অন্যমত
স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন
Advertisement
আবু আহমেদ
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০১০ সালের ধসের পর দেশের পুঁজিবাজার কাঙ্ক্ষিতভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে রয়েছে সুশাসনের ঘাটতি এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা। শেয়ারবাজারকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে-বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ বৃদ্ধি, ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি এবং বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরতের উদ্যোগ। এ তিনটি বাস্তবায়ন করা গেলে শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট কাটার সুযোগ তৈরি হবে। তবে এর সঙ্গে সুশাসন, জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে শেয়ারবাজারে টেকসই গতি ফেরানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাজারের পরিবেশ সহজ করতে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার অন্যতম। পাশাপাশি ভালো মৌল ভিত্তিসম্পন্ন দেশি ও বিদেশি কোম্পানিকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সুযোগ দিতে নতুন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। মার্জিন ঋণসংক্রান্ত নিয়ম সহজ করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আশা করি, এসব উদ্যোগ শেয়ারবাজারের দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা দূর করবে।
বিদেশি ভালো ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে আনতে ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের মালিকানা থেকে সামান্যতম ছাড় দিলেই তারা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে যেতে পারবে। ভালো কোম্পানি হলে মাত্র ৫ শতাংশ ছাড় দিলেও তারা তালিকাভুক্ত হতে পারবে। তাছাড়া তাদের জন্য ট্যাক্স ইনসেন্টিভ তো থাকছেই। এখন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে বিদেশি কোম্পানির তালিকাভুক্তির জন্য। বিনিয়োগকারীরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, যাতে আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে বিদেশি দু-একটি কোম্পানি ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে বাজারে আসে। এর সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশি ভালো কিছু কোম্পানিও ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ে আসতে পারবে। সবাই আইপিওতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। আমরা জানি, মূলধন ঘাটতি হলে কোম্পানি বাজারে আইপিও ছাড়ে। অনেক কোম্পানির মূলধনের প্রয়োজন নেই, কিন্তু শেয়ারবাজারে লিস্টেড হলে তারা ট্যাক্সে প্রণোদনার মতো কিছু সুবিধা পাবে বলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে আগ্রহী হয়। শুধু তাই নয়, তালিকাভুক্ত হলে পাবলিকের কাছে তাদের ইমেজ বেড়ে যাবে-এটাও তালিকাভুক্তির আরও একটি কারণ। আমি মনে করি, সরকার যদি বিদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য প্রণোদনাটা আরেকটু বাড়িয়ে দিতে পারে, সেটা ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের ক্ষেত্রে হোক বা আইপিও’র ক্ষেত্রে, তাহলে শেয়ারবাজারে ভালো ভালো কোম্পানি আসবে। অতীতে শেয়ারবাজারে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনার পদ্ধতি চালু ছিল। কিন্তু এনবিআর এগুলোকে উঠিয়ে দিয়েছে। কেন উঠিয়ে দিয়েছে, আমার জানা নেই। যেমন, কোনো কোনো কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের যদি ২৫-৩০ শতাংশের বেশি ডিভিডেন্ড দিত, তাহলে ওই কোম্পানি একটা ট্যাক্স রিবেট পেত। ৫০ শতাংশের বেশি লভ্যাংশ দিলে আরও বেশি ট্যাক্স রিবেট পেত। এতে করে প্রতিটি কোম্পানিই একটা উৎসাহ পেত এবং লভ্যাংশ প্রদানের ব্যাপারে মনোযোগী হতো। কিন্তু ট্যাক্স রিবেটের এ বিষয়গুলোকে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। লিস্টেড কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স ১০ শতাংশ কম রাখা হতো। কিন্তু সেটিও উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স ১০ শতাংশের পরিবর্তে আড়াই শতাংশ বা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ ধার্য করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়, যা অতি নগণ্য। এর পুরো প্রভাব পড়েছে আমাদের শেয়ারবাজারে। কারণ তালিকাভুক্ত অনেক বিদেশি কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে বিদায় নিয়েছে। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আসলে বিদেশি ভালো ভালো কোম্পানিকে ধরে রাখা উচিত ছিল। প্রয়োজনে তাদের সুযোগ-সুবিধা আরও বাড়িয়ে দেওয়া যেত। এখন নতুন করে মৌল ভিত্তিসম্পন্ন দেশি-বিদেশি কোম্পানিকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার বিধিমালা প্রণয়নের যে উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি, এটিকে আরও প্রাণবন্ত করার চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। এনবিআর, বিএসইসি ও অর্থ মন্ত্রণালয় একসঙ্গে বসে এগুলো ঠিক করতে পারে। একটা সিদ্ধান্তে আসতে পারে, যেটা শেয়ারবাজারকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। যেসব কোম্পানি বেশি ডিভিডেন্ড দিচ্ছে, তাদের উৎসাহ দিতে হবে। কারণ, দিনশেষে একটা কোম্পানি কত ভালো ডিভিডেন্ড দিচ্ছে সেটি ম্যাটার করে। এটি শেয়ারবাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিভিডেন্ডের বিষয়টি যদি না থাকে, তাহলে তো শেয়ারবাজার ক্যাসিনোর মতোই হয়ে যাবে; শুধু জুয়া খেলা থাকবে সেখানে। এটা তো হতে পারে না। পৃথিবীর কোথাও শেয়ারবাজার এভাবে চলে না। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে কমপক্ষে ১০০টি কোম্পানি রয়েছে, যারা শেয়ারহোল্ডারদের কোয়ার্টারলি ডিভিডেন্ড দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের এখানে মাত্র একটি বা দুটি কোম্পানি কোয়ার্টারলি লভ্যাংশ দিয়ে থাকে। তাহলে শেয়ারবাজার এগোবে কীভাবে, তা আমার বোধগম্য নয়। আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানির আয় এতটাই কমে গেছে যে, তারা ইন্টেরিম লভ্যাংশ ঘোষণার কথা প্রায় ভুলেই গেছে। তারা বছর শেষে বার্ষিক একটি লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডারদের দিচ্ছে। এভাবে যদি একের পর এক লভ্যাংশের বিষয়টি পুঁজিবাজার থেকে উঠে যায়, তাহলে শেয়ারবাজার কীসের ওপর ভিত্তি করে চলবে?
এজন্য সিস্টেমিটেকালি ইনসেন্টিভ থাকা উচিত। শুধু সভা-সেমিনার করে, বক্তৃতা দিয়ে ভালো ভালো কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করা সম্ভব নয়। অতীতে অনেক বক্তৃতা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আসলে সিস্টেমিটেকালি ইনসেন্টিভাইজ্ড করা থাকলে এর সমাধান সহজ হতো। কোম্পানিগুলোকে জানানো হতো, আপনি যদি শেয়ারবাজারে স্টক একচেঞ্জের মাধ্যমে পাবলিকের কাছে আপনার মালিকানার সামান্যতম হস্তান্তর করেন, তাহলে আপনি এই এই সুবিধা পাবেন। শুধু তাই নয়, সেই সুবিধাটি লোভনীয় হতে হবে। কারণ একটা কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের বেশি লভ্যাংশ দিলে সে যদি ট্যাক্স রিবেট পায়, তখন ওই কোম্পানির বোর্ড ডিভিডেন্ড রেট আরও বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি চিন্তা করবে। সেটার প্রতিফলন পড়বে মার্কেটে। শেয়ারবাজারে একটা গতি আসবে। তা না হলে, কোনো কোম্পানি ডিভিডেন্ড না দিলে সেটা ক্যাসিনোর মতো হয়ে যাবে। ক্যাসিনো দিয়ে তো মূলধন জোগাড় কারা যায় না। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হওয়া যায় না। তাহলে শেয়ারবাজার নামধারী এই ক্যাসিনো রেখে লাভ কী?
যা হোক, বিএসইসিতে নতুন কমিশনার এসেছেন। দেখা যাক, তার হাত ধরে শেয়ারবাজার কতদূর এগোতে পারে। আমাদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। নতুন যে কমিশনার এসেছেন, তিনি শেয়ারবাজারের বিষয়ে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করি আমরা। আমরা একটি ভালো রেজাল্ট দেখতে চাই। এরই মধ্যে তো দু-চারটি কোম্পানি লিস্টিংয়ে আসার কথা। যদি তারা না এসে থাকে, তাহলে তারা কেন আসছে না, এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে বসতে হবে। তাদের চাহিদাগুলো জানতে হবে। দরকষাকষির মাধ্যমে একটা সমাধানে আসতে হবে। শুধু তদারকিতে হবে না, তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তদারকি করব যেটা তালিকায় এসে গেছে, সেটিকে।
সরকারি কোম্পানিগুলোর মধ্যে যেগুলোর অনেক সম্পদ আছে এবং যেগুলো চিহ্নিত করা আছে, সেগুলোকে বিক্রি করে দিতে হবে। অলস সম্পত্তি ফেলে রেখে কোনো লাভ নেই। আমাদের দুর্ভাগ্য, সরকারি একটি কোম্পানি এখন পর্যন্ত বিক্রি হলো না। আইসিবি অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছে সরকারের কোম্পানিগুলোকে বিক্রি করে সরকারি তহবিলে টাকা দেওয়ার জন্য। অতীতে আইসিবি এসব কাজ তো করেছে। এখন শুধু আদেশের অপেক্ষা। তবে এ আদেশ সরকারের পক্ষ থেকে হতে হবে। সরকারকে রাজি হতে হবে। চিহ্নিত করা সম্পদ থেকে সরকার নির্দেশ দেবে যে, এই এই শেয়ার বিক্রি করতে হবে। এগুলোর পুরো তালিকা করা আছে। সেখানে উল্লেখও করা আছে মূল শেয়ার কত ভাগ থাকবে এবং তারিখও দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর কিছুই হয়নি। বর্তমান সরকারের সাত মাস চলে যাচ্ছে, শেয়ারবাজার নিয়ে তাদের কর্মসূচির ফল এখনো আমরা দেখতে পাইনি। আশা করি সামনে পাব। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিগুলোর মধ্যে ব্যাংকব্যবস্থায় একটা স্থবিরতা চলছে, রপ্তানি বাণিজ্যের অবস্থাও ভালো নয় এবং পুঁজিবাজারও ফাংশন করছে না। সুতরাং আমাদের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কোথা থেকে হবে? আসলে সার্বিকভাবে আমরা যদি ব্রডবেজ সিদ্ধান্তগুলো নিতে না পারি, তাহলে আমাদের অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে পারব না।
আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি
অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার
