Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

Icon

মঈনুল রাকীব ও আব্দুর রাজ্জাক সোহেল

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

সরকারি চাকরিতে অন্যায্য কোটাব্যবস্থার সংস্কারসহ দেশ থেকে বৈষম্য নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা বুকের তরতাজা রক্ত ঢেলে দেয়। এরই পরিণতিতে সরকার পতনের পর প্রথমে অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য, চাকরির ক্ষেত্রে ন্যায় প্রতিষ্ঠার টেকসই কোনো উদ্যোগ এ সরকার নিয়েছে বলে দৃশ্যমান নয়। এর সর্বশেষ নজির প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিয়োগপত্র বিষয়ক বিতর্ক। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস জানিয়েছে, ৭০০-এর অধিক প্রার্থী বাদ পড়েছেন। আর জাগোনিউজ ২৪ জানিয়েছে, ৩৫১ জন প্রার্থী চূড়ান্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও নিয়োগপত্র পাননি। ২৫ সেপ্টেম্বর ডেইলি ক্যাম্পাস ‘চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক-২০২৫’ শীর্ষক প্ল্যাটফর্মের বরাতে জানায়, ‘১২ শতাধিক প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি।’

তীব্র সমালোচনার পর শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ২৬ সেপ্টেম্বর ‘এডমিন পোস্ট’ আকারে ফেসবুকে লেখেন : ‘আমরা লক্ষ করছি যে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ-২০২৫ এর নিয়োগপত্র প্রাপ্তি নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জানানো যাচ্ছে, ১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত সময়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের কেউ নিয়োগপত্র না পেয়ে থাকলে তা পরবর্তী সময়ে যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নিয়োগপত্র প্রেরণ করা হবে। উল্লেখ্য, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশন/ভেটিং একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া।’

তবে নিয়োগপত্র প্রদানের একদিন আগে প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত একটি খবরে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারি সূত্রের বরাতে যেসব কারণে নিয়োগপত্র না আসতে পারে তার মধ্যে স্বাস্থ্য, ডোপ টেস্ট ও সনদ যাচাইয়ের পাশাপাশি পুলিশ ভেরিফিকেশনের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে থাকা ফেসবুক পেজ বা গ্রুপে নানা ধরনের সংখ্যা ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে। ভেরিফিকেশনে এমনকি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বাদ পড়ার গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। এছাড়াও ফেসবুকে নিজেদের নিয়োগপত্র না পাওয়ার সুস্পষ্ট কারণ না পেয়ে অনেক চাকরিপ্রার্থীই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

দীর্ঘ কয়েক বছরের প্রস্তুতি, অসংখ্য নির্ঘুম রাত আর তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে যখন একজন প্রার্থী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সফল হয়ে সরকারি চাকরির জন্য চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন, তখন সেই আনন্দ শুধু তার একার নয়, পুরো পরিবারের, অনেক সময় পুরো গ্রামের। কারণ, একটি সরকারি চাকরি শুধু একজন তরুণের কর্মসংস্থান নয়; অনেক পরিবারের কাছে এটি নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও। কিন্তু এ আনন্দের গল্পের আরেকটি দিকও আছে। একজন প্রার্থী যখন পরীক্ষার প্রতিটি ধাপে নিজের মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন, তখন নিয়োগের শেষপ্রান্তে এসে যদি তার রাজনৈতিক মত, অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় সামনে চলে আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই-রাষ্ট্রীয় চাকরিতে শেষ পর্যন্ত কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ : মেধা ও যোগ্যতা, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্য?

সরকারি চাকরি পেতে হলে কি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নাগরিককেও নিজের রাজনৈতিক পরিচয় বদলাতে হবে? সরকারের সমালোচনা করলে, ভিন্নমত পোষণ করলে কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক মতের সমর্থক হলে মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কি তার জন্য সরকারি চাকরির দরজা সংকুচিত হয়ে যাবে?

২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে চাকরিতে কোটাজনিত বৈষম্যের সূত্র ধরে একটি গণ-অভ্যুত্থান হয়ে গিয়েছিল দেশে-এটা ভুলে গেলে নিঃসন্দেহে অবিমৃশ্যকারী মহা ভুল করবে সরকার। ইতোমধ্যে কয়েকটি বিষয়ে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ে জনগণের একাংশের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রবেশ করেছে। এনটিআরসি ও ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের ক্ষমতার গুঞ্জনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়ে শুরু, যা সরকার পরে অস্বীকার করেছে। তারপর ১১ থেকে ২০ গ্রেডের চাকরিতে ভাইভার নম্বর অযৌক্তিকভাবে ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার গণবিরোধী চিন্তা, যা প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান স্বয়ং প্রকাশ করেন। সেটিও তীব্র প্রতিক্রিয়ার কারণে আর এগোয়নি।

তবে ছাত্রছাত্রীদের মনে এ বিষয়ে সন্দেহ একদম দূর হয়নি। অনেকের মধ্যে ভবিষ্যতে সরকারি চাকরি নিয়ে রয়েছে সংশয় ও দুশ্চিন্তা। যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া অস্বচ্ছ হয়, প্রশ্ন ফাঁস হয় বা ‘ডিভাইস পার্টি’ থাকে, তবে এর দায় পরীক্ষা গ্রহণের দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষের। এর জন্য হয় পুরো পরীক্ষা আবার গ্রহণ করুন অথবা ভুয়াদের চিহ্নিত করতে সাঁড়াশি ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। কিন্তু কী কারণে এতোগুলো ধাপ অতিক্রম করার পর একজন শিক্ষার্থী তার প্রাপ্য চাকরি থেকে বঞ্চিত হবে, সেটি জানতে পারা নাগরিক হিসাবে তার এবং আমাদের সবার অধিকার।

যদি পুলিশ ভেরিফিকেশনের কারণে এ প্রার্থীরা বাদ পড়েন, সেটি সুস্পষ্ট কারণ উল্লেখ করে জানানো প্রয়োজন, পুলিশ ঠিক কী প্রতিবেদন দিয়েছে যার কারণে প্রার্থী বাদ পড়লেন। যদি প্রার্থী ফৌজদারি অপরাধে আদালত কর্তৃক সাজা বা শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন কিংবা প্রার্থী সরাসরি কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত থাকেন, সেটি প্রজ্ঞাপন দিয়ে জানানো উচিত। তাতে কয়েকশ পৃষ্ঠা যদি খরচ হয়, তারপরও প্রার্থীকে তার পূর্ণ নম্বর এবং কী কারণে বাদ পড়লেন সেটি জানানো সুশাসনের আওতায় পড়ে। তথ্য অধিকার আইন-২০০৯ অনুযায়ী এমনিতেও এ তথ্য চাইলে কর্তৃপক্ষ দিতে বাধ্য। কিন্তু ওই আইনপ্রয়োগ ছাড়াও একজন চাকরিপ্রার্থীর জানার পূর্ণ অধিকার আছে তিনি কী কারণে ২৯(১)-এ বর্ণিত তার সাংবিধানিক অধিকার ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সব নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা’ থেকে বঞ্চিত হলেন।

সাম্প্রতিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর একটি অংশ হলো-রাজনৈতিক বিশ্বাস বা পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না। রাষ্ট্রীয় এই যাচাই-বাছাইয়ের প্রচলিত নাম-‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’। ভেরিফিকেশন সব সময় অযৌক্তিক নয়। চাকরিতে নিয়োগের আগে একজন প্রার্থীর পরিচয়, নথিপত্র ও গুরুতর অপরাধমূলক সম্পৃক্ততা যাচাই করার প্রয়োজন থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভেরিফিকেশনের সীমা কোথায়? অপরাধের তথ্য যাচাই আর রাজনৈতিক আনুগত্য যাচাই দুটি নিশ্চয়ই এক বিষয় নয়। যারা ভেরিফিকেশনের দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের ভেরিফিকেশন কে করবে? তারা যে এটা অপব্যবহার করবে না, তার নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্র কি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে? কারণ, ভেরিফিকেশনের নামে হয়রানি কিংবা ঘুস গ্রহণের বহু অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ ভেরিফিকেশনের ইতিহাসও একেবারে নিরীহ প্রশাসনিক ইতিহাস নয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে পুলিশ ও গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক নজরদারি এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দমনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলেছে, সংবিধান এসেছে, নাগরিকের মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক সংস্কৃতির কিছু উত্তরাধিকার এখনো আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের কম-বেশি সব শাসনামলে অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ ভেরিফিকেশনের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়। একে কোনো দলের একক সমস্যা হিসাবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে যদি শুধু ভুক্তভোগীর রাজনৈতিক পরিচয় বদলায়, কিন্তু ব্যবস্থাটি একই থাকে, তাহলে আসলে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির কোনো পরিবর্তন ঘটে না।

একটি রাষ্ট্র প্রকৃতপক্ষে উন্নত ও সমৃদ্ধ হবে তখন, যখন সেই রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে যোগ্য ও উপযুক্ত জনবল দ্বারা পরিচালিত হবে। আর কর্মতৎপর গণবান্ধব জনবল নিয়োগের জন্য সর্বগ্রহণীয় নিয়োগ প্রক্রিয়া সুনিশ্চিত করতে পারা একটি আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র বিনির্মাণের অত্যাবশ্যক পূর্বশর্ত।

মঈনুল রাকীব ও আব্দুর রাজ্জাক সোহেল : কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

দৃষ্টিপাত সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম