Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

স্বদেশ ভাবনা

বিলটি সংসদে পাশ হোক

Icon

আবদুল লতিফ মন্ডল

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিলটি সংসদে পাশ হোক

Advertisement

কৃষিজমির যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণ করতে জাতীয় সংসদে একটি বেসরকারি বিল তোলা হয়েছে। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য রওশন আরা মান্নান ‘কৃষিজমি (যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণ) বিল-২০২২’ শীর্ষক বিলটি ৩১ মার্চ সংসদে উত্থাপন করেছেন।

পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী বিলটিতে বলা হয়েছে, আইন কার্যকর হওয়ার পর দেশের সব কৃষিজমি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না বা অন্য কোনো কাজের জন্য ভাড়া বা ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না। তবে ব্যক্তিগত বসবাসের জন্য ঘর নির্মাণ, কবরস্থান, শ্মশান, অন্যান্য ধর্মীয় সৎকারের স্থান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য এই বিধান প্রযোজ্য হবে না।

কৃষিজমির যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য তদারক কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে বিলে। এ কমিটির প্রধান হবেন সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। বিলটি আইনে পরিণত হলে এটির অধীনকৃত অপরাধ আমলযোগ্য হবে। কোনো ব্যক্তি প্রস্তাবিত এ আইনের কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে তিন বছরের জেল অথবা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কেউ কৃষি জমিতে শিল্পকারখানা, রাস্তা, আবাসন বা অন্য স্থাপনা নির্মাণ করলে তদারক কমিটি নোটিশ দিয়ে নির্মাণকাজ ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেবে।

অন্য আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, নির্মাণকাজ ভেঙে ফেলার জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না। সংসদ বিলটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ‘বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি’তে প্রেরণ করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বেসরকারি সদস্য বলতে কোনো মন্ত্রী ব্যতীত অন্য কোনো সংসদ-সদস্যকে বোঝায় এবং কোনো মন্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো সংসদ-সদস্য কোনো বিল উত্থাপন করলে সেটিকে বেসরকারি বিল বলা হয়।

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বেসরকারি সদস্যদের বিল ও বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কার‌্যাবলির মধ্যে রয়েছে- ক. কোনো বেসরকারি সদস্য কর্তৃক সংবিধান সংশোধনকল্পে কোনো বিল উত্থাপনের নোটিশ দেওয়া হলে, সেটি উত্থাপনের অনুমতি সম্পর্কিত প্রস্তাব দিনের কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করার আগে অনুরূপ প্রত্যেকটি পরীক্ষা করা; খ. সংসদে উত্থাপনের পর এবং সংসদে বিবেচনার্থে গ্রহণের আগে বেসরকারি সদস্যদের সব বিল পরীক্ষা করা এবং সেগুলোকে প্রকৃতি, অবিলম্বতা ও গুরুত্ব অনুসারে দুটি শ্রেণি অর্থাৎ ‘ক’ এবং ‘খ’ শ্রেণিতে বিভক্ত করা; গ. বেসরকারি সদস্যদের প্রত্যেকটি বিলের স্তর বা স্তরগুলো আলোচনার জন্য প্রয়োজনীয় সময় বরাদ্দের সুপারিশ করা; ঘ. বেসরকারি সদস্যদের বিল ও সিদ্ধান্ত-প্রস্তাবের ব্যাপারে সংসদ সময়ে সময়ে কমিটিকে অন্যান্য যেসব দায়িত্ব প্রদান করবে তা পালন করা।

এটা সত্য যে, জিডিপিতে কৃষি খাতের (শস্য, বন এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সমন্বয়ে গঠিত কৃষি খাত) অবদান আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। স্বাধীনতার প্রথম দশকে জিডিপির চার ভাগের প্রায় তিন ভাগ আসত কৃষি খাত থেকে। এখন তা ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমে গেলেও এখনো ‘কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান কর্মকাণ্ড এবং জীবনীশক্তি’ (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০১৮)। তাছাড়া জিডিপিতে কৃষি খাতের রয়েছে পরোক্ষ অবদান। বিশেষ করে বৃহৎ সেবা খাতের মধ্যে পাইকারি ও খুচরা বিপণন, হোটেল ও রেস্তোরাঁ এবং পরিবহণ, সংরক্ষণ ও যোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের রয়েছে মূল্যবান অবদান।

স্বাধীনতার প্রথম দশকে দেশের মোট জনশক্তির ৭৫ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত ছিল (দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা : ১৯৮০-৮৫)। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০২১ মোতাবেক কৃষিতে নিয়োজিত জনশক্তি ৪০ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এলেও স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষিতে শ্রমশক্তির সংখ্যা সাকুল্যে কমেনি। কৃষিশুমারি ২০১৯-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট পরিবারের ৪৬ দশমিক ৬১ শতাংশ পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ গ্রামে, ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ শহরে বাস করে। এ থেকে বোঝা যায়, কৃষি আমাদের জীবন ও অর্থনীতিতে কত গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা মানে জমির ওপর নির্ভরশীলতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশের জনসংখ্যা যখন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন হ্রাস পাচ্ছে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মোতাবেক স্বাধীনতা-পরবর্তী সাড়ে ৭ কোটি জনসংখ্যা ২০২১ সালের জুনে দাঁড়ায় ১৬ কোটি ৯১ লাখে। দেশের জনসংখ্যা একদিকে যখন বেড়ে চলেছে, তখন অন্যদিকে কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। সত্তরের দশকের শেষদিকে প্রণীত দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৮-৮০) বলা হয়, দেশে কৃষিজমির পরিমাণ প্রায় ৯০ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৮৫-৯০) উল্লেখ করা হয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মাথাপিছু জমির পরিমাণ সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-১৫) বলা হয়, কৃষিজমির বহুবিধ ব্যবহার এবং নদীভাঙনের কারণে মাথাপিছু জমির প্রাপ্যতা হ্রাস পাচ্ছে এবং বছরে প্রায় ১ শতাংশ হারে কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০২০-২৫) বলা হয়েছে, প্রতিবছর ০.৭৩ শতাংশ হারে চাষকৃত জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ২০২০ সালে মোট আবাদযোগ্য জমি ৮৫ লাখ হেক্টরে এসে পৌঁছেছে। যদি হ্রাসের এ হার চলতে থাকে তবে ২০২৫ সাল নাগাদ আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৮০ লাখ হেক্টরে এসে দাঁড়াবে।

কৃষিজমির পরিমাণ হ্রাসের মূল কারণ অকৃষি খাতে এর ব্যবহার। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, ভূমি ও কৃষিজমি রক্ষায় রাষ্ট্রের সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে অপরিকল্পিতভাবে ব্যাপক হারে কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। যেসব কৃষিজমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে সেগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো আবাসন, শিল্পকারখানা স্থাপন, রাস্তা, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ। তবে সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি চলে যাচ্ছে আবাসন খাতে এবং তার বেশির ভাগ গ্রামাঞ্চলে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার আওতাধীন এলাকাগুলোয় পুরোপুরি না হলেও কিছুটা পরিকল্পনা মোতাবেক গড়ে ওঠে আবাসিক এলাকা। গ্রামাঞ্চলে এসবের বালাই নেই। পরিবারের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও যৌথ পরিবারপ্রথা প্রায় বিলোপ পাওয়ায় সেখানে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে বসতবাটী। আর এসব বসতবাটী নির্মাণে চলে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ফসলি জমি। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে দেশে বসতবাড়ির সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটি ১৮ লাখ ৬৩ হাজারে, যা ২০০১ সালের আদমশুমারির ২ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজারের তুলনায় ৭০ লাখ ১৩ হাজার বেশি। ২০২১ সালের জন্য নির্ধারিত আদমশুমারি অনুষ্ঠিত না হওয়ায় বর্তমান বসতবাড়ির সঠিক সংখ্যা জানা যাচ্ছে না। তবে তা কমবেশি সাড়ে ৪ কোটিতে পৌঁছতে পারে।

গ্রামাঞ্চলে আবাসন খাতে কৃষিজমি ব্যবহারের ওপর চাপ কমাতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২০১৩ সালে ‘পল্লী জনপদ’ নামে একটি পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করে। দেশের তৎকালীন সাতটি বিভাগের প্রতিটির একটি করে গ্রামে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্প এলাকায় স্বল্প পরিমাণ জমির ওপর আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ চারতলা ভবন নির্মাণ এবং প্রকল্প এলাকায় হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশুর খামার স্থাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়। প্রকল্পটির বাস্তবায়নের শেষ সময় নির্ধারিত ছিল ২০১৭ সালের জুন মাস, কিন্তু সেটি আলোর মুখ দেখতে পারেনি।

বাংলাদেশে বেসরকারি বিল পাশের খুব বেশি নজির নেই। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, নবম সংসদে বেসরকারি সদস্যদের উত্থাপিত ১৪টি বিলের মধ্যে তিনটি বিল পাশ হয়েছিল। পাশ হওয়া বিলগুলো ছিল আওয়ামী লীগের সাবের হোসেন চৌধুরীর ‘দ্য লেপার্স (রহিতকরণ) বিল ২০০৯, ‘হেফাজতে নির্যাতন এবং মৃত্যু (নিবারণ) বিল-২০১৩’ এবং জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নুর ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ বিল-২০১৩’। এর আগে বেশকিছু বেসরকারি বিল উঠলেও সেগুলো নাকচ হয়ে যায়।

বাংলাদেশে কৃষি খাতের চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কৃষিজমির স্বল্পতা। অপরদিকে বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার এই দেশে খাদ্যপণ্যের চাহিদা মেটাতে কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই। তাছাড়া বেঁচে থাকার জন্য আমাদের শেষ ভরসা হলো কৃষি খাত। করোনার প্রকটকালে, বিশেষ করে ২০২০ অর্থবছরে যখন অন্যান্য খাতগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছিল, তখন কৃষি খাতই আমাদের বাঁচিয়ে ছিল। তাই কৃষিজমির সুরক্ষার জন্যই বিলটি জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া দরকার।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

Advertisement

বিল

Advertisement

আরও পড়ুন

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

সরকারের শক্তি বক্তব্যে নয়, সুশাসনে হতে হবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : সম্ভাবনা, সংকট ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : সম্ভাবনা, সংকট ও মানবজাতির ভবিষ্যৎ

মাদক আর সন্ত্রাস রাজনৈতিক সহোদর

মাদক আর সন্ত্রাস রাজনৈতিক সহোদর

অন্যমত জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

জ্বালানি সমস্যার সমাধান : বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিতে হবে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম