চেতনায় বুদ্বুদ
নতুন মার্কিন ভিসানীতি কতটা সুফল বয়ে আনবে
Advertisement
বদিউর রহমান
প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নতুন মার্কিন ভিসানীতি নিয়ে কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশ সরগরম। বাংলাদেশ মানে তো এ ক্ষেত্রে রাজধানী ঢাকাই যেন বিবেচ্য বেশি। গত ২৪ মে বুধবার বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে। এ নীতি অনুসারে কেউ সুষ্ঠু নির্বাচনে বাধার সৃষ্টি করলে যুক্তরাষ্ট্র তাকে ভিসা দেবে না। ফলে রাজনৈতিক দলের সদস্য-হোক সরকারদলীয় বা বিরোধী দল, সরকারি কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ ইত্যাদি-অর্থাৎ নির্বাচনে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টিকারী যিনিই হোক তিনি মার্কিন ভিসা পাবেন না। এমনকি তাদের অর্থাৎ বিঘ্ন সৃষ্টিকারীদের পরিবারের সদস্যও এতে অন্তর্ভুক্ত হবেন। কী অদ্ভুত ব্যাপার, কঠোর এক নীতি আমাদের দেশে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য, গণতন্ত্র কায়েমের জন্য! এমন বাংলাদেশ-দরদি নীতিকে স্বাগত না জানিয়ে উপায় আছে? স্বর্গের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা কত আরাধ্য আমাদের অনেকের। অতএব, তা পেতে হলে নিখাদ গণতন্ত্রী হতে হবে, ভেজালের রাজনীতি চলবে না, নির্বাচনে কোনো ধরনের বাধা-বিঘ্ন সৃষ্টি করা যাবে না। এ বাধা-বিঘ্নের মধ্যে ভয় দেখানো, চাপ প্রয়োগ আরও কতকিছু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে জানি না। আমি এখনো ভিসানীতি দেখিনি, যতটুকু পত্রপত্রিকায় পড়েছি তা-ই সম্বল। কিন্তু আমার মনে এ নিয়ে কিছু প্রশ্ন জেগেছে, মনটা বড় আতিপাতি করছে-তাহলে যুক্তরাষ্ট্রই আমাদের সঠিক এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে আনতে দয়াবান হয়েছে? মনে পড়ে গেল, শেখ হাসিনার কথা-‘যুক্তরাষ্ট্র চাইলে আমাদের সরকার ওলট-পালট করতে পারে।’ যুক্তরাষ্ট্র বা বড় শক্তিধর কোনো দেশই ছোট দেশ বা তাদের সরকারকে তেমন আমলে নিতে চায় না, এমনকি এসব ছোট এবং গরিব দেশের সরকার বা সরকারপ্রধানকেও যথাসম্মানে দেখতে চায় না অনেক সময়ই। আমরা জানি না, সম্প্রতি বড় চারটি দেশের দূতাবাস/ হাইকমিশনের নিরাপত্তা-সুযোগ কমানোর সরকারি সিদ্ধান্ত এতদ্বিষয়ে কোনো ভূমিকা রেখেছে কিনা। শেখ হাসিনা একজন জাতীয়তাবাদী নেতা, বঙ্গবন্ধু থেকে কোনো অংশে কম স্বাধীনচেতাও নন। অতএব, তাকে মেনে নিতে বড় মোড়লদের অনেকের কষ্ট হয় বটে। মোড়লরা সব সময় তোয়াজ পছন্দ করে, তা আন্তর্জাতিক মোড়লই হোক আর দেশীয় মোড়লই হোক। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশীয় রাজনীতিতেও এ মোড়লগিরি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এখানে কর্তৃত্বপরায়ণতা বেড়ে গেছে, বড় রাজনৈতিক দুটি দলেই প্রকৃত গণতন্ত্র নেই। এর ফলেই রাজনৈতিক অস্থিরতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, এতেই নির্বাচন বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এ সুযোগটাই নিল। এর দায় প্রথমেই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এবং বড় দুদলের। হালে আমরা রাজনৈতিক অঙ্গনে যে দেহভঙ্গি এবং আক্রমণ-পালটা আক্রমণ দেখছি তাতে রাজনৈতিক ভব্যতা আছে বলে মনে হয় না।
অবাক ছিলাম যখন পত্রপত্রিকায় দেখি, আওয়ামী লীগ বলে এ ভিসানীতি তো আওয়ামী লীগের সুষ্ঠু ভোটের পক্ষেই, আবার বিএনপি বলে, আওয়ামী লীগের ভোটের সুষ্ঠুতার জন্যই যেন এমন ভিসানীতি। পত্রপত্রিকায়, টকশোতে এ নিয়ে কম আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে না। গাজীপুরে ভোটের আগের দিন ২৫ মে আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টির নেতারা মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বাসার বৈঠকেও হাজির। বিএনপি, জাতীয় পার্টি সরাসরি এ ভিসানীতিকে স্বাগতও জানিয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি না, যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে কেন এ তিন দলের নেতারা রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের বাসায় গিয়ে হাজির হলেন এবং পৌনে বারোটা থেকে দুঘণ্টা সেখানে আলোচনা করলেন। এ তিন দল কি নিজেদের লোকদের মার্কিন ভিসা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে গেছেন? এরা কি নিজেদের নির্বাচনে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী ভেবে ফেলেছেন? পিটার হাস বললেন, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তার লক্ষ্যে এ নতুন নীতি-কিন্তু তা কীভাবে? নিশ্চয়ই পিটার হাস বুঝেছেন, তাদের ভিসার জন্য এ দেশের অনেকেই স্বর্গে যাওয়ার থেকে বেশি ব্যস্ত থাকে। অতএব, ভিসা যেন বন্ধ না হয় তজ্জন্য তারা নির্বাচনে একেবারে সুবোধ বালক হয়ে যাবে। হ্যাঁ, র্যাবের জনাসাতেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমেছে-এমন অভিজ্ঞতার আলোকেই কি যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নির্বাচনের আগে এ নতুন ভিসানীতি বাংলাদেশের জন্য চালু করল? আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোও বিদেশি দূতাবাস/ হাইকমিশনকে বড় বেশি আমলে নেয়। বিএনপি তো নালিশ করেই বেড়ায়, এবার তো গাজীপুরের মেয়র প্রার্থী জায়েদা খাতুনও তাদের কাছে চিঠি দিলেন মর্মে পত্রিকায় দেখলাম। আমাদের রাজনৈতিক দলের বিদেশিদের কাছে এভাবে দ্বারস্থ হওয়ায় বুঝা যায় যে, হয় সরকারি দল সঠিকভাবে দেশ চালাতে পারছে না, নয় সরকারকে হেয় করার জন্য এমন দ্বারস্থ হওয়া। যেটিই হোক, কোনোটাই আমাদের কাম্য নয়, কাম্য হওয়ার কথা নয়। অথচ আমরা তা-ই করে চলেছি। ফলও হয়েছে এমন, ওরা আমাদের পেয়ে বসেছে, ছড়ি ঘুরাচ্ছে, যখন খুশি লজ্জাজনক ও অপমানজনক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে।
বড় তিন দলের নেতাদের পিটার হাসের বাসায় না গেলে কি চলত না? এটা তো রাষ্ট্রীয় কোনো স্যাংশন নয়, আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, কাজ-কারবার সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে? যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের কত নাগরিক ভিসাপ্রত্যাশী বা কতজনের সে দেশের ভিসা রয়েছে তা এখনই প্রকাশ করা দরকার। নাম-ঠিকানা, পদ-পদবিসহ পুরো তথ্য পেলে আমরা বুঝতে পারতাম এদের কতজনের নির্বাচনে বিঘ্ন সৃষ্টির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। তাদের কারও কারও ভিসা না হলে বাংলাদেশ কি রসাতলে যাবে? আমার আজ মনে পড়ে, ইআরডির অতিরিক্ত সচিব থাকতে বিশ্বব্যাংকের এক ডিসিএ স্বাক্ষরের জন্য টিমে আমাকেও অন্তর্র্ভুক্ত করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের তখনকার কান্ট্রি ডাইরেক্টর ক্রিস্টিন আই ওয়ালিককে বললাম, ‘ডেভেলপমেন্ট ক্রেডিট এগ্রিমেন্টটা বাংলাদেশে স্বাক্ষর করলে অসুবিধা কোথায়?’ তার জবাব ছিল, ‘তাদের তো কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য সচিব সারওয়ার কামাল যে তার সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান।’ আমি যেতে রাজি হলাম না, ইআরডির প্রতিনিধি হিসাবে উপসচিব সৈয়দ মঞ্জুরকে পাঠালাম। আমাদের লোক তো কেবল সুযোগ পেলেই বিদেশ যেতে চায়, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র হলে তো কথাই নেই, তাতে দেশের অর্থ ব্যয় হলেও নিজেদের তো অসুবিধা নেই। অতএব, যুক্তরাষ্ট্র তো আমাদের দুর্বলতার সুযোগ নেবেই। আমাদের রাজনীতিকরাও যদি সঠিক রাজনীতি না করে থাকেন, তবে তো এক উসিলায় তারা মোড়লগিরির সুযোগ নেবেই। আমাদের বড় দুর্ভাগ্য, আমাদের সমস্যা সমাধানে স্যার নিনিয়ান থেকে আরও কতজনকে যে আসতে হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতায় মৌরসী পাট্টা যেন ক্ষমতাসীনদের থাকতেই হবে-তা আওয়ামী লীগই হোক, বিএনপিই হোক কিংবা জাতীয় পার্টির হোক। যে দলই ক্ষমতায় আসে, ভাবে তারা ছাড়া আর কেউই দেশপ্রেমিক নয়, দেশের উন্নতি কেবল তারাই করতে পারে। অন্যরা কেবল দেশ ধ্বংস করে ফেলে। এ মানসিকতা থেকে ক্ষমতায় এসেই শুরু হয় আবার ক্ষমতায় আসার ছলচাতুরীর সব কলাকৌশল রপ্ত করার। ব্যস, লেগে গেল রাজনৈতিক সংঘাত। বড় তিন দলের শাসনামলে কমবেশি আমরা একই অবস্থা দেখলাম। জিয়া ক্ষমতায় থাকার জন্য ইনডেমনিটি আইন পর্যন্ত করে ফেললেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যায় মেতে উঠল আওয়ামী লীগের লোকসহ আরও অনেকে। সুযোগ বুঝে এরশাদও ক্ষমতায় এসে গেলেন। জিয়া, এরশাদ দুজনই সেনাছাউনি থেকে এসে সামরিক আইন থেকে আবার রাজনীতিক বনে গেলেন। অন্য রাজনীতিকরা আবার হালুয়া-রুটির জন্য তাদের দলে ভিড়ে গেলেন। সামরিক আইন ছাড়া একমাত্র গণতান্ত্রিক দল আওয়ামী লীগ নিজেই গণতন্ত্রটাকে ধরে রাখতে পারল না। ফল হলো রাজনৈতিক অরাজকতা, হত্যা, ক্যু আর পালটা ক্যু। খালেদা জিয়া ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির বিনা ভোটের নির্বাচন করে ফেললেন। গণআন্দোলন আর গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতন হলো, জিয়া তো প্রাকৃতিক-প্রতিশোধে খুন হলেনই। আওয়ামী লীগ আবার ২০১৪ বিনা ভোটে ১৫৩/১৫৪ আসনে এসে গেল, বিএনপি ভোটে না এসে আগুন-সন্ত্রাস কায়েম করল। তারপর ২০১৮ রাতের ভোটের অভিযোগ হলো, খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদার ভাষায় তার স্বীকৃতিও মিলে গেল, আরও অনেক রাজনীতিকের কথায়ও তার প্রমাণ হয়ে গেল। কী দরকার ছিল এর? সুষ্ঠু ভোট হলেও তো আওয়ামী লীগ ভালোভাবে মেজরিটিতে জয়ী হতো। এখন আবার বিএনপির ভোট বর্জন, নিরপেক্ষ সরকারের দাবি, দুদলের অনড় অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সাইজ করার জন্য সুযোগ নিল, নতুন ভিসানীতিতে মোড়লগিরি ফলাল।
আমরা কি যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার জন্য এত অধির হব? যদি হই তবে তো তাদের ভিসানীতির শর্ত মানতেই হবে। আমরা এখনো পরিষ্কার বুঝতে পারলাম না, নির্বাচনে বাধা সৃষ্টি প্রমাণিত হবে কীভাবে। যুক্তরাষ্ট্র কাউকে বাধাবিঘ্ন সৃষ্টিকারী সাব্যস্ত করলেই কি তিনি কথিত দোষে দুষ্ট হয়ে যাবেন? নাকি আমাদের বিচার বিভাগীয় কোনো সিদ্ধান্ত এতে বিবেচ্য হবে? নাকি আমাদের নির্বাচন কমিশনের কোনো সিদ্ধান্ত এতে কার্যকর হবে? নির্বাচনে পর্যবেক্ষণকারী এনজিওগুলোর এতে কী ভূমিকা থাকবে? তাদের কোনো পর্যবেক্ষণ কি কাউকে বাধা সৃষ্টিকারীর ভূমিকায় ফেলবে? ভিসানীতি অনুসারে বাধা সৃষ্টিকারী সাব্যস্তের মোডাস-অপারেন্ডি কী হবে? আচ্ছা, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা চাইছে না, জীবনেও যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করবে না-এমন কিছু বা অনেক লোক কি নির্বাচনে অরাজকতা সৃষ্টি করতে, বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে না? যদি পারে, তাহলে সেখানে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের তেমন নির্বাচনকে কীভাবে দেখবে? তাদের ক্যাপিটল হিলে যে ট্রাম্পের সমর্থক হাজারো লোক উঠে গেল-তেমনি বাংলাদেশে ঘটতে পারে না? ঘটলে যুক্তরাষ্ট্রের এ শিক্ষার বিরুদ্ধে ভিসানীতি কী কাজে আসবে? আমাদের রাজনীতিকরা, অবশ্যই বড় রাজনৈতিক দলগুলো পিটার হাসের বাসভবনে না দৌড়ে ভিন্নতর সম্মানজনক অবস্থানের চিন্তা করবেন-এটাই প্রত্যাশা।
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান
