অন্যমত
জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে
আবু আহমেদ
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের প্রবাহ একটা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, এ মৌসুমে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট; কিন্তু উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। ফলে কাগজে-কলমে ঘাটতি ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট। গ্রামে কোথাও কোথাও দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টিই জ্বালানি সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তেলভিত্তিক ও দুটি কয়লাভিত্তিক। গ্যাসের চাপও কমে গেছে। অন্যদিকে বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর বিপরীতে মিলছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রতিদিন ঘাটতি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক সরবরাহ কমে ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডিতে নেমেছে। আর এলএনজি আমদানি করে যোগ করা হচ্ছে ১ হাজার এমএমসিএফডির মতো। বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গ্যাস সরবরাহ কমছে। ঘাটতি পূরণে সরকারকে এখন দামি তেল ও ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হচ্ছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। সাধারণত লোকসানের কারণে অনেক সময় এসব বন্ধ রাখা হয়।
আসলে জ্বালানি সংকট একদিনে সৃষ্টি হয়নি। বছরের পর বছর ধরে পুঞ্জীভূত ঘাটতি জমা হয়ে আজকের এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যতদিন বাপেক্স তিতাসের আওতাধীন বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্র থেকে যথেষ্ট পরিমাণে গ্যাস উত্তোলন করতে সক্ষম হয়েছে, ততদিন দেশে গ্যাসের কোনো সংকট দেখা দেয়নি। কিন্তু দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে, ফলে গ্যাসের চাহিদা ও ব্যবহারও বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। তবে চাহিদার সঙ্গে গ্যাসের উৎপাদন সেভাবে বাড়েনি। সুতরাং গ্যাসের সংকট হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বর্তমানে দেশে গ্যাস সরবরাহ করছে শেভরন। শেভরন আমাদের গ্যাসকূপগুলোয় কিছু বিনিয়োগ করেছে এবং এরা ভালো রেজাল্টও করেছে। দেশে গ্যাসের চাহিদার ৫০ শতাংশেরও বেশি গ্যাস তারাই সরবরাহ করছে। বাকি ৫০ শতাংশ বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার অধীনে থাকা বিভিন্ন স্থাপনা থেকে দেওয়া হচ্ছে। সরকার নতুন কূপ থেকে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আশা করা যায়, আগামীতে গ্যাসের সংকট অনেকটা কমে আসবে।
গ্যাস সংকটের ধাক্কা বিদ্যুতের ওপরও পড়েছে। আসলে বিদ্যুৎ তৈরিতে তিন-চারটি কাঁচামাল ব্যবহার হয়ে থাকে। এগুলো হলো-গ্যাস, তেল, কয়লা, পানি। সবচেয়ে ব্যয়বহুল হচ্ছে তেলনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে খরচ কম। বাংলাদেশে কয়লা খনি রয়েছে। দিনাজপুরে বড়পুকুরিয়ার কয়লা আন্ডারগ্রাউন্ডে পড়ে রয়েছে। সঠিক মাত্রায় উত্তোলন করা হচ্ছে না। পরিবেশবাদীদের নিষেধাজ্ঞা এবং এলাকাবাসীর বাধার মুখে সেখান থেকে কয়লা উত্তোলন করা যাচ্ছে না। এখন সেটার ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তে আসা উচিত। কারণ অন্য দেশ থেকে কয়লা আমদানি করলে অনেক সময় বিভিন্ন কারণে কয়লা আসতে দেরি হয়। ফলে বিদ্যুৎকেন্দ্রে কয়লা কমে যাওয়ার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। কারণ, কয়লার অভাবে পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো অলস বসে থাকে। ২০০৯ সালের পর ‘কুইক রেন্টাল’ নামে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। এই কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎব্যবস্থা ছিল তেলের ওপর নির্ভরশীল। কুইক রেন্টাল পদ্ধতি একটা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য আবির্ভূত হয়েছিল। এগুলো থেকে সবসময় সরকার যে নির্দিষ্ট দামে বিদ্যুৎ কিনেছে, তাও নয়। কারণ সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ নামে একটা অতিরিক্ত চার্জ কুইক রেন্টালকে দিয়ে যেতে হয়েছে। কুইক রেন্টালকে বসিয়ে রাখলে তাদের একটা খরচ আছে, ইত্যাদি বলে তারা ক্যাপাসিটি চার্জ নামে একটি অতিরিক্ত চার্জ তাদের চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। প্রায় ৮০ হাজার কোটি বা ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে সরকারকে। এখন কিছু কিছু কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র অকেজো হয়ে গেছে এবং কোনো কোনোটির সঙ্গে সরকারের চুক্তি শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে বিদ্যুৎব্যবস্থায় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য যে, নেপাল থেকে হাইড্রো ইলেকট্রিসিটি নামে যে বিদ্যুৎ আনার কথা ছিল, সেটার বাস্তবায়ন এখনো হয়নি।
এবারে জ্বালানি তেলের ব্যাপারে আসা যাক। শিল্প ও কলকারখানা থেকে শুরু করে পরিবহণব্যবস্থা, কৃষিসহ দেশের অনেক কিছুই জ্বালানি তেলের সঙ্গে জড়িত। সুতরাং জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে এর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বেই। ইরান, ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিকভাবেই বেড়েছে। চাহিদার তুলনায় জ্বালানি তেলের অপর্যাপ্ততার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বহুগুণ বেড়ে গেছে। এটা একটা অনিশ্চয়তা, এখানে আমাদের দেশের কোনো হাত নেই। আরেকটি বিষয়ে না বললেই নয়। এলএনজি যা আগে ইউনিটপ্রতি ১৫ ডলারে কেনা যেত, এখন তা ইউনিটপ্রতি ৩০ ডলার হয়ে গেছে। অর্থাৎ এলএনজি আমদানির ব্যয় দ্বিগুণ হারে বেড়ে গেছে। আবার এলএনজি আনার পরও খরচ আছে। কারণ এলএনজি আমদানির পর এটাকে রিগ্যাসিফিকেশন করতে হয়। অর্থাৎ পূর্ণ গ্যাসে রূপান্তর করতে হয়। সেটার জন্য বোধহয় মাতারবাড়ীতে দুটি রিফাইন টাইপের টার্মিনাল রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে একটা অকেজো হয়ে গেছে। ফলে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। এখন নতুন করে আরেকটি বা আরও দুটি এলএনজি রিফাইনারি টার্মিনাল নির্মাণ করতে হলে সেটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। সুতরাং এটার জন্য আমাদের একটু অপেক্ষা তো করতেই হবে।
পাকিস্তান আমলে ইস্টার্ন রিফাইনারি নামে একটি তেল শোধনাগার বাংলাদেশে স্থাপন করা হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারি বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল এনে রিফাইন করে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহ করত। কিন্তু এর ক্যাপাসিটি আমরা আর বাড়াতে পারিনি। সেটা আমাদের আরেক দুঃখের ইতিহাস, ব্যর্থতার ইতিহাস। এখন বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে আনতে হয়। এতে বাংলাদেশ সরকারকে গুনতে হয় বাড়তি টাকা। আমি এখানে একটি কথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ রিফাইনারি মালিকানা বেসরকারি খাতে রয়েছে। ভারতে রিলায়েন্স নামে আছে আদানি। তাহলে আমাদের দেশে নেই কেন? আসলে আমাদের এখানে কোনো রহস্যজনক কারণে বেসরকারি খাতকে এসব কাজের অনুমতি দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, বেসরকারি খাতকে তেল আমদানিরও অনুমতি দেওয়া হয়নি। বেসরকারিভাবে অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করারও অনুমতি নেই এখানে। অপরিশোধিত তেলের চেয়ে পরিশোধিত তেলের দাম বেশি। আমাদের কেন বেশি দামে বিদেশ থেকে তেল আমদানি করতে হবে? আমার মতে, এসব কাজ বেসরকারি খাতের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। বেসরকারি খাত যদি রিফাইনারি তৈরি করতে ইচ্ছুক হয়, তারা যদি সেটার জোগান দিতে পারে, তাহলে সরকারের বাধা দেওয়া উচিত নয়। কাজেই যারা এ ব্যাপারে ইচ্ছা পোষণ করছে, তাদেরকে কাজগুলো করতে দেওয়া উচিত। তারা যদি রিফাইনারি করে, ক্ষতি কী? এমন নয় যে, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এমনটি নেই। আফ্রিকার দেশগুলোতেই আছে। তাহলে আমরা কেন বেসরকারি খাতকে অনুমোদন দিচ্ছি না? এসব বেসরকারি খাতে তুলে দিয়ে সরকার রেগুলেটরের ভূমিকা পালন করতে পারে, তদারকি করতে পারে। শুধু সরকারের পক্ষে এখন আর পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট আমদানি বা বাজারজাত করা খুব একটা সম্ভব হবে না। এটা আগে সম্ভব হয়েছে। এখন সম্ভব হবে না। কারণ সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা আছে।
দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন গ্রিড একটাই, যেটাকে ন্যাশনাল পাওয়ার গ্রিড বলে, যার নাম কর্নফুলী। সেটাতেও পিলফারেজ হয়, মানে সিস্টেম লস আছে। এখন বিদ্যুতের বিষয়টিকেও বেসরকারি খাতে দেওয়া যেতে পারে। আমি বলছি না পুরো বাংলাদেশের বিদ্যুৎব্যবস্থা তাদের হাতে তুলে দিতে। এটাকে দেশের আঞ্চলিক ভিত্তিতে দেওয়া যেতে পারে। এতে ক্ষতিটা কী? তারা যদি গ্রিড লাইন তৈরি করে বিদ্যুৎ সাপ্লাই দিতে পারে, তাহলে সরকার সেখান থেকে বিদ্যুৎ নিতে পারে। এসব বেসরকারি খাত উদ্যোগী হয়ে সোলার থেকে সরকারকে বিদ্যুৎ দিতে পারবে। পরিবেশ ঠিক রেখে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প যদি তারা করতে চায়-করবে, উইন্ডমিল করতে চাইলে করবে। তারা তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী যেটা করতে চায়, করুক না। আমাদের সমস্যা কোথায়? সরকার শুধু নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করবে-তারা সঠিক দামে সরকারকে সাপ্লাই দিচ্ছে কিনা, সেটা প্রতিযোগিতামূলক দাম কিনা, মান বজায় রাখা হচ্ছে কিনা ইত্যাদি। এটা করতে পারলে সরকারের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস।
আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি
অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার
