পারসেপশনে কিছু হলেও সত্য লুকিয়ে থাকে

  জয়া ফারহানা ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শুকিয়ে যাচ্ছে নদী

যা আছে ভাণ্ডে, তা-ই আছে ব্রহ্মাণ্ডে। চেতনার মধ্যে যা আছে বস্তুজগতের মধ্যে তা থাকতে বাধ্য। আরও সহজ করে বললে বলতে হবে পারসেপশনের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সত্য। খণ্ডিতভাবে হলেও থাকে। এ ভূমিকাটুকু দিতে হচ্ছে আবরার ফাহাদের মৃত্যুর কারণ মনে করিয়ে দেয়ার জন্য।

পারসেপশনের কারণে কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলার আগে ভাবা দরকার কেন পারসেপশন তৈরি হয়। বাংলাদেশ-ভারত অভিন্ন নদীর মধ্যে তিনটি বাদে প্রতিটির ওপর বাঁধ দিয়েছে ভারত। এ বাঁধের কারণে কতভাবে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, আবরার হত্যাকারীরা কি কখনও সেই হিসাব করেছে?

হিসাব তারা করে, তবে সে হিসাব নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থের হিসাব। কীভাবে হল বাণিজ্য করবে, কোন কায়দায় সিট বাণিজ্য হবে, কোন কোন কাজে ঘুষ লেনদেন করা যাবে, তাদের আছে সেই হিসাব। ভারতের পানিনীতির প্রভাবে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের একশ’ নব্বইটি নদী এখন মৃতপ্রায়। নিরানব্বই শতাংশ নদীর গভীরতা কমে গেছে। দেশের অনেক নদী স্রোতহীন।

ত্রিপুরার সাবরুম শহরের সুপেয় পানির চাহিদার জোগান দিতে ফেনী নদী থেকে ভারতকে পানি দেয়া হবে সেকেন্ডে ১ দশমিক ৮২ কিউসেক। এ মানবিক কাজ বাংলাদেশকে অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের নিজের মানুষের খাওয়ারযোগ্য পানির অবস্থা কী? দেশের ৯৬ শতাংশ মানুষ ভূগর্ভস্থ পানি পান করে।

৬১টি জেলার ২৭০টি উপজেলায় সাড়ে আট কোটি মানুষ এখনও আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। আরও চার কোটি মানুষ আছে আর্সেনিকের ঝুঁকিতে। তাদের কিন্তু পানযোগ্য পানির ব্যবস্থা নেই। দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কেবলই নিচের দিকে নামছে। ইতিমধ্যে নেমে গেছে ১৫ থেকে ৩০ মিটার। এভাবে প্রতিবছর পানির স্তর নিচে নামতে থাকলে বাংলাদেশের অগভীর নলকূপগুলোতে আর পানি পাওয়া যাবে না।

শুকনো মৌসুমে উচ্চফলনশীল ইরি ও বোরো ধানের চাষ হবে কী দিয়ে? ফারাক্কা বাঁধ দেয়ার আগে বাংলাদেশের পানিতে যে পরিমাণ লবণাক্ততা ছিল, বাঁধ দেয়ার পরে তা বেড়েছে ৬০ গুণ। বাংলাদেশের নিজেরই তো নিরাপদ পানির অভাব। সমস্যা সমাধানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কথা ভাবা হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট পানির উৎসের মাত্র ৭ শতাংশ যেখানে আসে বৃষ্টির পানি থেকে, সেখানে এ পানি সংরক্ষণ করে সতেরো কোটি মানুষের নিরাপদ পানি সমস্যার কতটুকু সমাধান সম্ভব?

৯৩ শতাংশ পানির উৎস অভিন্ন নদ-নদীর প্রবাহ। এ নদ-নদীর মধ্যে আবার সবচেয়ে বেশি পানি বহন করে ব্রহ্মপুত্র, শুকনো মৌসুমেও যার প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে ৮ হাজার কিউবেক মিটার। এ পানির ন্যায্য পাওনাটুকু পেলে উত্তরাঞ্চলে কৃষিতে সেচের জন্য পানির যে অভাব তার সমাধান হয়।

বাংলাদেশের পানির আর্সেনিক দূষণের প্রধান কারণ মাত্রাতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার। পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণের গ্রহণযোগ্য মাত্রা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতি লিটারে ০.০১ মিলিগ্রাম। কিন্তু বাংলাদেশের পানিতে আর্সেনিকের পরিমাণ প্রতি লিটারে ০.০৫ মিলিগ্রাম। কোনো কোনো অঞ্চলে এ দূষণের পরিমাণ ৩ গ্রাম। এসব অঞ্চলে সুপেয় পানি দেয়ার জন্য কী কী পরিকল্পনা আছে?

আবরার ফাহাদের পারসেপশন ছিল ভারতের সঙ্গে দর কষাকষিতে বাংলাদেশ সুবিধা করে উঠতে পারছে না। আবরারের এ পারসেপশন কি ভুল? বহুদিন ধরে ভারত বুঝ দেয়ার চেষ্টা করছে তিস্তাচুক্তি সম্ভব হচ্ছে না রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে। কিন্তু আমরা তো দেখি রাজ্য সরকারের আপত্তি সত্ত্বেও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বহু সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।

কাশ্মীর ইস্যুর কথা বললে ভারতের প্রতি প্রীতিমুগ্ধরা প্রশ্ন তুলবেন জঙ্গিবাদ ও ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে। ঠিক আছে, ধরে নিলাম কাশ্মীরিরা সবাই জঙ্গি। কিন্তু ভারত যখন আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প শুরু করল, তখন কোনো রাজ্যের আপত্তি ছিল না? আন্তঃনদী সংযোগের মহাপরিকল্পনার কালে কোন কোন রাজ্যের সমর্থন ছিল?

পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম, ত্রিপুরা, মনিপুরী, কেরালা, পাঞ্জাব, ছত্তিশগড় এবং গোয়া রাজ্য সরকার এ প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করেছিল। এতগুলো রাজ্য সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার কি আন্তঃনদী সম্পর্ক বন্ধ রেখেছে? তিস্তাচুক্তি না হওয়ার কারণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তি অজুহাত হিসেবে খুবই চমৎকার।

ভারতের কাছে এটা অবশ্য অজুহাতও নয়, যুক্তি। তা ওই দেশের ক্ষমতাসীন নেতাদের কাছে, বিরোধী নেতাদের কাছে এমনকি ভারতের জনগণের কাছেও এটা অসাধারণ যুক্তি মনে হতে পারে। কারণ দেশের স্বার্থের ব্যাপারে তারা ঐক্যবদ্ধ। জাতীয় ঐক্যের কারণে কাশ্মীর, তিস্তা যখন যে ইস্যুতে যেমন প্রয়োজন বিরোধীদের সমর্থন পেয়ে যান ক্ষমতাসীনরা।

কীভাবে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হয় বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী দলের তা শেখা উচিত ভারতের কাছ থেকে। এ বোধ থাকলে তো আবরারকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হতো না। প্রথম দফায় কয়েক ঘণ্টা পেটানোর পর যখন আবরারের মুখ থেকে ফেনা বেরোচ্ছে, কিন্তু কথা বলার সামান্য শক্তি আছে তখনও সে শরীরের শেষ শক্তিটুকু সঞ্চয় করে ক্ষীণ কণ্ঠে ক্ষমতাবান ভাইদের কাছে মিনতি জানিয়ে বলেছে, দয়া করে তারা যেন তাকে ছেড়ে দেয়।

ক্ষমতাবান ছাত্রলীগ নেতাদের পা জড়িয়ে ধরে বলেছে, ভোরেই সে হল ছেড়ে চলে যাবে। কোনো কাকুতি-মিনতিতেই মন গলেনি ছাত্রলীগের। কার আদর্শকে অনুসরণ করে এ ছাত্রলীগ নেতারা? নিজের দেশের পক্ষে কথা বলে নিজেরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত বিশ্বে আর কোন দেশে আছে? ভারতে তো নেই-ই।

বিশ্ব পানি দিবসের এক অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক কর্মসূচির পরিচালক বলেছিলেন, বিশ্বজুড়ে ১৫০টি অভিন্ন নদীর অববাহিকার শরিকি দ্বন্দ্ব বন্ধে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে অংশীদার দেশগুলোর মধ্যে রক্তাক্ত সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠবে। কিন্তু না, আমরা খুবই বন্ধুবৎসল। আমরা ‘বন্ধু’কে রক্তাক্ত করি না, নিজের দেশের মানুষকে মারতে মারতে রক্তাক্ত করে ফেলি।

ভুল কী লিখেছে আবরার? পানি নিয়ে ভারতের এক রাজ্যের সঙ্গে আরেক রাজ্যের নিত্যহাঙ্গামা, মারামারি, রেষারেষি তো আছেই। কাবেরী নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে তামিলনাড়ু ও কর্নাটক প্রদেশের মধ্যে যে অসন্তোষ তা ভুল? ‘এনআরসি নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তার কিছু নেই’ ভারতের এমন মৌখিক আশ্বাস বাংলাদেশের কাছে ধ্রুব সত্য মনে না হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

যে দেশ মমতা ব্যানার্জির ঘাড়ে বন্দুক রেখে ২০১১ সালে প্রায় নিষ্পন্ন তিস্তাচুক্তি ঝুলিয়ে রাখে আট বছর, তাদের প্রতি আস্থা না থাকাটাই স্বাভাবিক। এনআরসি নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগ কি অসঙ্গত? ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ কী বিএনপি সেটা মুখ্য নয়। মুখ্য হচ্ছে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অনিষ্পন্ন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে ভারতের কূটকৌশল। সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী মরিয়া চেষ্টাই করেন।

দর কষাকষির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পক্ষের অন্যদের প্রস্তুতির ঘাটতি থাকে। যে যুক্তি ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য সেই যুক্তি বাংলাদেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের বুদ্ধিজীবীরা, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চান এমন বুদ্ধিজীবীরা, ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করতে চান তেমন বুদ্ধিজীবীরাও মোদি সরকারের চুক্তি বিশ্লেষকদের মতো মমতা নাম্নী বধূর ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে তিস্তাচুক্তি না হওয়ার দায় থেকে মুক্তি পেতে চান।

কেন্দ্র যা বলে, পরিধি থেকে প্রত্যন্ত পর্যন্ত তোতা পাখির মতো একই বুলি আওড়ে যাওয়া এ দেশের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সব আমলেই আমরা তা দেখেছি। কিন্তু যখন ভারতীয় নেতাদের যুক্তি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ক্ষমতাসীন নেতারা মুখস্থ বলে যান তখন আমাদের জনগণের মনে কি প্রশ্ন আসে না তারা আসলে কোন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন? কাদের হয়ে কথা বলছেন? কাদের স্বার্থ দেখছেন? অবশ্য নেতাদের কাছে জনগণের সংজ্ঞা একান্ত তাদের নিজস্ব। প্রত্যেক দলের নেতাই মনে করেন জনগণ তাদের সঙ্গে আছে এবং তারা যা-ই করুন না কেন জনগণ তাদের সঙ্গেই থাকে সবসময়।

আন্তর্জাতিক নদী আইনের ৯ ও ১০ অনুচ্ছেদ নদীর পানি ব্যবহারসংক্রান্ত, তা সে প্রকল্প হোক কিংবা অন্য যে কোনো কিছু হোক, অববাহিকাভিত্তিক প্রত্যেক দেশকে তা জানাতে হবে। একই দায়-দায়িত্বের বিধান রয়েছে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনের স্ট্যাটিটিউটেও। এ আইন শতভাগ বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না, তার যথাযথ মনিটরিং দরকার।

অভিন্ন নদী থেকে ভারত তার এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে সংযোগ খালের মাধ্যমে পানি হস্তান্তরের সময় বাষ্প হয়ে উড়ে যায় অন্তত ৩০ শতাংশ পানি। এমন কত শত বৈষম্য যে রয়েছে অভিন্ন নদী নিয়ে। বলতে গেলে তকমা জোটে সস্তা ভারতবিরোধিতার! তিস্তাচুক্তিতে ভারতের আন্তরিকতার ঘাটতি আছে- এটি যদি পারসেপশন হয়, তাহলে এ পারসেপশন দূর করার জন্য ভারতের কিছু করে দেখানোর সময় এখনই।

জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×