Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

চেতনায় বুদ্বুদ

কিন্তু হায়, গেজেট হয়ে গেছে!

Advertisement

Icon

বদিউর রহমান

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কিন্তু হায়, গেজেট হয়ে গেছে!

Advertisement

শুরুতেই বলব, এ লেখাটা একটা ‘তেলমারা’ লেখা হলো কি না, সেটা পুরো লেখাটা পড়ার পর পাঠক বিবেচনা করে দেখবেন। তবে যারা আমার আগের লেখাগুলো অথবা আমার বইগুলো পড়েছেন, তারা অন্তত এটুকু তো স্বীকার করবেন, আমি যখন প্রশংসা করি, তা অনেক ভেবেচিন্তে যথার্থ ভিত্তি থাকার কারণেই করি। একইভাবে কারও অপছন্দনীয় হলেও আমি যখন সমালোচনা করি, তা-ও যথাযথ বিবেচনাতেই করে থাকি। হালে কিন্তু সমালোচনা করা নাকি নানা কারণে কঠিন হয়ে যাচ্ছে, যা আমিও বোধকরি টের পাচ্ছি। প্রশংসাকেও যদি কেউ কটুবাক্য ভেবে বসে, তবে তারও কপাল পুড়বে, আইনের আওতায় নাকি মামলা হয়ে যাবে। এখন আবার নাকি কী সব ডিজিটাল-ফিজিটাল, নিরাপত্তা-টিরাপত্তা আইন হয়েছে, যা দিয়ে নাকি হেনস্তা করা খুব সহজ।

যাকগে, তারপরও সপ্তাহখানেকের তাগিদ থেকে দুবছর পর কলামটা লিখছি। করোনায় মৃত্যু দেখে যুগান্তরে ‘করোনা ডরোনা’ শীর্ষক লেখাটি লিখলেও আমারও যৎসামান্য চিন্তা হয়েছিল যে, মরে যাওয়ার আগে আত্মজীবনীটা অন্তত লিখে ফেলি। তাই কলাম লেখা বন্ধ করে তাড়াহুড়ো করে নিজের আত্মজীবনী ‘ডোমুরুয়া থেকে সচিবালয়’ লিখে এবং তা প্রকাশ করে সময়টা কাজে লাগালাম। ভাবছিলাম, পত্রিকায় আর লিখে কী হবে, ভিন্নভাবে সময় কাটাই। সরকারি চাকরিতে আমার অনুভূতি সিরিজের বইগুলো এবং ‘তত্ত্বাবধায়ক আমল : কিছু রাজনীতি কিছু বাজনীতি’ একখণ্ডে প্রকাশ করি। সেভাবে অগ্রসরও হচ্ছিলাম, কিন্তু পদ্মা সেতুর নামকরণের গেজেট প্রকাশের পর বড় একটা অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম যেন-কেন পদ্মা সেতুর নাম শেখ হাসিনার নামে হলো না।

