Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

Icon

মোদাসসের হোসেন খান

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি। ফাইল ছবি

Advertisement

সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের তারিখ ১২৯ দফা পেছানো হলো। বিক্ষুব্ধ জনগণের দাবি-তদন্তের নামে আর সময়ক্ষেপণ নয়; প্রমাণভিত্তিক প্রতিবেদন, দায় নির্ধারণ ও বিচারের পথ প্রকাশ করুন। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় খুন হন সাংবাদিক সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি। তাদের পাঁচ বছর বয়সি ছেলে ঘরেই ছিল। প্রায় সাড়ে চৌদ্দ বছর পরও হত্যার রহস্য উন্মোচিত হয়নি। ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট ঢাকার আদালত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ১২৯তম বার পিছিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করেন। আমাদের আশঙ্কা, তারিখ হয়তো আবারও পেছানো হবে। বিচার বিভাগের এ ব্যর্থতা, তা ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃতই হোক, জাতির জন্য এক নির্লজ্জ ও কলঙ্কিত ঘটনা।

বিলম্বের নথিভুক্ত কারণ-আর অমীমাংসিত প্রশ্ন

মামলাটি প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানা, পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং ২০১২ সালের এপ্রিলে হাইকোর্টের নির্দেশে র‌্যাবের হাতে যায়। ২০২৩ সালে তদন্তভার পিবিআই-এর কাছে হস্তান্তরের পরও প্রতিবেদন আসেনি। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট র‌্যাবকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন সংস্থার অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের নিয়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। সেই দলও নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দিতে পারেনি; পরে হাইকোর্ট সময় বাড়িয়েছেন।

টাস্কফোর্সের ২০২৫ সালের অগ্রগতি-প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ডিএনএ নমুনা থেকে নিশ্চিত পরিচয় মেলেনি; ফরেনসিক প্রতিবেদন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল। তদন্তে বলা হয়, হত্যার সময় ও ঘটনার ক্রম সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া গেলেও হত্যাকারীদের পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা যায়নি। ঘটনাস্থলে জোর করে প্রবেশের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল না। তদন্তকারীরা আরও জানান, পুলিশ পৌঁছানোর আগে সেখানে বহু মানুষের যাতায়াতে আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এগুলো বাস্তব তদন্তগত বাধা হতে পারে; কিন্তু এত বছরের বিলম্বের পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়। কোনো আলামত কখন সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হয়েছে, বিদেশি পরীক্ষাগারের জবাব কী, কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো বাকি-এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ না করলে ‘তদন্ত চলছে’ কথাটি জন-আস্থার বদলে সন্দেহই বাড়াবে।

কাদের দিকে তদন্তের নজর?

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, এ মামলায় আটজনকে গ্রেফতার বা সন্দেহভাজন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল-রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, মাসুম মিন্টু, কামরুল ইসলাম ওরফে অরুণ, আবু সাঈদ, নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল ও এনামুল হক ওরফে হুমায়ুন কবির এবং তানভীর রহমান খান। তাদের মধ্যে কয়েকজন জামিনে আছেন, বাকিরা কারাগারে। তবে গ্রেফতার বা সন্দেহভাজন হওয়া অপরাধ প্রমাণ নয়। আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কাউকে হত্যাকারী বলা যাবে না। তদন্তকারীদের কাজ হলো প্রত্যেকের ভূমিকা যাচাই করা, অপরাধের সঙ্গে যোগসূত্র থাকলে প্রমাণসহ আদালতে উপস্থাপন করা এবং না থাকলে তা স্পষ্ট করা।

২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি সাংবাদিকদের বলেন, তদন্তে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সম্পৃক্ততার প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে-কিন্তু পরিচয় প্রকাশ করেননি। একই প্রতিবেদনে পিবিআই-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্তদলের কাছে এ বিষয়ে তখনো কোনো তথ্য ছিল না। এ দুই বক্তব্যের ফারাক অত্যন্ত গুরুতর। এটি কোনো ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না; বরং কৌঁসুলি ও তদন্তদলের মধ্যে তথ্য সমন্বয়ের প্রশ্ন তোলে। সংশ্লিষ্ট তথ্য থাকলে তা যথাযথভাবে তদন্তকারী দলের কাছে পৌঁছেছে কি না-সরকারের তা পরিষ্কার করা উচিত। গুজব ছড়ানো বা নাম অনুমান করে প্রচার করা নয়, প্রমাণ যাচাই করাই জরুরি।

এখানে জবাবদিহির প্রশ্ন শুধু অভিযুক্তদের নয়। থানা-পুলিশ, ডিবি, র‌্যাব, পিবিআই-নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্স, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের প্রক্রিয়া-প্রত্যেক পর্যায়ের ভূমিকা পর্যালোচনা করতে হবে। ধারাবাহিকভাবে তদন্তকারী বদল, ফরেনসিক অস্পষ্টতা, সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া এবং নতুন করে উচ্চপর্যায়ের দল গঠনের পরও অগ্রগতি না হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য দিয়ে কোনো সরকার, সংস্থা বা অজ্ঞাত ‘প্রভাবশালী মহল’ ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্ত আটকে রেখেছে-এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাওয়া না গেলেও, সেই অভিযোগ সত্য কি না, তা বের করাই নিরপেক্ষ তদন্তের অংশ হওয়া উচিত।

এই মুহূর্তের অত্যাবশ্যকীয় পদক্ষেপ

প্রথমত, সরকার ও তদন্তকারী সংস্থাকে একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে; কোনো আলামত পরীক্ষা হয়েছে, কোনো প্রতিবেদন বাকি, কোনো সাক্ষ্য যাচাই হচ্ছে, এবং প্রতিটি কাজ শেষ করার সময়সীমা কত। সংবেদনশীল প্রমাণ প্রকাশ না করেও অগ্রগতির নিয়মিত, লিখিত হালনাগাদ দেওয়া সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে স্বাধীন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নমুনা ও পরীক্ষার নথি পর্যালোচনা করা উচিত। আলামতের হেফাজত-শৃঙ্খল অক্ষুণ্ন ছিল কি না, আগের পরীক্ষার সীমাবদ্ধতা কী, এবং নতুন বা পুনঃপরীক্ষা থেকে নির্ভরযোগ্য ফল পাওয়ার সুযোগ আছে কি না-এসব নির্ধারণ করতে হবে। তদন্তে যেসব ব্যক্তি ইতোমধ্যে গ্রেফতার বা জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের পাশাপাশি ঘটনাস্থলে প্রবেশাধিকার, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, আলামত সংগ্রহ ও তদন্তের সিদ্ধান্তে যুক্ত কর্মকর্তাদের কার্যক্রমও নথিভিত্তিকভাবে পর্যালোচনা প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, সাংবাদিক দম্পতির কাজ, যোগাযোগ, ফোন ও ডিজিটাল নথি, তাদের প্রকাশিত বা অসমাপ্ত প্রতিবেদন এবং সম্ভাব্য ব্যক্তিগত, পেশাগত বা আর্থিক বিরোধ-সব সম্ভাব্য উদ্দেশ্য সমান গুরুত্বে যাচাই করতে হবে। কোনো একটি অনুমানকে আগেভাগে সত্য ধরে নিয়ে তদন্ত চালানো চলবে না। সাম্প্রতিক কৌঁসুলির বক্তব্য ও পিবিআই কর্মকর্তার বক্তব্যের অমিলও আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তি করতে হবে। ১৩ সেপ্টেম্বর রুনির ভাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলির দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন; ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার প্রযোজ্য কি না, তা যাচাইয়ের কথা জানানো হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় কোনো তথ্য পাওয়া গেলে তা মূল মামলার তদন্তদলের সঙ্গে আইনসম্মতভাবে ভাগ করা দরকার।

সবশেষে, পরবর্তী তারিখ যেন আরেকটি আনুষ্ঠানিক মুলতুবি না হয়। তদন্ত শেষ হলে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আদালতে দিতে হবে; অপরাধের প্রমাণ থাকলে নির্দিষ্ট অভিযোগে চার্জশিট, আর না থাকলে কোনো অনুসন্ধান কেন নিষ্ফল হয়েছে তার স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দিতে হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু তারিখ চাওয়া নয়-একটি শিশুর মা-বাবার হত্যার বিচার নিশ্চিত করা।

সাগর-রুনি মামলার দীর্ঘসূত্রতা এখন আর একটি পরিবারের বেদনায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি বাংলাদেশের তদন্তব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা। সরকারকে চাপ দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নির্দিষ্ট ও ন্যায়সংগত দাবি : তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ করুন, দায় নির্ধারণ করুন, প্রমাণ আদালতে দিন, এবং দোষী প্রমাণিত ব্যক্তিদের আইনের মুখোমুখি করুন।

আর কোনো অস্পষ্ট আশ্বাস নয়-জনগণ অনতিবিলম্বে জবাব ও বিচার চায়।

লে. কর্নেল (অব.) মোদাসসের হোসেন খান, বীরপ্রতীক : বীর মুক্তিযোদ্ধা; সামরিক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

অন্যমত জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

সাগর-রুনি হত্যা মামলা : তদন্ত প্রতিবেদন পেছানোর বিশ্বরেকর্ড

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা কেন জরুরি

দৃষ্টিপাত সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

সংকট মোকাবিলায় জাগতিক কৃচ্ছ্রসাধন জরুরি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম