ইভিএম বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত
Advertisement
কারার মাহমুদুল হাসান
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ইভিএম। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে শতভাগ ভোটগ্রহণ ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএমে করার সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) অনড়। এ ব্যাপারে কারও যৌক্তিক পরামর্শ শুনতে বা মানতে ইসির বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
এটিএম শামসুল হুদা কমিশনের আমলে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ২০১০ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির মুখে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু ওই কেন্দ্রে ইভিএমের কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে। এ নিয়ে মামলাও হয়।
ইভিএম নিয়ে সবচেয়ে বেশি জটিলতা হয় ২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে। জটিলতার কারণে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে দ্বিতীয়বার নির্বাচন আয়োজন করতে হয়েছিল ইসিকে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও একটি কেন্দ্রে ইভিএম বিকল হয়ে যায়। এসব কারণে ২০১৩ সালের পর থেকে আর কোনো নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়নি। সেই সময়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ১০০ ইভিএম তৈরি করা হয়েছিল।
২০১৬ সালে এসে কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন আগের প্রযুক্তিটি বাদ দিয়ে নতুন প্রযুক্তির একটি ভোটিং মেশিন তৈরি করে, যার নাম দেয়া হয় ডিজিটাল ভোটিং মেশিন (ডিভিএম)। মেশিনটি তখন কমিশনের সামনে উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং তা করাও হয়।
জানা যায়, নতুন এ পদ্ধতিতে শুধু আঙুলের ছাপ শনাক্ত হওয়ার পরই ভোটাররা ভোট দিতে পারবে। এটি জাল ভোট ঠেকানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা দাবি করেন।
বলা হয়, মেশিন ভেঙে ফেললেও বা পানিতে ডুবিয়ে দিলেও ব্ল্যাকবক্সের মাধ্যমে প্রদত্ত ভোটের হিসাব পাওয়া যাবে। এ বিষয়ে শুরু থেকেই কারিগরি ও প্রযুক্তি অভিজ্ঞ অনেক বিশেষজ্ঞকে ভিন্নমত প্রকাশ করতে দেখা যায়, যা ক্রমবর্ধমান।
আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠেয় ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বহু তর্ক-বিতর্কের মধ্যেও ইভিএমে ভোট গ্রহণের পূর্ণ প্রস্তুতি নেয়ার কথা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনাররা আগে থেকেই বলে আসছেন এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই হচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইভিএমের পক্ষে। বিএনপি ইভিএমের বিপক্ষে। বিএনপির আশঙ্কা, ইভিএমে ডিজিটাল কারচুপি হবে। অন্যদিকে ইসি বলছে, ত্রুটিমুক্ত নির্বাচন করতেই ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে অনিয়ম ও কারচুপি কমবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইভিএমে কারচুপির সুযোগ একেবারেই যে নেই, তা নয়। তবে এটি হ্যাক করার সুযোগ নেই। সেই সঙ্গে প্রচলিত অনিয়ম, কারচুপির সুযোগও কম। তবে ইভিএম বিষয়ে বিভিন্ন মহলে ক্রমবর্ধমান যে সংশয়, তা দূর করার জন্য নির্বাচন কমিশনকেই মাঠপর্যায়ে ব্যাপকভাবে বাস্তবসম্মত ও হাতে-কলমে প্র্যাকটিসের কাজগুলো সম্পাদন করতে হবে বলে বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন। তবে নির্বাচন কমিশন এ কাজগুলো সম্পাদনে কম মনোযোগী বলে মনে হয়।
ইভিএম বিষয়ে গভীরভাবে সন্দেহপ্রবণরা মনে করেন, দুটি জায়গায় ইভিএমে ভোট কারচুপি করা সম্ভব। প্রথমত, ভোটারের আঙুলের ছাপ না মিললে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা নিজের আঙুলের ছাপে ভোটারকে ভোট দেয়ার সুযোগ দিতে পারেন। এ পরিস্থিতিতে কারচুপি হতে পারে।
যদিও ইসির হালনাগাদ কথা হল- এবার এ ক্ষমতা কমিয়ে ৫ শতাংশের মধ্যে আনা হবে। তবে প্রায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এ বিষয়ে ইসির কোনো ঘোষণা নেই। অন্যদিকে ভোটাধিকার প্রয়োগে উন্মুখ ভোটারদের বক্তব্য হল, এ অযাচিত অধিকার ৫ শতাংশ দূরে থাক, শূন্য দশমিক ১ শতাংশ ভোটারকেও এ সুযোগ দেয়া অনৈতিক হবে। দ্বিতীয় শঙ্কার বিষয়, বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহার করে ফল পরিবর্তন করা সম্ভব।
কারণ, ইভিএমে ভোটার ভেরিয়েবল পেপার অডিট ট্রেইল বা ভিভিপিএটি নেই। অর্থাৎ যন্ত্রে ভোট দেয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে তার প্রিন্ট কপি ব্যালট জমা হওয়ার সুযোগ নেই। তাই কারচুপি হলে তা প্রমাণ করা যাবে না। তবে ইসি বলছে, এ ধরনের সন্দেহ থাকলে যে কেউ বিশেষজ্ঞ এনে ইভিএম পরীক্ষা করে দেখতে পারে। অবশ্য এ পরীক্ষার কাজ কোথায়, কীভাবে, কাদের তত্ত্বাবধানে করা যাবে, সে বিষয়ে ইসি নীরব।
সম্প্রতি চট্টগ্রামে ইভিএমে গৃহীত উপনির্বাচনে ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ ভোট পড়ায় নির্বাচন কমিশনের যতটুকু বিচলিত হওয়ার কথা ছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয়নি। তবে বিভিন্ন পত্রিকায় ইভিএমে ভোটারদের ক্রমবর্ধমান অনাগ্রহের কথা বেশ জোরেশোরে প্রকাশিত হচ্ছে এবং এর ফলে ইসি উদ্বিগ্ন বলে প্রতীয়মান। তবে ইসি ইতিমধ্যে ইভিএম ক্রয়ে প্রচুর টাকা খরচ করে বসে আছে। এ প্রেক্ষাপটে আসছে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কতভাগ সঠিক ভোট কাস্ট হবে, তা এ মুহূর্তে কোনো গণকের পক্ষেও আগাম মন্তব্য করা কঠিন।
ইভিএমে নিরাপদে, সুশৃঙ্খলভাবে, অল্প সময়ে ভোটদান করা সম্ভব মর্মে ইসিসহ কিছু বিশেষজ্ঞ ও গুণীজন এর পক্ষে হরহামেশা কথা বলে যাচ্ছেন এবং সাম্প্রতিককালে ভারতে অনুষ্ঠিত একাধিক নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহারকে তারা দৃষ্টান্ত হিসেবে দাঁড় করাতে উন্মুখ। তাদের বক্তব্য, ভারতে ইভিএমে নির্বাচন অনুষ্ঠান যেহেতু ২০১২ সালের পর থেকে এখন সব প্রদেশে (কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক উভয় ক্ষেত্রে) চালু করা হয়েছে, সে প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বিভিন্ন নির্বাচনে এ পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণে সমস্যা কোথায়?
