প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমের শক্তি ও দুর্বলতা
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমের শক্তি ও দুর্বলতা

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এ ৫০ বছরেও আমরা ঠিক করতে পারলাম না আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার স্বরূপ, কাঠামো, শিক্ষাক্রম এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য কী হবে।

বাংলাদেশোত্তরকালে শিক্ষাব্যবস্থার কীভাবে সংস্কার করা যায় সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন ও কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপরই গঠিত হয়েছিল ড. কুদরাত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন। এ কমিশন শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একটি রিপোর্ট প্রদান করেছিল। রিপোর্টটি মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। কারণ এ কমিশন রিপোর্ট তৈরি করার পরপরই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়।

রিপোর্টটি মুদ্রিত না হওয়ার ফলে শিক্ষাবিদসহ শিক্ষানুরাগীদের কাছে এ রিপোর্টের কপি পৌঁছানো হয়নি বলে এ রিপোর্টের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা কারও কাছ থেকে পাওয়া যায় না। এ রিপোর্ট সম্পর্কে প্রায়ই যে কথাটি সামনে আসে, সেটি হলো ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধই হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পাথেয়। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যে মন্ত্রিসভা গঠন করেন সেই মন্ত্রিসভায় প্রয়াত কাজী জাফর আহমদ ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী।

প্রধানত কাজী জাফর আহমদের উদ্যোগে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করার জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক ও স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে ব্যাপক অংশগ্রহণভিত্তিক সেমিনারের আয়োজন করে। এসব সেমিনারে দলমত নির্বিশেষে অনেকেই অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাদের সুচিন্তিত মতামতও দিয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে একেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।

এমনকি রাষ্ট্রপতি জিয়াও কয়েকটি অধিবেশনে সশরীরে উপস্থিত হন এবং অধিবেশন শেষ হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন জনের মতামত জানা ও বোঝার চেষ্টা করেছেন। এ সেমিনারগুলো ছিল সরাসরি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানী ও গুণিজনেরা কী ভাবছেন এবং কী করণীয় তা জানা ও বোঝার জন্য খুবই মূল্যবান। দুর্ভাগ্যবশত এরকম একটি ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক আলোচনার কোনো রেকর্ড এখন আর পাওয়া যায় না।

হয়তো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষিত আছে। এ ব্যাপক পর্যালোচনার সুফল হিসাবে যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তা হলো, নোটবই বেআইনি ঘোষণা করা। বেশ ক’বছর নোটবুকের ব্যবসা বন্ধ থাকলেও তা পরবর্তীকালে পুনর্জন্ম লাভ করে। আমাদের স্কুল ও কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা ভয়ানকভাবে নোটবইনির্ভর। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মূল পাঠ্যবইতে কী আছে তা পাতা উলটিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। সর্বোপরি নোটবইগুলো শিক্ষার্থীদের মনোজগতকে আড়ষ্ট করে ফেলে। শিক্ষার্থী তার নিজের চিন্তা-ভাবনাগুলো যথাসাধ্য গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারে না। নোটবই মুখস্থ বিদ্যাকে উৎসাহিত করে।

দুঃখজনক হলো, নোটবই না কিনলে শিক্ষার্থীরা টেক্সট বুক বোর্ডের পাঠ্যবইগুলো কিনতে পারত না। নোটবই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পুস্তক প্রকাশক এবং শিক্ষকদের অসাধু প্রয়াসের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে অত্যন্ত ক্ষতিকারক এক ধরনের অপরাধবৃত্তি। নোটবইয়ের ব্যবসা স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কলুষিত করেছে এবং অনেক শিক্ষক পাঠদান করতে গিয়ে নিজের মনন ও মেধার ব্যবহার না করে শ্রেণিকক্ষে নোটবইনির্ভর শিখন পদ্ধতি চালু করেছেন।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক ড. মফিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এ কমিশন তাদের রিপোর্ট যথাযথ কর্তৃপক্ষকে দিলেও দেশবাসী এ কমিশনের রিপোর্টে কী ছিল তা আজও জানতে পারেনি। ২০০৯-এ ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার ড. কাজী খলীকুজ্জমানের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে।

এ কমিশনও বেশ কিছু সুপারিশ প্রদান করেছে। এগুলোর কিছু কিছু বাস্তবায়নও করা হয়েছে। আমরা এতটুকু বুঝতে পারি, ড. কুদরাত-ই-খুদা কমিশনের রিপোর্টকে মুখচেনা কতিপয় বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার রোগ ও দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সর্বোৎকৃষ্ট দাওয়াই মনে করলেও এ যাত্রায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার কুদরাত-ই-খুদা কমিশন যে বাস্তবায়নযোগ্য নয়, সেই ধারণা থেকেই ড. খলীকুজ্জমান কমিশন গঠন করেছে।

শিক্ষা একটি গতিশীল প্রপঞ্চ। যুগের প্রয়োজনে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করতে হয়। এ সত্যটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাশূন্যে ‘স্পুটনিক’ নামে মহাশূন্য যান প্রেরণ করার পর মার্কিন প্রশাসন এবং মার্কিন জনগণ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তারা ভাবতে থাকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন কীভাবে এমন চমক দেখাল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেন।

এ কমিটির সামনে প্রশ্ন ছিল, সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থায় এমন কী আছে যা মহাকাশ যান মহাশূন্যে প্রেরণের জন্য কাজে লেগেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিয়োজিত কমিটি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার পাঠক্রম পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্তে এলো যে, সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এ পর্যালোচনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত শিক্ষাকে অগ্রগণ্য বিষয় হিসাবে স্থাপন করা হয়।

আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যতটুকু জানি তা থেকে বলতে পারি-মানবিক বিদ্যা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সব ধরনের বিষয়ে গণিতের ব্যবহার খুবই প্রয়োজনীয় গণ্য করা হয়। সেদেশে ইতিহাসের গবেষণাতেও উচ্চতর পর্যায়ের গণিতের ব্যবহার বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পুটনিক-উত্তর সময়ে শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে বলে দেশটি মহাশূন্য গবেষণায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে অতিক্রম করে যেতে সক্ষম হয়েছে।

এখন চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে চীন প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রে অকল্পনীয়ভাবে এগিয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেসব চীনা ছাত্র উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছে, তারা দেখিয়ে দিয়েছে গণিতে তারাই সেরা। কথায় বলে, Mathematics is the mother of all sciences. গণিত সব ধরনের বিজ্ঞানের মাতৃসম। বাংলাদেশে বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা যতই নৈরাজ্যপূর্ণ হোক না কেন, উচ্চতর গণিতে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তার সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য তারই শিক্ষক এবং পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষা সচিব অধ্যাপক শরিফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। এ শিক্ষা কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুমান ছিল, Education is an investment in human resources. অর্থাৎ শিক্ষা হলো মানবসম্পদের জন্য বিনিয়োগস্বরূপ। এর পাশাপাশি এ কমিশনে একটি বিশেষ ফোকাল পয়েন্ট ছিল, শিক্ষা একটি পণ্য। পণ্য কিনতে গেলে যেমন অর্থের প্রয়োজন হয়, তেমনি শিক্ষা লাভ করতে হলেও অর্থ ব্যয়ের কোনো বিকল্প নেই।

এ কমিশনের সুপারিশকে ভিত্তি করে নবম শ্রেণি থেকে শিক্ষার বিশেষায়িত স্রোতগুলোকে পৃথক করে দেওয়া হয়। উত্তরাধিকারসূত্রে ব্রিটিশ শাসন থেকে আমরা যে শিক্ষাব্যবস্থা পেয়েছি তার স্রোতধারা বিভক্ত করা হয়েছিল একাদশ শ্রেণি থেকে। সেই সময় যারা মানবিক বিদ্যার ছাত্র ছিল তারা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে দুবছর পড়ার পর পাবলিক পরীক্ষা দিয়ে আইএ পাশ করত। যারা বিজ্ঞানের বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করত তারা পেত আইএসসি সনদ। আর যারা বাণিজ্যিক বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করত তারা পেত আইকমের সনদ।

শরীফ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিশেষায়ণের প্রক্রিয়া শুরু হতো নবম শ্রেণি থেকে। এ ব্যবস্থা পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশের ৫০ বছর পর্যন্ত একই ধারায় চলে এসেছে। বালক-বালিকারা নবম শ্রেণিতে উঠেই দ্বন্দ্বে পড়ে যেত। কী পড়বে-বিজ্ঞান, মানবিক বিদ্যা, বাণিজ্য, নাকি ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্ট। এত অল্প বয়সে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে তার ঝোঁক জ্ঞানের কোন স্রোতটির পক্ষে তা নির্ণয় করা কঠিন। তবে সেকালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশের মধ্য দিয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বুঝতে পারত তার কোন লাইনে পড়াশোনা করা উচিত।

বহু বছর পরে হলেও আমাদের সরকার উপলব্ধি করেছে নবম শ্রেণিতে একজন বালক বা বালিকাকে শিক্ষার ধারা বেছে নিতে বাধ্য করা সঠিক হবে না। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যারা এসএসসি পাশ করবে তারা বিজ্ঞান, মানবিক এবং বাণিজ্যিক ইত্যাদি ধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারবে না। তাদের পরিচয় হবে তারা এসএসসি পাশ। আমার কাছে মনে হয়েছে, বহুদিন পর আমাদের শিক্ষা বিভাগের অধিকর্তাদের বোধোদয় হয়েছে, এতদিন তারা যা করে আসছিলেন তা সঠিক ছিল না।

এ পরিবর্তনের পর নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজাতে হবে যার মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে একজন শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে কোন ধারায় অগ্রসর হলে তার মেধার সর্বোৎকৃষ্ট সুফল দেশ ও জাতির কাজে আসবে। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীরা কোন কোন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করবে তা স্পষ্ট করতে হবে। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত যে দশটি বই পড়ানো হবে সেগুলো হলো-বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান, জীবন ও জীবিকা, ধর্ম, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি।

আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এ পর্যায় একজন ছাত্রকে অবশ্যই ভূগোলের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। বিশ্বায়নের এ যুগে ভূগোল সম্পর্কিত জ্ঞান না থাকলে একজন মানুষকে স্বল্পশিক্ষিত হিসাবে ধরে নিলে খুব অন্যায় হবে না। ভূগোল পাঠের মধ্য দিয়ে নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, মরুভূমি, বনাঞ্চল, সাগর-মহাসাগর, আবহাওয়া ও জলবায়ু, সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ, সমুদ্রভিত্তিক সম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো জানা সম্ভব।

ভূগোলের পাঠক্রমকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে সমাজ এবং সমাজবদ্ধ মানুষ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। ভূগোলের এতগুলো বিষয় সম্পর্কে কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে পড়ানো সম্ভব নয়। এগুলোকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির মধ্যে ভাগ করে পড়াতে হবে। এছাড়া ভূগোলের একটি বিশেষ দিক হলো হিউম্যান জিওগ্রাফি। হিউম্যান জিওগ্রাফিতে মানবজাতির বিভিন্ন রেস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় জানানো সম্ভব হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মরহুম আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী।

তারই উদ্যোগে দেশের নাম করা ভূগোলবিদরা ষষ্ঠ-সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির জন্য ভূগোলের পাঠ্যবই রচনা করেছিলেন। বইগুলো ছাপানোর দায়িত্ব পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিলভার বার্ডের কোম্পানি। বইগুলো খুব ভালো কাগজে ও পরিচ্ছন্নভাবে ছাপানো হয়েছিল। বইগুলোতে অনেক প্রাণবন্ত ছবি ছিল। এ বইগুলো প্রকাশের পর মরহুম আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী বিরূপ সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন-কেন তিনি মার্কিন কোম্পানিকে বই ছাপানোর কাজ দিলেন। ষষ্ঠ শ্রেণির বইটির নাম ছিল ‘এশীয় প্রতিবেশী’, অষ্টম শ্রেণির বইটির নাম ছিল ‘দক্ষিণ ভূ-ভাগ’। সপ্তম শ্রেণির বইটির নাম মনে পড়ছে না।

