Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

গণতন্ত্র যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়

Advertisement

Icon

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গণতন্ত্র যখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়

Advertisement

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন অধ্যাপক Steven Levitsky and Daniel Ziblatt যৌথভাবে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। গ্রন্থটির শিরোনাম হলো ‘How Democracies Die: What History Reveals About Our Future’. গ্রন্থটি ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয়েছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, মর্কিন গণতন্ত্র কি বিপদাপন্ন। তারা কখনো ভাবেননি এ রকম প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে।

তারা দেখেছেন, তাদের সহকর্মীরা ১৫ বছর ধরে চিন্তা করেছেন, লিখেছেন এবং ছাত্রদের পড়িয়েছেন গণতন্ত্রের ব্যর্থতা নিয়ে। এ বিপন্ন অবস্থা ছিল ভিন্ন কিছু দেশে এবং ভিন্ন কিছু সময়ে। এ পরিস্থিতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯৩০-এর দশকের ইউরোপের অন্ধকার সময়, ল্যাটিন আমেরিকায় ১৯৭০-এর দশকের নির্যাতন ও নিপীড়ন।

বেশ কিছু বছর ধরে তারা গবেষণা করেছেন কীভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন ধরনের কর্তৃত্ববাদের আবির্ভাব ঘটেছে। তাদের পেশাগত আচ্ছন্নতা হলো কী করে এবং কেন গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে তা বুঝতে চেষ্টা করা।

অনেকের ধারণা ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রের ভিত এতই মজবুত যে, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে না। হার্ভার্ডের এ দুই অধ্যাপক দুবছর ধরে দেখেছেন রাজনীতিবিদরা যা বলেন এবং করেন তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নজিরবিহীন। তারা জানতেন, পৃথিবীর অনেক দেশে গণতন্ত্র সংকটাপন্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমসাময়িক অবস্থা দেখে তারা ভয় পাচ্ছেন। নিজেদের প্রবোধ দেওয়ার জন্য তারা ভাবতে চেষ্টা করেছেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা এত খারাপ হতে পারে না।

তারা জানতেন, গণতন্ত্র সবসময় ভঙ্গুরতার মধ্যে থাকে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ মাধ্যাকর্ষণের শক্তিকে যে কোনোভাবেই হোক অস্বীকার করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সাম্যের বিশ্বাস এবং ঐতিহাসিকভাবে এর পরিপুষ্ট মধ্যবিত্ত শ্রেণি, সম্পদ ও শিক্ষায় উচ্চস্তর অর্জন, বিশাল ও বহুমুখী ব্যক্তি খাত, সব মিলিয়ে গণতন্ত্র যাতে স্বৈরতন্ত্র দ্বারা সংক্রমিত না হয়, তার জন্য এক ধরনের টিকার মতো কাজ করছে। তদসত্ত্বেও এ দুই অধ্যাপক দুশ্চিন্তামুক্ত নন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখন রাজনীতিবিদরা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের শত্রু বলে গণ্য করে। স্বাধীন সংবাদপত্রের ওপর খবরদারি চলে এবং নির্বাচনের ফলাফল না মানার একটি সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছে। এ রাজনীতিবিদরা গণতন্ত্রকে নিরাপদ করার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান রক্ষাকবচের মতো কাজ করে, সেগুলোকে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে-আইন-আদালত, গোয়েন্দা সংস্থা এবং নৈতিকতা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রগুলোকে মহান জুরিস্ট লুই ব্রেন্ডিস আখ্যায়িত করেছিলেন গণতন্ত্রের পরীক্ষাগার হিসাবে। এখন এগুলো হয়ে উঠেছে কর্তৃত্ববাদের পরীক্ষাগার। যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা নির্বাচনি নিয়মকানুন নতুন করে লেখার চেষ্টা করছেন, নির্বাচনি এলাকা পুনঃনির্ধারণ করছেন, এমনকি ভোটাধিকার বাতিল করছেন।

উদ্দেশ্য একটাই, তা হলো-নির্বাচনে পরাজিত না হওয়া। ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এক ব্যক্তি, যার সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ছিল না, সাংবিধানিক অধিকারের প্রতিকার কোনো অঙ্গীকার ছিল না এবং যিনি স্পষ্টত কর্তৃত্ববাদী মনোভাবাপন্ন ছিলেন, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। এসব থেকে কী বোঝা যায়? মার্কিন জনগণ কি বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে সফল গণতন্ত্রের পতন লক্ষ করছে?

আমেরিকার গণতন্ত্র কতটা বিপদপ্রবণ ও পশ্চাদমুখী? মার্কিন গণতন্ত্র দুনিয়ার অনেক দেশের তুলনায় শক্তিশালী হলেও বর্তমানে কতটা শক্তিশালী? এ ধরনের প্রশ্নের জবাব দিতে হলে একটু বড় ক্যানভাসে বিষয়টি পর্যালোচনা করতে হবে। ঐতিহাসিকভাবে অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। গণতন্ত্রের সংকটে নিমজ্জিত দেশগুলোর ওপর গবেষণা করলে বোঝা সম্ভব, মার্কিন গণতন্ত্রের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো কী। হার্ভার্ডের অধ্যাপকদ্বয় বিভিন্ন জাতির অভিজ্ঞতার সার সংকলন করে একটি litmus Test তৈরি করেছেন।

এ টেস্ট দিয়ে সম্ভাব্য স্বৈরাচারীদের ক্ষমতায় আসার আগেই চিহ্নিত করা যায়। আমরা আরও জানতে পারি, অতীতের গণতান্ত্রিক নেতারা যেসব ভুল করেছেন, সেসবের ফলে সম্ভাব্য স্বৈরাচারীদের জন্য ক্ষমতার দরজা খুলে গেছে। অন্যদিকে আমাদের জানতে হবে অন্য সব গণতন্ত্র কীভাবে চরমপন্থিদের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে সমর্থ হয়েছে। এভাবে একটি তুলনামূলক সমীক্ষা আমাদের জানিয়ে দেবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কীভাবে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রীদের উত্থান ঘটেছে।

দেখা গেছে এরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাত চালায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে। এসব প্রশ্নের জবাব পেলে অগণতান্ত্রিক শক্তির উত্থানকে প্রতিহত করা সহজ হয়। জানতে হবে যেসব দেশে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্রের উত্থান ঘটেছে, তাকে কীভাবে সেসব দেশের নাগরিকরা সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। যদি জানা যায়, এ রকম স্বৈরাচারবিরোধী প্রয়াস কেন ব্যর্থ হয়েছে, তাহলে স্বৈরাচারের উত্থান প্রতিহত করার কৌশল নির্ণয় সহজতর হয়।

হার্ভার্ডের অধ্যাপকদ্বয় মনে করেন, বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াসগুলো জানতে এবং বুঝতে পারলে মার্কিন গণতন্ত্রের কক্ষচ্যুত হওয়া ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ ধরে। বাংলাদেশের জনগণ যাতে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে চলতে না পারে, সেজন্য রক্তপিপাসু প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণহত্যা চালিয়ে রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছিল। এত রক্তপাত সত্ত্বেও বাংলাদেশের অভ্যুদয় প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা সংসদীয় গণতন্ত্রের পথ ধরে হাঁটবে। সংসদীয় গণতন্ত্রের সংসদ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণ আশা করে, তাদের দ্বারা নির্বাচিত সংসদ-সদস্যরা তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবেন। তাদের দ্বারা নির্বাচিত কথাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এজন্য নির্বাচনটি হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং নির্বাচনের ফলাফলকে কালিমাপূর্ণ করবে এমন সব প্রয়াস থেকে মুক্ত। একেই বলে সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। গণতন্ত্রের অনেক পূর্বশর্তের মধ্যে এ শর্তটি অত্যন্ত মৌলিক। এটাকে বাদ দিয়ে অথবা বিকৃত করে আর যাই হোক, গণতন্ত্র হয় না। এ রকম নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শাসকের উদ্ভব ঘটে।

৭ জানুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি সংসদ গঠিত হয়েছে। ভোটারদের খুব সামান্য অংশ ভোটে অংশগ্রহণ করায় নির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ সংসদ ডিফ্যাক্টো, ডিজুরে নয়। এর ফলে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে এবং সংসদের অধিবেশন বসেছে। সব কিছুই ধারাবাহিকভাবে চলছে। তবে মাঝখানে প্রশ্ন উঠেছিল, একসঙ্গে বিরাজমান দুটি সংসদ নিয়ে। এটি যে বড় ধরনের ব্যত্যয় তা হয়তো বলা যাবে না। তবে প্রশ্ন ওঠা খারাপ নয়। প্রশ্ন উঠলে শুদ্ধতা সাধন সহজ হয়।

এ সংসদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, কার্যত এতে কোনো খাঁটি বিরোধী দল নেই। যারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেছিলেন, তারা একটি পৃথক ব্লক হিসাবে সংসদে বিবেকতাড়িত ভূমিকা পালন করবেন এমনটি কেউ কেউ ভেবেছিলেন। এরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা আওয়ামী লীগে ছিলেন বলে আওয়ামী লীগের পক্ষেই ভূমিকা রাখবেন। জাতীয় পার্টির ১১ জন নির্বাচিত সদস্য বিরোধী দল হয়ে তাদের ভূমিকা পালন করবে, এমনটি জানান দেওয়া হয়েছে।

এ ব্লকের নেতা হবেন জিএম কাদের এবং উপনেতা হবেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। এ কথিত বিরোধী ব্লকের প্রতি অনাস্থা এনেছেন একই দলের অন্যরা। বেগম রওশন এরশাদ কুম্ভকর্ণের মতো ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন। তিনি জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। কথা ছিল সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় পার্টি ২৬টি আসন পাবে। এ আসন পাওয়াটা নির্ধারিত হয়েছিল শাসক দলের সঙ্গে একটি সমঝোতার মাধ্যমে। বাস্তবে এ সমঝোতা কাজে আসেনি। এ দলটি আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা সত্যিকার অর্থে বিরোধীর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবেন না। বলা যায়, এ সংসদটি গণতন্ত্রের যথার্থ প্রতিষ্ঠান রূপে দায়িত্ব পালন করবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই পঙ্গু হয়ে গেছে। জাতীয় সংসদ যখন কার্যত বিরোধী দলশূন্য, তখন গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

গণতন্ত্র

Advertisement

আরও পড়ুন

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ

নিউইয়র্কের চিঠি প্রবাসী বাঙালির অর্থহীন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয়

প্রবাসী বাঙালির অর্থহীন কর্মকাণ্ডে অর্থের অপচয়

সৎ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা কেন

সৎ করদাতার ওপর বাড়তি বোঝা কেন

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বার্তা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম