Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

যখন মাৎস্যন্যায় ফিরে আসে

Advertisement

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

মানবসভ্যতার ইতিহাসে ন্যায় ও অন্যায়ের দ্বন্দ্ব যেন এক অন্তহীন নদীর স্রোত। সেই স্রোতে কখনো আলো, কখনো অন্ধকার। আর যখন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, তখনই জন্ম নেয় মাৎস্যন্যায়-বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খায়, দুর্বলকে পদদলিত করে শক্তিমান।

মাৎস্যন্যায় আসলে এক গভীর দার্শনিক সত্য। এটি কেবল সমাজের অরাজকতার প্রতীক নয়, বরং মানুষের অন্তর্লীন প্রবৃত্তিরও প্রতিফলন। প্রকৃতির নিয়মে শক্তিমান দুর্বলকে গ্রাস করে, কিন্তু মানুষ তো সভ্যতার সন্তান। তাহলে কেন সে একই নিয়মে চলে? উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের লোভ, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা এবং নৈতিকতার ভাঙনে। যখন রাষ্ট্রের আইন ভেঙে পড়ে, যখন ন্যায়বিচার নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন মানুষ আবার পশুত্বে ফিরে যায়। তখন সমাজ হয়ে ওঠে এক অন্ধকার জলাশয়, যেখানে বড় মাছেরা অহংকারে সাঁতার কাটে, আর ছোট মাছেরা ভয়ে সরে যায়।

ভাবুন, সমাজ যেন এক বিশাল সমুদ্র। সেখানে নানা রঙের মাছেরা মিলেমিশে থাকে। কিন্তু হঠাৎ ঝড় এলে সমুদ্রের শান্তি ভেঙে যায়। বড় মাছ তখন ক্ষুধার্ত হয়ে ছোট মাছকে গিলে ফেলে। সেই দৃশ্য যেন এক ভয়ংকর কবিতা-যেখানে প্রতিটি গিলে ফেলা প্রাণ একেকটি ছিন্নপত্র, একেকটি নিঃশব্দ কান্না। মাৎস্যন্যায় হলো সেই কবিতার অন্ধকার ছন্দ।

প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে মাৎস্যন্যায়ের উল্লেখ আছে-যখন রাজনীতি দুর্বল হয়, তখন সমাজে অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, যুদ্ধবিধ্বস্ত সময়ে, রাজশক্তি ভেঙে পড়লে, সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে লাঞ্ছনার শিকার।

আজকের পৃথিবীতেও মাৎস্যন্যায় অদৃশ্যভাবে বিরাজমান। অর্থনীতিতে দেখা যায়, বহুজাতিক কোম্পানি ছোট ব্যবসাকে গ্রাস করছে। রাজনীতিতে ক্ষমতাবানরা দুর্বল জনগণের কণ্ঠরোধ করছে। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নদী, বন, পাহাড় ধ্বংস করছে। আর প্রকৃতির দুর্বল প্রাণীরা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক জীবনে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য যেন বড় মাছ, আর ছোট মাছের চিত্রকল্প।

তবু সাহিত্য আমাদের শেখায়-মাৎস্যন্যায় মেনে নেওয়া নয়, তাকে প্রতিরোধ করা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘ন্যায় অন্যায় বিচার করিতে হইবে, তাহাই মানবধর্ম। এই মানবধর্মই মাৎস্যন্যায়ের বিরুদ্ধে অস্ত্র। সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে, দুর্বলের পাশে দাঁড়াতে হবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলতে হবে।

মাৎস্যন্যায় কেবল একটি প্রাচীন দর্শন নয়, এটি আজও আমাদের জীবনের বাস্তবতা। যখন আমরা দেখি দুর্বল মানুষের কান্না চাপা পড়ে যায়, যখন দেখি শক্তিমানরা সবকিছু দখল করে নেয়, তখনই বুঝি-মাৎস্যন্যায় আবার ফিরে এসেছে; কিন্তু মানুষের দায়িত্ব হলো সেই অন্ধকার ভেদ করে আলো আনা।

আজকের বাংলাদেশে তাকালে মনে হয়, সেই প্রাচীন মাৎস্যন্যায় আবার ফিরে এসেছে। অর্থনীতিতে : বড় ব্যবসায়ী ও করপোরেট শক্তি বাজার দখল করছে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও সাধারণ ব্যবসায়ী টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খাচ্ছে। রাজনীতিতে: ক্ষমতাবানরা দুর্বল জনগণের কণ্ঠরোধ করছে, সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের অধিকার সংকুচিত হচ্ছে। সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বেড়ে চলেছে, শহরের আকাশচুম্বী অট্টালিকার ছায়ায় গ্রামের মানুষ এখনো ক্ষুধার্ত। পরিবেশে নদী দখল, বন ধ্বংস, পাহাড় কেটে ফেলা-প্রকৃতির দুর্বল প্রাণীরা বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের বর্তমান ঘটনাবলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়বিচার যদি দুর্বল হয়, তবে সমাজে অরাজকতা জন্ম নেবে। আর সেই অরাজকতার নামই মাৎস্যন্যায়।

ঢাকার সাম্প্রতিক ঘটনাবলি যেন সেই প্রাচীন মাৎস্যন্যায়ের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। টিকাদান কেন্দ্র ভাঙচুর : যেখানে সাধারণ মানুষ আশার আলো খুঁজছিল, সেখানে ভাঙচুরের অরাজকতা তাদের নিরাপত্তা কেড়ে নিল। দুর্বল মানুষের স্বাস্থ্যসেবা যেন বড় মাছের লোভে বিলীন হয়ে গেল। স্টুডিও ভাঙচুর : শিল্পীর সৃজনশীলতার আশ্রয়স্থল ভেঙে দেওয়া হলো। সৃষ্টিশীলতার ছোট মাছকে ক্ষমতার বড় মাছ গিলে ফেলল। বাড়ি দখলের চেষ্টা : সাধারণ মানুষের বসতভিটা, তাদের স্বপ্নের আশ্রয়, দখলবাজির শিকার হলো। দুর্বল মানুষের ঘর যেন বড় মাছের ক্ষুধায় নিঃশেষ হয়ে গেল। ঢাকার সাম্প্রতিক দখলবাজি ও ভাঙচুরের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ন্যায়বিচার যদি দুর্বল হয়, তবে সমাজে অরাজকতা জন্ম নেবে। আর সেই অরাজকতার নামই মাৎস্যন্যায়।

মাৎস্যন্যায়। কখনোই একা জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকে ক্ষমতার ছায়া, রাজনৈতিক প্রশ্রয়। যখন ক্ষমতাবানরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় না, বরং তাকে আশ্রয় দেয়, তখন বড় মাছ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। দখলবাজি, ভাঙচুর, দুর্বলকে পদদলিত করা-এসব কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক প্রশ্রয় ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। আইন যদি নিরপেক্ষভাবে কাজ করে, তবে বড় মাছ ছোট মাছকে গিলে খেতে পারবে না; কিন্তু আইন যদি ক্ষমতার কাছে নত হয়, তখনই মাৎস্যন্যায়। সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।

আজকের বাংলাদেশে আমরা দেখি-দখলবাজি, ভাঙচুর, দুর্বল মানুষের অধিকার হরণ। এসব কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক প্রশ্রয় ছাড়া সম্ভব নয়। টিকাদান কেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনা দেখায়, জনস্বার্থের জায়গা শক্তিমানদের হাতে নিরাপদ নয়। বাড়ি দখলের চেষ্টা দেখায়, দুর্বল মানুষের স্বপ্ন রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের কারণে ভেঙে যায়।

মানবসমাজে ন্যায় ও অন্যায়ের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। সভ্যতার প্রতিটি যুগে দেখা গেছে-যখন কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় যায়, তখন তার ছায়ায় কিছু দুর্বৃত্ত মাথা তোলে। তারা মনে করে, ক্ষমতার প্রশ্রয় তাদের অজেয় করে তুলেছে। এভাবেই জন্ম নেয় মাৎস্যন্যায়।

রাজনৈতিক ক্ষমতা দুর্বৃত্তদের জন্য যেন এক অদৃশ্য ঢাল। তারা জানে, আইন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হবে না, কারণ ক্ষমতার ছায়া তাদের রক্ষা করছে। তারা মনে করে, জনগণের ক্ষোভকে তারা উপেক্ষা করতে পারে, কারণ রাজনৈতিক শক্তি তাদের পাশে আছে। ফলে তারা হয়ে ওঠে বেপরোয়া-দখলবাজি, ভাঙচুর, দুর্বলকে পদদলিত করা তাদের কাছে স্বাভাবিক হয়ে যায়।

ভাবুন, সমাজ যেন এক নদী। সেই নদীতে নানা মাছ মিলেমিশে থাকে। কিন্তু হঠাৎ বড় মাছের পাশে যদি নদীর প্রহরী দাঁড়ায়, তবে ছোট মাছের আর কোনো আশ্রয় থাকে না। রাজনৈতিক ক্ষমতা হলো সেই প্রহরী, যে দুর্বলের পাশে না দাঁড়িয়ে শক্তিমানের পাশে দাঁড়ায়। তখন নদী হয়ে ওঠে অরাজকতার জলাশয়।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গেলে প্রায়ই দেখা যায়, দুর্বৃত্তরা দখলবাজিতে নেমে পড়ে। সাধারণ মানুষের বাড়ি, দোকান, জমি তাদের লোভের শিকার হয়। ভাঙচুরের মাধ্যমে তারা দুর্বলকে ভয় দেখায়, যেন কেউ প্রতিবাদ না করে। জনগণের কণ্ঠরোধ হয়, আর দুর্বৃত্তরা মনে করে তারা অজেয়। এ যেন এক অদৃশ্য মাৎস্যন্যায়, যেখানে দুর্বল মানুষের স্বপ্ন ভেঙে যায়, আর শক্তিমানরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। এর মূল কারণ হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বৃত্তদের প্রশ্রয়, বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জননিরাপত্তায় আস্থাহীনতা। সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধ, রাজনৈতিক সহিংসতা, দখলবাজি ও গণপিটুনির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি ‘ভঙ্গুর ও উদ্বেগজনক’ বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে।

২০২৫-২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ নিহত ও কয়েক হাজার আহত হয়েছেন। ভিন্নমতাবলম্বীদের দমন, নির্বিচার গ্রেফতার ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা জননিরাপত্তাকে দুর্বল করেছে। ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে ২,০৭৬টি হত্যা মামলা হয়েছে-প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০টি। ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। জানুয়ারি-জুলাই ২০২৬ সময়ে ১৩৪ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, জনগণ পুলিশের প্রতি আস্থা হারিয়ে নিজেরাই বিচার করতে চাইছে। নির্বিচার আটক, জামিন না দেওয়া, হেফাজতে মৃত্যু-এসব ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়েছে। সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠী ভূমি দখল, হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হচ্ছে। দেশে তৈরি হয়েছে এক অরাজক পরিস্থিতি।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে অরাজকতা মানে শুধু আইনভঙ্গ নয়, বরং মানুষের নৈতিকতার ভাঙন। যখন রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা দুর্বল হয়, যখন ন্যায়বিচার নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তখন সমাজে জন্ম নেয় সেই ভয়ংকর ছায়া-অরাজকতা। আজকের বাংলাদেশে তাকালে মনে হয়, আমরা যেন অরাজকতার যুগ পার করছি। বাংলাদেশের বর্তমান ঘটনাবলি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-ন্যায় যদি দুর্বল হয়, তবে সমাজে অরাজকতা জন্ম নেবে। আর সেই অরাজকতার নামই মাৎস্যন্যায়।

সাহিত্য আমাদের শেখায়-অরাজকতাকে মেনে নেওয়া নয়, তাকে প্রতিরোধ করা। নজরুলের বিদ্রোহী কণ্ঠ, রবীন্দ্রনাথের ন্যায়বোধ, জীবনানন্দের নিঃসঙ্গ মানুষের ছবি-সবই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের দায়িত্ব হলো দুর্বলের পাশে দাঁড়ানো। বাংলাদেশের সমাজ যেন এক নদী। সেই নদীতে বড় মাছেরা অহংকারে সাঁতার কাটে, ছোট মাছেরা ভয়ে সরে যায়। কিন্তু নদীর সৌন্দর্য তখনই পূর্ণ হয়, যখন সব মাছ মিলেমিশে থাকে। অরাজকতা ভেঙে দেয় সেই সৌন্দর্য, আর ন্যায় প্রতিষ্ঠা ফিরিয়ে আনে মানুষের স্বপ্নের নদী।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

যখন মাৎস্যন্যায় ফিরে আসে

যখন মাৎস্যন্যায় ফিরে আসে

জুলাইয়ের বাংলাদেশ : তার ফেরার বার্তা

জুলাইয়ের বাংলাদেশ : তার ফেরার বার্তা

দার্শনিকতায় বিএনপির বিকল্প আছে কি?

দার্শনিকতায় বিএনপির বিকল্প আছে কি?

হালফিল বয়ান রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম