বায়ুদূষণ ও করোনাভাইরাস
jugantor
বায়ুদূষণ ও করোনাভাইরাস

  ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম  

০৯ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯ মানুষের মৌলিক চাহিদার ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়ায় সমগ্র পৃথিবীতে মানবজাতির মধ্যে অস্থিরতা দিন দিন বেড়েই চলছে। এ প্রাণঘাতী করোনার মহামারীর সময় দূষণমুক্ত পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। মানবজাতির বেঁচে থাকার জন্য সহনীয় মাত্রায় বায়ুমণ্ডলীয় উপাদানের প্রয়োজন।

যদিও বায়ুদূষণ গোটা বিশ্বে অনাকাক্সিক্ষত হারে বেড়েই চলছে, যা টিকসই জীবনযাপনের জন্য হুমকি। বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নক্স (ঘঙঢ), সক্স (ঝঙঢ), ম্যাটালস, ওজোন ও নিষ্ক্রিয় গ্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের পার্টিকুলেটস ম্যাটারস (পিএম) রয়েছে।

নক্স বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সক্স সালফার অক্সাইড উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। পার্টিকুলেটস ম্যাটারস কঠিন ও তরল ড্রপলেট আকারে বায়ুমণ্ডলে বিরাজমান। বায়ুমণ্ডলে পার্টিকুলেটস, নক্স ও সক্সসহ অনেক উপাদান রয়েছে, যা সহনীয় মাত্রার বেশি হলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক পাওয়ার প্ল্যান্ট বায়ুমণ্ডলে নক্সের প্রধান উৎস।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অটোমোবাইল ও অন্যান্য মোবাইল জাতীয় উৎস থেকে নাইট্রোজেন জাতীয় উপাদানের ৫০ শতাংশ বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয়। বৈদ্যুতিক পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ২০ শতাংশ ও অন্যান্য উৎস হতে বাকি ৩০ শতাংশ নিঃসৃত হয়।

বৈদ্যুতিক প্ল্যান্টে ফসিল ফুয়েল কম্বাসন, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ও কলকারখানা থেকে প্রতিনিয়ত সক্স পরিবেশে নিঃসৃত হচ্ছে, যা মানুষের সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। নক্স ও সক্স উভয় উপাদান বায়ুমণ্ডলে পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে এসিড বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়, যা মানুষসহ অন্যান্য জীবের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

অন্যদিকে পার্টিকুলেটস ম্যাটারস পিএম ২ দশমিক ৫ ও পিএম ১০ উভয় উপাদান বায়ুমণ্ডলে কঠিন ও তরল ড্রপলেট আকারে থাকতে পারে। পিএম ২ দশমিক ৫ এর ডায়ামিটার সাধারণত ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার এবং পিএম ১০ এর ডায়ামিটার ১০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

প্রতিনিয়ত রোড ডাস্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, ফসিল ফুয়েল কম্বাসন, ইট তৈরির কারখানা ও অগ্নিকাণ্ড লাগামহীনভাবে বায়ুমণ্ডলে পার্টিকুলেটস ম্যাটারস নিঃসৃত করে। বায়ুতে এসব ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতিতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায়।

বায়ুদূষণে মানুষের রেসপিরেটরি ট্র্যাক্টে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়। মোটা দাগে বলা যেতে পারে, লাগামহীন বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ শ্বাসকষ্টে ভোগে। অন্যদিকে সার্সকোভিড-২ ভাইরাসের আক্রমণে সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগেও মানুষ শ্বাসকষ্টের সম্মুখীন হয়।

বায়ুদূষণ ও কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাবে মানুষের শরীরে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। যেহেতু উভয়ক্ষেত্রে মানুষ শ্বাসকষ্টের সম্মুখীন হয়, সেহেতু বায়ুদূষণ কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

সেজন্য বায়ুদূষণের সঙ্গে কোভিড-১৯ রোগের সংযোগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। ফলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ করোনার প্রাদুর্ভাব হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যদি দীর্ঘদিন করোনার প্রাদুর্ভাব গোটা বিশ্বে আতঙ্ক হিসেবে থাকে, তাহলে বায়ুদূষণ কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ফুসফুসকে সবল ও স্বাস্থ্যবান রাখা সম্ভব হবে।

গবেষণায় দেখা যায়, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড দীর্ঘদিন পরিবেশে থাকতে পারে। ফলে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন- হাইপার টেনশন, ডায়াবেটিস ও কার্ডিওভাস্কুলার রোগ, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যায়, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানির যেসব এলাকায় বেশি, সেসব এলাকায় কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। বায়ু থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশকৃত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ফুসফুসের ইপিথেলিয়াল সেল নষ্ট করে দেয়।

ফলে ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় মানুষের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। এমতাবস্থায় যদি ওই এলাকার মানুষ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়, তাহলে আক্রান্ত ও ফাটালিটির হার লাগামহীনভাবে বেড়ে যাবে। আবার বায়ুতে সালফার ডাই-অক্সাইড শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করায় ফুসফুসের কার্যকারিতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর ঋণাত্মক প্রভাব সৃষ্টি করে।

বায়ুতে পার্টিকুলেটস ম্যাটারসের ডায়ামিটার ২ দশমিক ৫ থেকে ১০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। মানুষের মাথার চুলের ডায়ামিটার ১০০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা খালি চোখে দেখা যায়। কিন্তু বায়ুতে বিরাজমান পার্টিকুলেটস ম্যাটারসের ডায়া খুবই ছোট হওয়ায় ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ ছাড়া খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের যেসব দেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, সেসব দেশের বায়ুতে পার্টিকুলেটস ম্যাটারসের পরিমাণ সহনীয় মাত্রার (২৫ থেকে ৪৯ মাইক্রোগ্রাম/ কিউবিক মিটার) চেয়ে অনেক বেশি। এতে প্রমাণিত হয়, বায়ুদূষণ করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার রেকর্ডকৃত ঢাকা শহরের বায়ুতে ২০১৯ সালে প্রতি কিউবিক মিটারে ৮৩ দশমিক ৩ মাইক্রোগ্রাম পার্টিকুলেটস ম্যাটারস (পিএম ২ দশমিক ৫) পাওয়া যায়। কিন্তু মানুষের জন্য সহনীয় মাত্রা প্রতি কিউবিক মিটারে ২৫-৪৯ মাইক্রোগ্রাম।

৪৮ ঘণ্টায় ঢাকা শহরে রেকর্ডকৃত পার্টিকুলেটস ম্যাটারস (পিএম ২ দশমিক ৫) ৬৩ মাইক্রোগ্রাম (২ জুলাই ২০২০), যা ২০১৯ সালে রেকর্ডকৃত পিএম ২ দশমিক ৫ এর তুলনায় ২০ শতাংশ কম। করোনার প্রভাবে মানুষ কর্তৃক পরিবেশের ওপর চাপ কমে যাওয়ায় ২০২০ সালে বায়ুতে বিরাজমান ক্ষতিকর উপাদান অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।

এতে খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছি না, কারণ কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ও পিএম ২ দশমিক ৫ এর মাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে প্রায় দুইগুণ বেশি। আবার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকালের তুলনায় শীতকালে পার্টিকুলেটস ম্যাটারস বায়ুতে বেশি পাওয়া যায়।

অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নক্সের সহনীয় মাত্রা প্রতি কিউবিক মিটারে ১০০ মাইক্রোগ্রাম। সক্সের সহনীয় মাত্রাও প্রতি কিউবিক মিটারে বায়ুতে ৮০ মাইক্রোগ্রাম পর্র্যন্ত থাকতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকা শহরে নক্স ও সক্স এর ঘনত্ব সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি, যা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণসহ কোভিড-১৯ রোগ ব্যবস্থাপনার পরিপন্থী।

বাংলাদেশে ঢাকা শহরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক বেশি। দেখা যাচ্ছে আক্রান্তের অনুপাতে ঢাকা শহরে রেড জোনের সংখ্যাও বেশি।

বিশ্বের বড় শহরগুলোর বায়ুদূষণের তুলনায় ঢাকা ১৭তম। যদিও কোভিড-১৯ এ বায়ুদূষণ সাময়িক কিছুটা কম; কিন্তু তাও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পরিবেশবিদদের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুতে অবস্থানরত পিএম ২ দশমিক ৫, ১০, নক্স, সক্সসহ ক্ষতিকর উপাদানসমূহ কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব লাগামহীনভাবে বাড়িয়ে দেয়।

বায়ুদূষণে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এ তথ্য থেকে যে, করোনাভাইরাসে ২১-৪১ বছর বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ অন্য বয়সের মানুষের তুলনায় এ বয়সের মানুষ কাজের প্রয়োজনে অনেক বেশি বাহিরমুখী।

ফলে এ বয়সের মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি বায়ুদূষণ ও বৈশ্বিক করোনা মহামারীর শিকার হচ্ছেন। বায়ুদূষণ আইন অনুযায়ী, উদ্যোক্তা ‘এনভাইরনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট’ এর সনদ ছাড়া শিল্পকারখানা স্থাপন করতে পারে না। যানবাহনের ক্ষেত্রে ফিটনেসের ইস্যুসহ অন্যান্য কলকারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রেও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুসরণ না করলে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

যা হোক, কোভিড-১৯ বায়ুদূষণ আইনের বাস্তব প্রয়োগের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে যাচ্ছে, যা কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়াতে সাহায্য করছে।

এমতাবস্থায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও ফিটনেসযুক্ত যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করে বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। যদিও বিষয়টি মানবজাতির জন্য নৈতিকতার, তবুও বাস্তবে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

আইনের বাস্তব প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বায়ুদূষণ কমানোর বিষয়ে মানুষের সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব- দুটি বিষয়ই যেন ফুলের মালার মতো একসূত্রে গাঁথা। পরিবেশের সঠিক সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণই বায়ুদূষণ কমিয়ে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত মানুষের মধ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সহযোগী অধ্যাপক, এনভাইরনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

বায়ুদূষণ ও করোনাভাইরাস

 ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম 
০৯ জুলাই ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯ মানুষের মৌলিক চাহিদার ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়ায় সমগ্র পৃথিবীতে মানবজাতির মধ্যে অস্থিরতা দিন দিন বেড়েই চলছে। এ প্রাণঘাতী করোনার মহামারীর সময় দূষণমুক্ত পরিবেশের গুরুত্ব অপরিসীম। মানবজাতির বেঁচে থাকার জন্য সহনীয় মাত্রায় বায়ুমণ্ডলীয় উপাদানের প্রয়োজন।

যদিও বায়ুদূষণ গোটা বিশ্বে অনাকাক্সিক্ষত হারে বেড়েই চলছে, যা টিকসই জীবনযাপনের জন্য হুমকি। বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইড, নক্স (ঘঙঢ), সক্স (ঝঙঢ), ম্যাটালস, ওজোন ও নিষ্ক্রিয় গ্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের পার্টিকুলেটস ম্যাটারস (পিএম) রয়েছে।

নক্স বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন অক্সাইড ও সক্স সালফার অক্সাইড উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। পার্টিকুলেটস ম্যাটারস কঠিন ও তরল ড্রপলেট আকারে বায়ুমণ্ডলে বিরাজমান। বায়ুমণ্ডলে পার্টিকুলেটস, নক্স ও সক্সসহ অনেক উপাদান রয়েছে, যা সহনীয় মাত্রার বেশি হলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক পাওয়ার প্ল্যান্ট বায়ুমণ্ডলে নক্সের প্রধান উৎস।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অটোমোবাইল ও অন্যান্য মোবাইল জাতীয় উৎস থেকে নাইট্রোজেন জাতীয় উপাদানের ৫০ শতাংশ বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত হয়। বৈদ্যুতিক পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে ২০ শতাংশ ও অন্যান্য উৎস হতে বাকি ৩০ শতাংশ নিঃসৃত হয়।

বৈদ্যুতিক প্ল্যান্টে ফসিল ফুয়েল কম্বাসন, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ও কলকারখানা থেকে প্রতিনিয়ত সক্স পরিবেশে নিঃসৃত হচ্ছে, যা মানুষের সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। নক্স ও সক্স উভয় উপাদান বায়ুমণ্ডলে পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে এসিড বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়, যা মানুষসহ অন্যান্য জীবের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

অন্যদিকে পার্টিকুলেটস ম্যাটারস পিএম ২ দশমিক ৫ ও পিএম ১০ উভয় উপাদান বায়ুমণ্ডলে কঠিন ও তরল ড্রপলেট আকারে থাকতে পারে। পিএম ২ দশমিক ৫ এর ডায়ামিটার সাধারণত ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার এবং পিএম ১০ এর ডায়ামিটার ১০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।

প্রতিনিয়ত রোড ডাস্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, ফসিল ফুয়েল কম্বাসন, ইট তৈরির কারখানা ও অগ্নিকাণ্ড লাগামহীনভাবে বায়ুমণ্ডলে পার্টিকুলেটস ম্যাটারস নিঃসৃত করে। বায়ুতে এসব ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতিতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায়।

বায়ুদূষণে মানুষের রেসপিরেটরি ট্র্যাক্টে মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি হয়। মোটা দাগে বলা যেতে পারে, লাগামহীন বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় মানুষ শ্বাসকষ্টে ভোগে। অন্যদিকে সার্সকোভিড-২ ভাইরাসের আক্রমণে সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগেও মানুষ শ্বাসকষ্টের সম্মুখীন হয়।

বায়ুদূষণ ও কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাবে মানুষের শরীরে একই ধরনের লক্ষণ দেখা যায়। যেহেতু উভয়ক্ষেত্রে মানুষ শ্বাসকষ্টের সম্মুখীন হয়, সেহেতু বায়ুদূষণ কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

সেজন্য বায়ুদূষণের সঙ্গে কোভিড-১৯ রোগের সংযোগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। ফলে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিসহ করোনার প্রাদুর্ভাব হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

যদি দীর্ঘদিন করোনার প্রাদুর্ভাব গোটা বিশ্বে আতঙ্ক হিসেবে থাকে, তাহলে বায়ুদূষণ কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ফুসফুসকে সবল ও স্বাস্থ্যবান রাখা সম্ভব হবে।

গবেষণায় দেখা যায়, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড দীর্ঘদিন পরিবেশে থাকতে পারে। ফলে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন- হাইপার টেনশন, ডায়াবেটিস ও কার্ডিওভাস্কুলার রোগ, এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যায়, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানির যেসব এলাকায় বেশি, সেসব এলাকায় কোভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাও বেশি। বায়ু থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশকৃত নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ফুসফুসের ইপিথেলিয়াল সেল নষ্ট করে দেয়।

ফলে ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় মানুষের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। এমতাবস্থায় যদি ওই এলাকার মানুষ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়, তাহলে আক্রান্ত ও ফাটালিটির হার লাগামহীনভাবে বেড়ে যাবে। আবার বায়ুতে সালফার ডাই-অক্সাইড শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করায় ফুসফুসের কার্যকারিতা ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর ঋণাত্মক প্রভাব সৃষ্টি করে।

বায়ুতে পার্টিকুলেটস ম্যাটারসের ডায়ামিটার ২ দশমিক ৫ থেকে ১০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। মানুষের মাথার চুলের ডায়ামিটার ১০০ মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে, যা খালি চোখে দেখা যায়। কিন্তু বায়ুতে বিরাজমান পার্টিকুলেটস ম্যাটারসের ডায়া খুবই ছোট হওয়ায় ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ ছাড়া খালি চোখে দেখা সম্ভব নয়।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের যেসব দেশে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, সেসব দেশের বায়ুতে পার্টিকুলেটস ম্যাটারসের পরিমাণ সহনীয় মাত্রার (২৫ থেকে ৪৯ মাইক্রোগ্রাম/ কিউবিক মিটার) চেয়ে অনেক বেশি। এতে প্রমাণিত হয়, বায়ুদূষণ করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার রেকর্ডকৃত ঢাকা শহরের বায়ুতে ২০১৯ সালে প্রতি কিউবিক মিটারে ৮৩ দশমিক ৩ মাইক্রোগ্রাম পার্টিকুলেটস ম্যাটারস (পিএম ২ দশমিক ৫) পাওয়া যায়। কিন্তু মানুষের জন্য সহনীয় মাত্রা প্রতি কিউবিক মিটারে ২৫-৪৯ মাইক্রোগ্রাম।

৪৮ ঘণ্টায় ঢাকা শহরে রেকর্ডকৃত পার্টিকুলেটস ম্যাটারস (পিএম ২ দশমিক ৫) ৬৩ মাইক্রোগ্রাম (২ জুলাই ২০২০), যা ২০১৯ সালে রেকর্ডকৃত পিএম ২ দশমিক ৫ এর তুলনায় ২০ শতাংশ কম। করোনার প্রভাবে মানুষ কর্তৃক পরিবেশের ওপর চাপ কমে যাওয়ায় ২০২০ সালে বায়ুতে বিরাজমান ক্ষতিকর উপাদান অনেকটা হ্রাস পেয়েছে।

এতে খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছি না, কারণ কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ও পিএম ২ দশমিক ৫ এর মাত্রা সহনীয় মাত্রার চেয়ে প্রায় দুইগুণ বেশি। আবার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বর্ষাকালের তুলনায় শীতকালে পার্টিকুলেটস ম্যাটারস বায়ুতে বেশি পাওয়া যায়।

অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নক্সের সহনীয় মাত্রা প্রতি কিউবিক মিটারে ১০০ মাইক্রোগ্রাম। সক্সের সহনীয় মাত্রাও প্রতি কিউবিক মিটারে বায়ুতে ৮০ মাইক্রোগ্রাম পর্র্যন্ত থাকতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, ঢাকা শহরে নক্স ও সক্স এর ঘনত্ব সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি, যা স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণসহ কোভিড-১৯ রোগ ব্যবস্থাপনার পরিপন্থী।

বাংলাদেশে ঢাকা শহরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য এলাকার তুলনায় অনেক বেশি। দেখা যাচ্ছে আক্রান্তের অনুপাতে ঢাকা শহরে রেড জোনের সংখ্যাও বেশি।

বিশ্বের বড় শহরগুলোর বায়ুদূষণের তুলনায় ঢাকা ১৭তম। যদিও কোভিড-১৯ এ বায়ুদূষণ সাময়িক কিছুটা কম; কিন্তু তাও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পরিবেশবিদদের তথ্য অনুযায়ী, বায়ুতে অবস্থানরত পিএম ২ দশমিক ৫, ১০, নক্স, সক্সসহ ক্ষতিকর উপাদানসমূহ কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব লাগামহীনভাবে বাড়িয়ে দেয়।

বায়ুদূষণে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় এ তথ্য থেকে যে, করোনাভাইরাসে ২১-৪১ বছর বয়সের মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। কারণ অন্য বয়সের মানুষের তুলনায় এ বয়সের মানুষ কাজের প্রয়োজনে অনেক বেশি বাহিরমুখী।

ফলে এ বয়সের মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি বায়ুদূষণ ও বৈশ্বিক করোনা মহামারীর শিকার হচ্ছেন। বায়ুদূষণ আইন অনুযায়ী, উদ্যোক্তা ‘এনভাইরনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট এসেসমেন্ট’ এর সনদ ছাড়া শিল্পকারখানা স্থাপন করতে পারে না। যানবাহনের ক্ষেত্রে ফিটনেসের ইস্যুসহ অন্যান্য কলকারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রেও পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুসরণ না করলে শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

যা হোক, কোভিড-১৯ বায়ুদূষণ আইনের বাস্তব প্রয়োগের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়িয়ে যাচ্ছে, যা কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাব অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়াতে সাহায্য করছে।

এমতাবস্থায় পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, পরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও ফিটনেসযুক্ত যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করে বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি। যদিও বিষয়টি মানবজাতির জন্য নৈতিকতার, তবুও বাস্তবে সচেতনতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে।

আইনের বাস্তব প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বায়ুদূষণ কমানোর বিষয়ে মানুষের সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব, অন্যদিকে পরিবেশের ওপর বায়ুদূষণের প্রভাব- দুটি বিষয়ই যেন ফুলের মালার মতো একসূত্রে গাঁথা। পরিবেশের সঠিক সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণই বায়ুদূষণ কমিয়ে কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত মানুষের মধ্যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারে।

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম : সহযোগী অধ্যাপক, এনভাইরনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

[email protected]

 

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

২৪ নভেম্বর, ২০২০