বাংলাদেশে পরিবর্তিত পাঠক্রমে পুস্তক রচনায় এ বইগুলোকে মডেল হিসাবে গ্রহণ করা যায়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভূগোল নামক বিষয়টি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পড়াতে হলে অতিরিক্তভাবে জীবন ও জীবিকা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি আলাদা বিষয় হিসাবে পড়ানোর প্রয়োজন নেই। আমরা ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছিলাম বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, ভূগোল, ইতিহাস, আরবি/উর্দু এবং অতিরিক্ত গণিত/বিজ্ঞান। বিষয়ের বাহুল্য ছিল না। আমরা কি উচ্চতর শ্রেণিতে পড়ার জন্য অযোগ্য হয়ে পড়েছিলাম?

প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকবে না বলে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি ৫ম ও ৮ম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষাও তুলে দেওয়া হবে। বর্তমানের ‘পরীক্ষানির্ভর’ মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে শিক্ষাকে বের করে আনার জন্য আরও কিছু প্রস্তাব করা হয়েছে। পরীক্ষার পরিবর্তে ‘দক্ষতাভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন’ চালু হতে যাচ্ছে। প্রতি বিষয়ে পূর্ণমান ১০০ নম্বর থাকলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় বিষয় ও শ্রেণিভেদে ৪০ থেকে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হবে। বাকি নম্বরের ‘শিখনকালীন’ মূল্যায়ন করবেন শিক্ষকরা। নতুন এ পদ্ধতি চালুর জন্য খোল নলচে বদলে ফেলা হচ্ছে বিদ্যমান শিক্ষাক্রম। আমরা কেন জানি ভুলে যাচ্ছি আমাদের দেশটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডা নয়। এখানে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত কাম্য স্তরে নেই। শিক্ষকরাও অনেকে জানেন না ধারাবাহিক মূল্যায়ন ব্যাপারটি কী।

যেখানে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে গড় হাজির থাকার অভ্যাস বিদ্যমান, সেখানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন কতটা কার্যকর হবে? নতুন এ পদ্ধতি নতুন ধরনের দুর্নীতির জন্ম দেবে। স্বজনপ্রীতি এবং বিশেষ বিশেষ শিক্ষার্থীর প্রতি দুর্বলতার কালচার ধারাবাহিক মূল্যায়নকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করবে। আমার মনে হয়, মূল্যায়ন সম্পর্কে আরও চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে। অনেক সময় ক্ষমতাবান অভিভাবকদের দাপটও ধারাবাহিক মূল্যায়নকে কলঙ্কিত করে তুলবে। প্রস্তাবিত সংস্কারের প্রধান দিকগুলো গ্রহণযোগ্য, কিন্তু মূল্যায়ন সংক্রান্ত প্রস্তাবটি বাংলাদেশের কালচার ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আশা করি, এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আরও চিন্তাভাবনা করে দেখবেন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমের শক্তি ও দুর্বলতা

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এ ৫০ বছরেও আমরা ঠিক করতে পারলাম না আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার স্বরূপ, কাঠামো, শিক্ষাক্রম এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য কী হবে।

বাংলাদেশোত্তরকালে শিক্ষাব্যবস্থার কীভাবে সংস্কার করা যায় সেই লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন ও কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরপরই গঠিত হয়েছিল ড. কুদরাত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি জাতীয় শিক্ষা কমিশন। এ কমিশন শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একটি রিপোর্ট প্রদান করেছিল। রিপোর্টটি মুদ্রিত আকারে প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। কারণ এ কমিশন রিপোর্ট তৈরি করার পরপরই ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়।

রিপোর্টটি মুদ্রিত না হওয়ার ফলে শিক্ষাবিদসহ শিক্ষানুরাগীদের কাছে এ রিপোর্টের কপি পৌঁছানো হয়নি বলে এ রিপোর্টের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা কারও কাছ থেকে পাওয়া যায় না। এ রিপোর্ট সম্পর্কে প্রায়ই যে কথাটি সামনে আসে, সেটি হলো ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধই হবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার পাথেয়। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যে মন্ত্রিসভা গঠন করেন সেই মন্ত্রিসভায় প্রয়াত কাজী জাফর আহমদ ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী।

প্রধানত কাজী জাফর আহমদের উদ্যোগে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা পর্যালোচনা করার জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক ও স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে ব্যাপক অংশগ্রহণভিত্তিক সেমিনারের আয়োজন করে। এসব সেমিনারে দলমত নির্বিশেষে অনেকেই অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাদের সুচিন্তিত মতামতও দিয়েছেন। দীর্ঘক্ষণ ধরে একেকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক হয়েছে।

এমনকি রাষ্ট্রপতি জিয়াও কয়েকটি অধিবেশনে সশরীরে উপস্থিত হন এবং অধিবেশন শেষ হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন জনের মতামত জানা ও বোঝার চেষ্টা করেছেন। এ সেমিনারগুলো ছিল সরাসরি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানী ও গুণিজনেরা কী ভাবছেন এবং কী করণীয় তা জানা ও বোঝার জন্য খুবই মূল্যবান। দুর্ভাগ্যবশত এরকম একটি ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক আলোচনার কোনো রেকর্ড এখন আর পাওয়া যায় না।

হয়তো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত দলিল-দস্তাবেজ সংরক্ষিত আছে। এ ব্যাপক পর্যালোচনার সুফল হিসাবে যা বাস্তবায়িত হয়েছিল তা হলো, নোটবই বেআইনি ঘোষণা করা। বেশ ক’বছর নোটবুকের ব্যবসা বন্ধ থাকলেও তা পরবর্তীকালে পুনর্জন্ম লাভ করে। আমাদের স্কুল ও কলেজের শিক্ষাব্যবস্থা ভয়ানকভাবে নোটবইনির্ভর। এর ফলে শিক্ষার্থীরা মূল পাঠ্যবইতে কী আছে তা পাতা উলটিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করে না। সর্বোপরি নোটবইগুলো শিক্ষার্থীদের মনোজগতকে আড়ষ্ট করে ফেলে। শিক্ষার্থী তার নিজের চিন্তা-ভাবনাগুলো যথাসাধ্য গুছিয়ে প্রকাশ করতে পারে না। নোটবই মুখস্থ বিদ্যাকে উৎসাহিত করে।

দুঃখজনক হলো, নোটবই না কিনলে শিক্ষার্থীরা টেক্সট বুক বোর্ডের পাঠ্যবইগুলো কিনতে পারত না। নোটবই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে পুস্তক প্রকাশক এবং শিক্ষকদের অসাধু প্রয়াসের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে অত্যন্ত ক্ষতিকারক এক ধরনের অপরাধবৃত্তি। নোটবইয়ের ব্যবসা স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের কলুষিত করেছে এবং অনেক শিক্ষক পাঠদান করতে গিয়ে নিজের মনন ও মেধার ব্যবহার না করে শ্রেণিকক্ষে নোটবইনির্ভর শিখন পদ্ধতি চালু করেছেন।

রাষ্ট্রপতি এরশাদের আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক ড. মফিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। এ কমিশন তাদের রিপোর্ট যথাযথ কর্তৃপক্ষকে দিলেও দেশবাসী এ কমিশনের রিপোর্টে কী ছিল তা আজও জানতে পারেনি। ২০০৯-এ ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার ড. কাজী খলীকুজ্জমানের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে।

এ কমিশনও বেশ কিছু সুপারিশ প্রদান করেছে। এগুলোর কিছু কিছু বাস্তবায়নও করা হয়েছে। আমরা এতটুকু বুঝতে পারি, ড. কুদরাত-ই-খুদা কমিশনের রিপোর্টকে মুখচেনা কতিপয় বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার রোগ ও দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সর্বোৎকৃষ্ট দাওয়াই মনে করলেও এ যাত্রায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার কুদরাত-ই-খুদা কমিশন যে বাস্তবায়নযোগ্য নয়, সেই ধারণা থেকেই ড. খলীকুজ্জমান কমিশন গঠন করেছে।

শিক্ষা একটি গতিশীল প্রপঞ্চ। যুগের প্রয়োজনে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার করতে হয়। এ সত্যটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাশূন্যে ‘স্পুটনিক’ নামে মহাশূন্য যান প্রেরণ করার পর মার্কিন প্রশাসন এবং মার্কিন জনগণ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। তারা ভাবতে থাকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন কীভাবে এমন চমক দেখাল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে দেন।

এ কমিটির সামনে প্রশ্ন ছিল, সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থায় এমন কী আছে যা মহাকাশ যান মহাশূন্যে প্রেরণের জন্য কাজে লেগেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিয়োজিত কমিটি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার পাঠক্রম পর্যালোচনা করে এ সিদ্ধান্তে এলো যে, সোভিয়েত শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এ পর্যালোচনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত শিক্ষাকে অগ্রগণ্য বিষয় হিসাবে স্থাপন করা হয়।

আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যতটুকু জানি তা থেকে বলতে পারি-মানবিক বিদ্যা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ সব ধরনের বিষয়ে গণিতের ব্যবহার খুবই প্রয়োজনীয় গণ্য করা হয়। সেদেশে ইতিহাসের গবেষণাতেও উচ্চতর পর্যায়ের গণিতের ব্যবহার বিশেষ স্থান দখল করে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্পুটনিক-উত্তর সময়ে শিক্ষাব্যবস্থায় গণিত শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে বলে দেশটি মহাশূন্য গবেষণায় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে অতিক্রম করে যেতে সক্ষম হয়েছে।

এখন চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় গণিতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে চীন প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রে অকল্পনীয়ভাবে এগিয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যেসব চীনা ছাত্র উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছে, তারা দেখিয়ে দিয়েছে গণিতে তারাই সেরা। কথায় বলে, Mathematics is the mother of all sciences. গণিত সব ধরনের বিজ্ঞানের মাতৃসম। বাংলাদেশে বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা যতই নৈরাজ্যপূর্ণ হোক না কেন, উচ্চতর গণিতে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তার সময়ে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য তারই শিক্ষক এবং পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষা সচিব অধ্যাপক শরিফের নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। এ শিক্ষা কমিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুমান ছিল, Education is an investment in human resources. অর্থাৎ শিক্ষা হলো মানবসম্পদের জন্য বিনিয়োগস্বরূপ। এর পাশাপাশি এ কমিশনে একটি বিশেষ ফোকাল পয়েন্ট ছিল, শিক্ষা একটি পণ্য। পণ্য কিনতে গেলে যেমন অর্থের প্রয়োজন হয়, তেমনি শিক্ষা লাভ করতে হলেও অর্থ ব্যয়ের কোনো বিকল্প নেই।

এ কমিশনের সুপারিশকে ভিত্তি করে নবম শ্রেণি থেকে শিক্ষার বিশেষায়িত স্রোতগুলোকে পৃথক করে দেওয়া হয়। উত্তরাধিকারসূত্রে ব্রিটিশ শাসন থেকে আমরা যে শিক্ষাব্যবস্থা পেয়েছি তার স্রোতধারা বিভক্ত করা হয়েছিল একাদশ শ্রেণি থেকে। সেই সময় যারা মানবিক বিদ্যার ছাত্র ছিল তারা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে দুবছর পড়ার পর পাবলিক পরীক্ষা দিয়ে আইএ পাশ করত। যারা বিজ্ঞানের বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করত তারা পেত আইএসসি সনদ। আর যারা বাণিজ্যিক বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনা করত তারা পেত আইকমের সনদ।

শরীফ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিশেষায়ণের প্রক্রিয়া শুরু হতো নবম শ্রেণি থেকে। এ ব্যবস্থা পাকিস্তান আমল এবং বাংলাদেশের ৫০ বছর পর্যন্ত একই ধারায় চলে এসেছে। বালক-বালিকারা নবম শ্রেণিতে উঠেই দ্বন্দ্বে পড়ে যেত। কী পড়বে-বিজ্ঞান, মানবিক বিদ্যা, বাণিজ্য, নাকি ইন্ডাস্ট্রিয়াল আর্ট। এত অল্প বয়সে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে তার ঝোঁক জ্ঞানের কোন স্রোতটির পক্ষে তা নির্ণয় করা কঠিন। তবে সেকালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশের মধ্য দিয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বুঝতে পারত তার কোন লাইনে পড়াশোনা করা উচিত।

বহু বছর পরে হলেও আমাদের সরকার উপলব্ধি করেছে নবম শ্রেণিতে একজন বালক বা বালিকাকে শিক্ষার ধারা বেছে নিতে বাধ্য করা সঠিক হবে না। এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যারা এসএসসি পাশ করবে তারা বিজ্ঞান, মানবিক এবং বাণিজ্যিক ইত্যাদি ধারার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারবে না। তাদের পরিচয় হবে তারা এসএসসি পাশ। আমার কাছে মনে হয়েছে, বহুদিন পর আমাদের শিক্ষা বিভাগের অধিকর্তাদের বোধোদয় হয়েছে, এতদিন তারা যা করে আসছিলেন তা সঠিক ছিল না।

এ পরিবর্তনের পর নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্যক্রম এমনভাবে সাজাতে হবে যার মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে একজন শিক্ষার্থী পরবর্তীকালে কোন ধারায় অগ্রসর হলে তার মেধার সর্বোৎকৃষ্ট সুফল দেশ ও জাতির কাজে আসবে। এ ছাড়া সামগ্রিকভাবে মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীরা কোন কোন বিষয়ে জ্ঞানার্জন করবে তা স্পষ্ট করতে হবে। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত যে দশটি বই পড়ানো হবে সেগুলো হলো-বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান, জীবন ও জীবিকা, ধর্ম, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি।

আমার ব্যক্তিগত মত হলো, এ পর্যায় একজন ছাত্রকে অবশ্যই ভূগোলের জ্ঞান অর্জন করতে হবে। বিশ্বায়নের এ যুগে ভূগোল সম্পর্কিত জ্ঞান না থাকলে একজন মানুষকে স্বল্পশিক্ষিত হিসাবে ধরে নিলে খুব অন্যায় হবে না। ভূগোল পাঠের মধ্য দিয়ে নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, মরুভূমি, বনাঞ্চল, সাগর-মহাসাগর, আবহাওয়া ও জলবায়ু, সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ, সমুদ্রভিত্তিক সম্পদ, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো জানা সম্ভব।

ভূগোলের পাঠক্রমকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে সমাজ এবং সমাজবদ্ধ মানুষ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। ভূগোলের এতগুলো বিষয় সম্পর্কে কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে পড়ানো সম্ভব নয়। এগুলোকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির মধ্যে ভাগ করে পড়াতে হবে। এছাড়া ভূগোলের একটি বিশেষ দিক হলো হিউম্যান জিওগ্রাফি। হিউম্যান জিওগ্রাফিতে মানবজাতির বিভিন্ন রেস এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় জানানো সম্ভব হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন মরহুম আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী।

তারই উদ্যোগে দেশের নাম করা ভূগোলবিদরা ষষ্ঠ-সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণির জন্য ভূগোলের পাঠ্যবই রচনা করেছিলেন। বইগুলো ছাপানোর দায়িত্ব পায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিলভার বার্ডের কোম্পানি। বইগুলো খুব ভালো কাগজে ও পরিচ্ছন্নভাবে ছাপানো হয়েছিল। বইগুলোতে অনেক প্রাণবন্ত ছবি ছিল। এ বইগুলো প্রকাশের পর মরহুম আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী বিরূপ সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন-কেন তিনি মার্কিন কোম্পানিকে বই ছাপানোর কাজ দিলেন। ষষ্ঠ শ্রেণির বইটির নাম ছিল ‘এশীয় প্রতিবেশী’, অষ্টম শ্রেণির বইটির নাম ছিল ‘দক্ষিণ ভূ-ভাগ’। সপ্তম শ্রেণির বইটির নাম মনে পড়ছে না।

বাংলাদেশে পরিবর্তিত পাঠক্রমে পুস্তক রচনায় এ বইগুলোকে মডেল হিসাবে গ্রহণ করা যায়। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ভূগোল নামক বিষয়টি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী পড়াতে হলে অতিরিক্তভাবে জীবন ও জীবিকা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি আলাদা বিষয় হিসাবে পড়ানোর প্রয়োজন নেই। আমরা ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দিয়েছিলাম বাংলা, ইংরেজি, অঙ্ক, ভূগোল, ইতিহাস, আরবি/উর্দু এবং অতিরিক্ত গণিত/বিজ্ঞান। বিষয়ের বাহুল্য ছিল না। আমরা কি উচ্চতর শ্রেণিতে পড়ার জন্য অযোগ্য হয়ে পড়েছিলাম?

প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রমে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষা থাকবে না বলে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি ৫ম ও ৮ম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষাও তুলে দেওয়া হবে। বর্তমানের ‘পরীক্ষানির্ভর’ মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে শিক্ষাকে বের করে আনার জন্য আরও কিছু প্রস্তাব করা হয়েছে। পরীক্ষার পরিবর্তে ‘দক্ষতাভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন’ চালু হতে যাচ্ছে। প্রতি বিষয়ে পূর্ণমান ১০০ নম্বর থাকলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় বিষয় ও শ্রেণিভেদে ৪০ থেকে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হবে। বাকি নম্বরের ‘শিখনকালীন’ মূল্যায়ন করবেন শিক্ষকরা। নতুন এ পদ্ধতি চালুর জন্য খোল নলচে বদলে ফেলা হচ্ছে বিদ্যমান শিক্ষাক্রম। আমরা কেন জানি ভুলে যাচ্ছি আমাদের দেশটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডা নয়। এখানে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত কাম্য স্তরে নেই। শিক্ষকরাও অনেকে জানেন না ধারাবাহিক মূল্যায়ন ব্যাপারটি কী।

যেখানে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে গড় হাজির থাকার অভ্যাস বিদ্যমান, সেখানে ধারাবাহিক মূল্যায়ন কতটা কার্যকর হবে? নতুন এ পদ্ধতি নতুন ধরনের দুর্নীতির জন্ম দেবে। স্বজনপ্রীতি এবং বিশেষ বিশেষ শিক্ষার্থীর প্রতি দুর্বলতার কালচার ধারাবাহিক মূল্যায়নকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করবে। আমার মনে হয়, মূল্যায়ন সম্পর্কে আরও চিন্তাভাবনার প্রয়োজন আছে। অনেক সময় ক্ষমতাবান অভিভাবকদের দাপটও ধারাবাহিক মূল্যায়নকে কলঙ্কিত করে তুলবে। প্রস্তাবিত সংস্কারের প্রধান দিকগুলো গ্রহণযোগ্য, কিন্তু মূল্যায়ন সংক্রান্ত প্রস্তাবটি বাংলাদেশের কালচার ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আশা করি, এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আরও চিন্তাভাবনা করে দেখবেন।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন