শীতের সবজি : কত দাম, কত লাভ?
Advertisement
ড. জাহাঙ্গীর আলম
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এখন সবজির ভরা মৌসুম। বাজারে শীতের সবজির সরবরাহও প্রচুর; কিন্তু দাম কম নয়। একটি ফুলকপির দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি। করলার কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা। পেঁয়াজের দাম এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। এত দামে প্রয়োজনীয় সবজি কেনার সাধ্য অনেকেরই নেই। ক্রেতাদের অভিযোগ- দাম বেশি। কিন্তু কেন বেশি, কত বেশি- এ সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা কম। এ বিষয়ে একটি পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন।
প্রথমে শীতের সবজি শিমের কথাই ধরা যাক। এবার মৌসুম শুরুতে এর দাম ছিল ১০০ টাকার ওপরে। ক্রমেই তা নিচে নেমে এসেছে। এখন এর দাম প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আর কিছুদিন পর তা নেমে আসবে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। ফুলকপির দাম এখন ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। মৌসুম শুরুতে এর দাম ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। কিছুদিন পর তা নেমে আসবে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। তখন খামারপ্রান্তে কৃষক যে দাম পাবে, তাতে সবজির উৎপাদন খরচই উঠে আসবে না। অতএব এ বিষয়ে ভোক্তাদের ধৈর্যশীল হওয়া দরকার। দেখতে হবে এর উৎপাদন খরচ কত। কত এর গড় বিক্রিমূল্য। আর তাতে কৃষকের লাভ কত?
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের উদ্যোগে সম্প্রতি বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন খরচ, এর খামারপ্রান্তের বিক্রয়মূল্য, লাভ ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা সম্পর্কে গবেষণা চলছে। এ গবেষণার একটি প্রধান অংশীদার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট। ওই ইন্সটিটিউটের কৃষি অর্থনীতি বিভাগ সমীক্ষা পরিচালনা করছে সবজির উৎপাদন খরচ ও এর লাভ নিয়ে। তারা যে তথ্য উপস্থাপন করেছে, তাতে দেখা যায়- সবজির উৎপাদন লাভজনক। কিন্তু খামারপ্রান্তে এর লাভ কম। প্রতি কেজি ফুলকপি উৎপাদনে খরচ হয় ১০ টাকা। খামারপ্রান্তে তার গড় বিক্রয়মূল্য ১৫ টাকা। কৃষকের লাভ কেজিপ্রতি ৫ টাকা। তবে ভোক্তা পর্যায়ে এর গড় দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা। কারণ এখানে যানবাহন ও বাজারজাতকরণ খরচ, মধ্যস্বত্বভোগীদের মুনাফা এবং পচনশীলতার আর্থিক ক্ষতি যোগ করে নির্ধারণ করা হয় বিক্রয়মূল্য। সবজি একটি পচনশীল পণ্য। এর পরিমাণ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। সে কারণে খুচরা পর্যায়ে সবজির দাম খামারপ্রান্ত থেকে বেশি। বেগুনের উৎপাদন খরচ এখন প্রতি কেজি ৭ টাকা। খামারপ্রান্তে এর দাম ১২ টাকা। কিন্তু বাজারে খুচরা পর্যায়ে এর গড় মূল্য প্রতি কেজি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ টাকা। আলুর উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি সাড়ে ৬ টাকা। খামারপ্রান্তে এর গড় বিক্রয়মূল্য সাড়ে ১০ টাকা। ভোক্তা পর্যায়ে দাম গড়ে ২০ টাকা। করলার উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ১১ টাকা। কৃষক পর্যায়ে মূল্য ১৮ টাকা। লাভ-খরচের অনুপাত ১.৬৬ (সারণি-১)
বর্তমানে পেঁয়াজের উচ্চমূল্যে ভোক্তারা নাকাল। এর উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ১৫ টাকা। খামারপ্রান্তে এর গড় মূল্য ২৭ টাকা। লাভ প্রায় ৭০ শতাংশ। খুচরা পর্যায়ে এর দাম হতে পারে সর্বোচ্চ ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হলে এর গড় মূল্য দাঁড়ায় প্রতি কেজি ২০ থেকে ২৫ টাকা। খুচরা পর্যায়ে এর আমদানি সমতা মূল্য দাঁড়ায় ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। সে ক্ষেত্রে পেঁয়াজের দামে ধারাবাহিক উল্লম্ফন ও ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকানোর বিষয়টি উদ্বেগজনক। এটি ব্যবস্থাপনা সমস্যা। এতে ব্যবসায়ীদের কারসাজি আছে। এখানে সিন্ডিকেট ক্রিয়াশীল। এ সিন্ডিকেটের অতি মুনাফা আদায়ের কারসাজিকে অকার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে এ সংকট প্রলম্বিত হয়েছে। রসুনের ক্ষেত্রেও ব্যবস্থাপনা সমস্যা দৃশ্যমান। পেঁয়াজ ও রসুন মসলাজাতীয় ফসল। এগুলো সবজিরও পর্যায়ভুক্ত। চাহিদার তুলনায় কম উৎপাদন, আমদানির অনিশ্চয়তা ও বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে এ দুটো পণ্যের দাম অনেক সময় হয়ে পড়ে আকাশচুম্বী। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি ও দক্ষ ব্যবস্থাপনাই এর প্রতিকার।
বাংলাদেশে চাষকৃত সবজির সংখ্যা প্রায় ৯৫। প্রধান সবজির সংখ্যা ৩০-৩৫টি। মোট উৎপাদন এলাকা ০.৪১ মিলিয়ন হেক্টর। তাতে বছরে উৎপাদন হয় প্রায় ৪ মিলিয়ন টন সবজি। জনপ্রতি দৈনিক প্রাপ্যতা ৭০ গ্রাম। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে জনপ্রতি সবজি গ্রহণের পরিমাণ অনেক বেশি। (সারণি-২)
বিশ্ব কৃষি ও খাদ্য সংস্থার সুপারিশমতে, জনপ্রতি দৈনিক ২২০ গ্রাম সবজির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়েছে অনেক। এ ঘাটতি মেটাতে উৎপাদন বাড়াতে হবে। ২০০১ সালে দেশে মোট সবজির উৎপাদন ছিল ১.৫ মিলিয়ন টন। এখন তা ৪ মিলিয়ন টনের ওপরে। এই দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে আবাদি এলাকা বৃদ্ধি এবং হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে। সবজির আবাদ লাভজনক বলেই এর উৎপাদন ও আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে। এখন দেশে অনেক উচ্চফলনশীল সবজির জাত উদ্ভাবিত হয়েছে। কৃষক তা সানন্দে ধারণ করছেন। বাণিজ্যিক চাষাবাদে এগিয়ে আসছেন অনেক নতুন উদ্যোক্তা।
এক সময় শীতকালীন মৌসুমেই সবজির উৎপাদন হতো বেশি। গ্রীষ্মকালে এর আবাদ ছিল কম। এখন দুটো মৌসুমেই বেড়েছে সবজির আবাদ। গ্রীষ্মকালীন টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পেঁয়াজ সম্পর্কে আমাদের দেশে ত্রিশ বছর আগেও তেমন বেশি ধারণা ছিল না। এখন তা বাস্তবে সম্ভব হচ্ছে। এটি কৃষি গবেষণার অবদান। শীতকালে এখন মোট উৎপাদনের প্রায় ৫২ শতাংশ সবজির উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। বাকি ৪৮ শতাংশ সবজির উৎপাদন হচ্ছে গ্রীষ্মকালে। শীতকালীন সবজিগুলোর মধ্যে ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপি, গাজর, লেটুস, পালং শাক, ব্রকলি, শালগম, টমেটো, মুলা, লাউ, বেগুন ও শিম অন্যতম।
গ্রীষ্মকালীন সবজির মধ্যে আছে ঢেঁড়স, পটোল, মিষ্টি কুমড়া, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা, ডাঁটা, লালশাক, পুঁইশাক, করলা, শসা ইত্যাদি। কিছু সবজি উভয় মৌসুমেই জন্মে অর্থাৎ সারা বছরই উৎপাদিত হয়। এগুলোর মধ্যে আছে বেগুন, কচু, পেঁপে, কাঁচকলা, সজিনা ইত্যাদি। বাংলাদেশ বর্তমানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সবজি রফতানি করছে বিদেশে। বছরের পর বছর এর পরিমাণ ও আয় বাড়ছে। ১৯৯৩-৯৪ সালে সবজি রফতানির পরিমাণ ছিল ৮ হাজার ৪২২ টন। আয় হয়েছিল ৯.৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর ১৪ বছর পর ২০০৭-০৮ সালে সবজি রফতানি হয়েছে ৩৩ হাজার টন। আয় হয়েছে ৬৯.১২ মিলিয়ন ডলার। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রফতানি করা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টন সবজি। তাতে আয় হয়েছে প্রায় ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। রফতানিকৃত সবজিগুলোর মধ্যে আছে করলা, লাউ, শিম, কাঁচামরিচ, লতি, মিষ্টি কুমড়া, চালকুমড়া, শিমের বিচি, কাঁচা পেঁপে, ডাঁটা, পটোল, চিচিঙ্গা, বেগুন, ঢেঁড়স ইত্যাদি। এগুলোর ভোক্তা মূলত বিদেশে বসবাসরত বাঙালিরা।
পৃথিবীর ৩৫টি দেশে বর্তমানে বাংলাদেশের ফল ও সবজি রফতানি হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ইতালি ও অন্য ২৮টি দেশ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় শাকসবজির উৎপাদন ব্যয়বহুল। সে তুলনায় বাংলাদেশ থেকে সবজির আমদানি সুবিধাজনক। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বাজারে বাংলাদেশি সবজি রফতানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তবে এ জন্য বিদেশি বাজার চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানসম্মত সবজির নিরন্তর সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। সে লক্ষ্যে দরকার চুক্তিভিত্তিক ভালো মানের সবজি উৎপাদন। চাই সংগ্রহোত্তর যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ। আরও চাই, এর উন্নততর গ্রেডিং, প্যাকেটজাতকরণ ও পরিবহন। এ ছাড়া বিদেশে সবজি পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত বিমান স্পেস নিশ্চিতকরণের সঙ্গে এর ভাড়া হ্রাস করাও সবজি রফতানি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। সর্বোপরি যা প্রয়োজন, সেটি হল বিদেশে বাংলাদেশি সবজির বাজার সম্প্রসারণের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা।
সম্প্রতি বাংলাদেশে অর্গানিক সবজি আবাদ হচ্ছে। বিদেশে এগুলোর বেশ কদর আছে। দেশের অভ্যন্তরেও এদের চাহিদা আছে বেশ। অতি সম্প্রতি ঢাকায় নিরাপদ সবজি বাজারজাতকরণের জন্য ফারমার্স মার্কেট চালু করা হয়েছে। তাতে অর্গানিক সবজির চাহিদা বাড়ছে। বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি মিশনগুলো এর বাজারজাতকরণে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। এ লক্ষ্যে বিদেশি বাজার ও পণ্যমূল্য সম্পর্কে আমাদের রফতানিকারকদের নিয়মিত অবহিত রাখা প্রয়োজন।
খাদ্য হিসেবে সবজির জনপ্রিয়তা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর কারণ সবজির পুষ্টিমান সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও খনিজপদার্থ বিদ্যমান। সবজিতে আছে ভিটামিন এ ও সি। আছে প্রোটিন। আছে ক্যালসিয়াম ও লৌহ। সবজি বিভিন্ন অনুপুষ্টি উৎপাদনে সমৃদ্ধ। এটি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয়। এর অভাবে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়; দৈহিক বৃদ্ধি হয় ব্যাহত। ভিটামিন এ’র অভাবে রাতকানা, আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড এবং আয়রনের অভাবে রক্তশূন্যতা বা অ্যামোনিয়া ইত্যাদির প্রতিকার হচ্ছে খাবার হিসেবে সবজি গ্রহণ। তাছাড়া সবজি আমিষ জাতীয় খাদ্যের আত্তীকরণে সহায়ক। এটি পচনতন্ত্রের কার্যকারিতাও বৃদ্ধি করে। সবজিতে চর্বি ও শর্করার হার কম থাকায় শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে তা অত্যন্ত সহায়ক। এতে কোলেস্টরেল তেমন না থাকায় হৃদরোগ বা উচ্চরক্তচাপজনিত শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি থাকে কম। তাছাড়া সবজি আমিষ জাতীয় খাদ্যের আত্তীকরণে সহায়ক। এটি পচনতন্ত্রের কার্যকারিতাও বৃদ্ধি করে। সবজিতে কিছু ফাইটোকেমিক্যাল বিদ্যমান থাকায় টিউমারসহ অন্যান্য রোগ প্রতিরোধে তা অত্যন্ত সহায়ক।
অপুষ্টির সমস্যা সমাধানে সবজি গ্রহণ খুবই কার্যকর। এর জন্য চাই নিরাপদ সবজি। উৎপাদন ব্যবস্থায় বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার সীমিত মাত্রার মধ্যে রাখতে হবে। সবজির জৈব চাষকে উৎসাহিত করতে হবে। সবজির ফুডভ্যালু চেইনকে সংক্রামক জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে। সবজি ধোয়ার ক্ষেত্রে দূষিত পানির ব্যবহার পরিহার করতে হবে। কোল্ডস্টোরেজ এবং ‘শীতল চেইন পরিবহনের সুবিধা’ বৃদ্ধি করে উৎপাদনকারী থেকে ভোক্তা পর্যন্ত নিরাপদ সবজি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। খাদ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকল্পে সবজির প্রাক-উৎপাদন, উৎপাদনকাল এবং ফসল কর্তনোত্তর প্রক্রিয়াজাতকরণে উত্তম কৃষি কার্যক্রম (গুড এগ্রিকালচারাল প্রাকটিসেস, জিএসপি) অনুশীলন করতে হবে। ভোক্তাদের জন্য মানসম্পন্ন সবজি সরবরাহ করতে উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিবেশ উন্নত করতে হবে। তাতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতসহ উপাদেয় সবজি গ্রহণ সম্ভব হবে; দূর হবে আমাদের পুষ্টি সমস্যা।
ড. জাহাঙ্গীর আলম : কৃষি অর্থনীতিবিদ