ভারতে প্রায় ৬৫ বছর ধরে ব্যালট পেপারে কেন্দ্রীয় ও অন্যান্য ভোট গ্রহণের পর এবং এত বছর ধরে সেদেশে ভোট গ্রহণে কারচুপির ছোট-বড় মাপের বিভিন্ন কিসিমের অভিযোগ উপস্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও কেন ইভিএমে ভোট গ্রহণের পক্ষে দিল্লির হাইকোর্ট রায় দিলেন, সে বিষয়ে যে তথ্যাদি পাওয়া যায় তার মধ্যে গত ১৯ মার্চ ঢাকার একটি পত্রিকায় ‘ভারতে ইভিএম নয়, ব্যালটে ভোটের দাবি’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) বিরোধিতা দেখা দিয়েছে ভারতে।
দেশটির সবচেয়ে বড় দল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ইভিএমের বদলে আগামী দিনের সব নির্বাচন আগের মতো কাগজের ব্যালটে নেয়া হোক। আর সাধারণ ভোটারের মধ্যে যে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, তা দূর করতেই পুরনো ব্যালট পেপারে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়েছে কংগ্রেস। এ ব্যাপারে হাইকোর্ট স্বীকার করেন, যন্ত্র কারচুপির কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। ইভিএমও একটা যন্ত্র। কিন্তু নির্বাচন কমিশনই ইভিএম বাদ দিতে আদেশ দেবেন, আদালত নয়।
ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ইভিএমে ভোট গ্রহণ বিষয়ে মাত্র একজন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার চিন্তিত বলে মনে হয়। ২২ জানুয়ারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশে লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেছেন, ইভিএমে জাল ভোট প্রদান প্রতিহত করা এক বিরাট সমস্যা। বুথ দখল করে বা গোপন কক্ষে গিয়ে জাল ভোট প্রদানের ঘটনা অবশ্যই প্রতিহত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অন্য নির্বাচন কর্মকর্তাদের সম্মিলিতভাবে গোপন কক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
ইভিএমে যদি ৫০ শতাংশ ভোট না পড়ে, তাহলে ব্যালট পেপারে আবারও ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। এজন্য নির্বাচনী বিধি-বিধান পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। তিনি আরও বলেছেন, ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের ওপর যন্ত্রটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। মাহবুব তালুকদার আরও বলেছেন, এ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার প্রশ্নবিদ্ধ হলে শুধু নির্বাচন নয়, ইভিএম যন্ত্রটির ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যালটের চেয়ে ইভিএমের খরচ একটু বেশি হলেও এর মাধ্যমে নির্বাচনী অনিয়ম দূর করা সম্ভব বলে ইসি মনে করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় ইভিএমও অরক্ষিত। বিগত সময়ে ভোটের রাতে কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারার অভিযোগ উঠলেও এখন দিনে কেন্দ্র দখল করে ইভিএমে জাল ভোট দেয়া সম্ভব। ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটে ভোটারের ফিঙ্গার ম্যাচিংয়ের পর ব্যালট ইউনিটে অন্য যে কেউ ভোট দিতে পারেন।
ইভিএমের বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, উন্নত দেশগুলো কেন ইভিএম পরিত্যাগ করেছে, তা আগে অনুধাবন করতে হবে। ইভিএমে ভোটদানের পর ভোটার কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারেন না। এসব সত্ত্বেও ইভিএম নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা বলেছেন, ইভিএমে ভোট কারচুপির কোনো সুযোগ নেই। ভোটের অনিয়ম দূর করার জন্যই ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে। আগামীতে সব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। ইসির কাণ্ডারির এত ইভিএমপ্রীতি কেন? ইভিএমের কারণে দুই সিটি নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠেয় বিভিন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সত্য-মিথ্যা, বিশ্বাসযোগ্য-বিশ্বাসঅযোগ্য নানা কিসিমের কত যে কাহিনীর জন্ম হতে পারে, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হবে।
কারার মাহমুদুল হাসান : সাবেক সচিব; সাবেক এনপিডি-ইউএনডিপির অর্থায়নে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন শক্তিশালীকরণ প্রকল্প (জানুয়ারি-জুলাই ২০০১)