আমরা যারা কোনো দলীয় রাজনীতি করি না, কোনো দলের লেজুড়ও নই, কিন্তু ভোট দেওয়ার সময় দেশের স্বার্থ বিবেচনায় ভোট দিই-তাদের কাছে কোনো দলীয় সরকারের ভালো কাজ যেমন ভালো লাগে, তেমনই মন্দ কাজও মন্দ ঠেকে। আমি নিজে ছাত্রলীগ না করেও প্রতিদিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোডে যেতাম মিছিলে। কোথায় আমার সে দিনগুলো! সকাল ১০টায় গিয়ে ৭ মার্চের ভাষণ শোনার জন্য রেসকোর্সে একেবারে মহিলাদের বসার সীমানার বাঁশের বেড়ার সঙ্গে বসে গেলাম। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স দুঘণ্টারও বেশি, কী আনন্দই না ছিল তখন! একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজির আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠান-জীবনের কী এক মহান পাওয়া আজও! ১৯৮১ সালের ১৭ মে বৃষ্টিভেজা দিনে শেখ হাসিনার আগমনে সংসদ ভবনের পূর্বপাশে থাকা এখনো আনন্দদায়ক বটে। শেখ হাসিনার আমি একজন সমালোচকও বটে; কিন্তু সার্বিক বিচারে এখনো আমার শ্রেণির লোকজন তাকেই ভোট দিই। দিই এজন্য যে, তার সৎসাহস এবং উন্নয়নের গতিটা ধরে রাখতে। আমার লেখায় শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বেশ সমালোচনাও রয়েছে, যেমন আমি বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠন, সব পত্রিকা বন্ধ করে ৪টাতে নিয়ে আসারও সমালোচনা করেছি। সাবেক রেসকোর্সের এক জনসভায় বঙ্গবন্ধু যখন বললেন, আমার ওপর আপনাদের আস্থা আছে?-তখন আমার পাশে বসা সিরাজুল আলম খান হাত উঠালেন; পরে যখন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের ওপর আপনাদের আস্থা আছে কি না জানতে চাইলেন, তখন দেখলাম এই ‘দাদা’ হাত উঠাননি। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, যৌক্তিক কারণে আওয়ামী লীগের ওপর মানুষের শতভাগ আস্থা এখন না থাকলেও শেখ হাসিনার ওপর কেউ আস্থা হারায়নি। আগামী নির্বাচনেও শেখ হাসিনা এ কারণেই উতরে যাবেন। আমরা আওয়ামী লীগের অনেক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেও শেখ হাসিনাকেই আবার ভোট দেব। কারণ একটাই-উন্নয়নটা চলতে থাকুক, দেশটা একটা টেক-অফ পয়েন্টে পৌঁছে যাক। তবে অবশ্যই, হাস্য-রসাত্মক হলেও কাউকে পদ্মা সেতুতে চুবিয়ে ফেলার বক্তব্য আমাদের অপছন্দনীয়। আর পদ্মা সেতু তো সে উন্নয়নেরই এক মহামাইলফলক। আমি নিজে যমুনা সেতু কর্তৃপক্ষ এবং সেতু বিভাগে কাজ করেছি। ৪.৮ কিলোমিটারের সে সেতুর প্রথম পাইলিং উদ্বোধনে যমুনাতীরে সে কী আনন্দ আমাদের! পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের তালগোল পাকানোর বিষয়ে আমি ২০১২ সালের ২৭ জুলাই ‘বেপর্দা পদ্মা সেতু নিয়ে এ কী রাজনীতি!’, ৮ জুলাই ‘পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল : আমি কী ভাবছি’ এবং ২০১৫ সালের ২২ ডিসেম্বর ‘পদ্মা, আমার পদ্মা সেতু, আমাদের পদ্মা সেতু’ শীর্ষক লেখা লিখেছি যুগান্তরে। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর পদ্মা সেতুর মূল কাজের উদ্বোধন আমাদের আরেক উৎসব ছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন, ‘বিশ্ববাসী দেখুন আমরাও পারি।’ হ্যাঁ, আমরা পেরেছি, আমরা পেরেছি একমাত্র শেখ হাসিনার সৎসাহস এবং অদম্য মনোবলের কারণে। আমি ১৯৮৩ দক্ষিণ কোরিয়ায় এক সেমিনারে গিয়ে তাদের সিউল থেকে বুশান পর্যন্ত মহাসড়ক নিজ অর্থে করে, মাত্র ১৯ শতাংশ নিজেদের কাঁচামাল নিয়ে ১০০ শতাংশ কম্পিউটারাইজড পোহাং স্টিল মিল করার গল্প শুনেছিলাম। নেতৃত্বগুণে তা সম্ভব হয়েছিল। আমাদের পদ্মা সেতুও একমাত্র শেখ হাসিনার অবিচল এবং সৎসাহসী নেতৃত্বের কারণেই সম্ভব হয়েছে। ওবায়দুল কাদের ২০১৮ সালে পদ্মা সেতু চালু হবে বলেছিলেন। কিন্তু দেরিতে হলেও ২০২২ সালে ৬.১৫ কিমি দৈর্ঘ্যরে রেল এবং যানবাহন চলাচলের এ দীর্ঘ সেতু তো বাস্তব হলো। সালাম শেখ হাসিনা।

কোনো স্থাপনার নামকরণের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা আমাদের আছে কি না আমার জানা নেই। তবে আমার মতে, যে সরকার যে স্থাপনা করে, সে সরকার সে স্থাপনার যথোপযুক্ত নাকরণের অধিকার রাখে। আগের নাম বদলানো আমার পছন্দ নয়, এমনকি সেটা মীরজাফরের নামে থাকলেও। জানুক না প্রজন্মের পর প্রজন্ম-মীরজাফর নামেও কেউ একজন ছিল! প্রতিশোধমূলক বা প্রতিহিংসামূলকভাবে চট্টগ্রাম বিমানবন্দর, ঢাকা বিমানবন্দর, নভোথিয়েটার কিংবা আর্মি স্টেডিয়াম-প্রভৃতির নাম বদল আমার কখনো পছন্দ হয়নি। পদ্মা সেতুটি যেহেতু একমাত্র শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টিতে এবং সাহসের ফলেই হয়েছে, তাই এ সেতুটির নাম পদ্মার সঙ্গে শেখ হাসিনার নাম যুক্ত করে তার প্রতি জাতির সম্মান প্রদর্শন করা উচিত ছিল। এতে আমরা যে একটা কৃতজ্ঞ জাতি, তা প্রমাণিতও হতো। অতএব, নামটা হওয়া উচিত ছিল ‘শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু’। সম্ভব হলে, একটু সংশোধন করে যমুনা সেতুটাও ‘বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু’ করা যেতে পারে। এতে বড় নদীর নামও থাকল, শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্বের নামও সংযুক্ত হলো। সরকার পরিবর্তনে এসব নাম পরিবর্তনের সাহস যে আবার কারও হবে, তেমন ভয় বা আশঙ্কা না করাই শ্রেয়। পদ্মা ও মেঘনা নামে বিভাগ হতে যাচ্ছে নদীর নামে, ভালো কথা। কিন্তু শেখ হাসিনাকে পাঁচমিশেলি অনেক নামে ভূষিত করে যত না সম্মান দেখানো যাবে, এর চেয়ে ‘শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু’ নামে পদ্মা সেতুর নামকরণ করা হলে তাকে আরও অনেক বেশি সম্মান দেখানো হতো। কিন্তু হায়! গেজেট হয়ে গেছে!!

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

Advertisement

কিন্তু হায় গেজেট হয়ে গেছে

Advertisement

আরও পড়ুন

যখন মাৎস্যন্যায় ফিরে আসে

যখন মাৎস্যন্যায় ফিরে আসে

জুলাইয়ের বাংলাদেশ : তার ফেরার বার্তা

জুলাইয়ের বাংলাদেশ : তার ফেরার বার্তা

দার্শনিকতায় বিএনপির বিকল্প আছে কি?

দার্শনিকতায় বিএনপির বিকল্প আছে কি?

হালফিল বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম