদ্ধা ও দরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের প্রস্তাবিত ধারাটি প্রশংসনীয়, আমরা এটি সমর্থন করছি। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তির পেশাগত নৈতিকতা ও দায়িত্বের বিষয়গুলো বিএমডিসি এবং নার্সিং কাউন্সিলের আইন দ্বারা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত, যা অনুসরণ করলেই চলে; এর জন্য আলাদা করে আইন করার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।

প্রস্তাবিত আইনে বিদেশি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি কর্তৃক সেবা প্রদান এবং বিদেশি হাসপাতাল স্থাপনের অনুমতি প্রদান সংক্রান্ত ধারা ২০ ও ২১-এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বক্তব্য হল- বিদেশি চিকিৎসক বাংলাদেশে কোনো হাসপাতালে নিয়োগ পেতে হলে বিএমডিসির অনুমোদন লাগে। সুতরাং এ সংক্রান্ত সব ধরনের দায়িত্ব বিএমডিসি পালন করে থাকে।

তবে বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বাংলাদেশে অনুমতি পাওয়ার পূর্বে যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে যেন তারা আমাদের বিশেষজ্ঞদের বিকল্প বা প্রতিযোগী না হয়ে ওঠে। তাহলে বেসরকারি পর্যায়ে আমাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নিরুৎসাহিত হবে। কেবল যেসব বিষয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আমাদের নেই, সেসব বিষয়ে বিদেশি চিকিৎসকরা অনুমতি পেতে পারে।

একই সঙ্গে যেসব দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আমাদের দেশে অনুমতি পাবে, সেসব দেশেও আমাদের চিকিৎসকদের চিকিৎসা প্রদানের অনুমতি থাকতে হবে। প্রয়োজনে বিএমডিসির অধীন লাইসেন্সিং পরীক্ষা দিয়ে বিদেশি ডাক্তারদের বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবা প্রদানের জন্য নিবন্ধন গ্রহণ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে বিদেশি চিকিৎসকদের কেবল প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্দেশ্যেই কাজ করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। খসড়া আইনে এসব প্রস্তাব থাকা প্রয়োজন ছিল।

প্রস্তাবিত আইনের ২১ নম্বর ধারায় নির্ধারিত পেশাগত দায়িত্ব পালনে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি বা হাসপাতাল কর্তৃক অবহেলার বিষয়টি ‘Medical Negligence Act 1860’, ‘Medical & Dental Council Act 1980’ এবং ‘Consumer

Rights Protection Act 2009’ দ্বারা ইতিমধ্যে নির্ধারিত। এর জন্য নতুন করে আইন করার প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না। ধারা ২১(২) এবং ২১(৩) আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও প্রস্তাবিত সুরক্ষা আইনের খসড়ায় এটি সবচেয়ে হঠকারী সিদ্ধান্ত হয়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।

বাংলাদেশে প্রচলিত দণ্ডবিধি অনুযায়ী সব ধরনের সহিংসতাই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত, সে ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত খসড়া আইনে এ বিষয় উল্লেখ থাকার কী প্রয়োজন ছিল? যে শাস্তির প্রস্তাব করা হয়েছে, এ শাস্তি ভোগ করার ক্ষেত্রে প্রধানতম অন্তরায় হল, বিচারে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া। ভিকটিম চিকিৎসক ও ভাংচুর হওয়া প্রতিষ্ঠান আদালতে সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ করতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হবে। রাজনৈতিক প্রভাব ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে একসময় মামলা খারিজ হবে, অপরাধী বেকসুর খালাস পেয়ে যাবে।

প্রস্তাবিত আইনের ২২ নম্বর ধারায় কোম্পানি কর্তৃক অপরাধ সংঘটনের কথা বলা হলেও সরকারি হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রে এ আইনটি প্রযোজ্য হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। ধারা-২৩-এ উল্লিখিত অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ, আমলযোগ্যতা এবং আপসযোগ্যতার বিষয়গুলো ‘গবফরপধষ ঘবমষরমবহপব অপঃ ১৮৬০’-এ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, তাই নতুন করে আর এ সংক্রান্ত আইনের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে ১৮৬০ সালের আইনটির পরিবর্তন-পরিমার্জন করা যেতে পারে। ধারা-২৫-এ বর্ণিত দণ্ডের অতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় আমাদের কাছে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা বলেই প্রতীয়মান হয়েছে, এর আদৌ প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।

প্রস্তাবিত খসড়া আইনের ২৬ নম্বর ধারায় দায়সারাভাবে যে দায়মুক্তির কথা বলা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বক্তব্য হল- ‘বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারা বাংলাদেশ পেনাল কোডের ৮৮ ধারার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্র চিকিৎসকসহ অন্যান্য পেশাজীবীকে ৮৮ ধারায় দায়মুক্তি বা ইনডেমনিটি দিয়েছে। চিকিৎসাকালীন রোগীর মৃত্যু হলে বাংলাদেশ পুলিশ এই ৮৮ ধারা অগ্রাহ্য করে চিকিৎসককে ৩০৪ ধারায় গ্রেফতার করে থানা হাজতে পাঠায়। বিষয়টি রাষ্ট্রের জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত সুকৌশলে স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন-২০১৮ খসড়ায় তা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

অথচ রাষ্ট্র তার চিকিৎসকে সুনির্দিষ্ট ধারায় নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ। আইনের নাম ‘স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষা আইন’ হলেও হঠকারিতার কারণে পেনাল কোডে সুনির্দিষ্ট দায়মুক্তি থাকা সত্ত্বেও খসড়ায় বাদ দেয়া হয়েছে। ফলে ৩০৪ ধারায় চিকিৎসককে অনায়াসে খুনি বা হত্যাকারী হিসেবে গ্রেফতার করে বিচারের সোপর্দ করা যাবে।

শেষ কথা হল- পুরো আইনটা পড়ে প্রশ্ন জাগে, প্রস্তাবিত আইনটা কি কেবল বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতাল ও ল্যাবরেটরিগুলোর জন্য? কারণ একই কারণে বা অপরাধে সরকারি হাসপাতালের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্পষ্ট নয়। সে ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের আদলে এটির শিরোনাম হতে পারত, ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস এবং বেসরকারি ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি আইন-২০১৯’ এবং এর সঙ্গে ‘একচিলতে লবণের মতো’ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সুরক্ষার বিষয়টি জুড়ে না দিলেও চলত।

দিনের শেষে, চিকিৎসকদের সুরক্ষা প্রদানের পরিবর্তে প্রস্তাবিত এই আইনটি চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নিবর্তনমূলক আইন হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের সুস্পষ্ট দাবি- রোগীদের সুচিকিৎসার স্বার্থে চিকিৎসকসহ সব স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের সুরক্ষার লক্ষ্যে ‘চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সুরক্ষা আইন’ শীর্ষক আলাদা আইন চাই। এই সুরক্ষা আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় অধিকসংখ্যক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী ব্যক্তি ও সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে একটি শক্তিশালী কমিটি করে দেয়া যেতে পারে। এ কমিটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সুরক্ষা আইনের’ খসড়া প্রণয়ন করবে।

ডা. আবুল হাসনাৎ মিল্টন : চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ; চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি অ্যান্ড রাইটস

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×