Logo
Logo
×

Advertisement

আনন্দ নগর

কোথায় হারালো ঢাকাই সিনেমার সেই কালজয়ী সংলাপ?

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কোথায় হারালো ঢাকাই সিনেমার সেই কালজয়ী সংলাপ?

Advertisement

‘আম্মাজান, আমি কি তোমারে কষ্ট দিছি?’- চিত্রনায়ক মান্নার কণ্ঠে ‘আম্মাজান’ সিনেমার একটি সংলাপ। আড়াই দশক আগের সিনেমা হলেও আজো এটি মানুষের স্মৃতিতে অম্লান। শুধু এটিই নয়, বাংলাদেশের সিনেমায় এমন বহু সংলাপ রয়েছে, যা প্রজন্ম পেরিয়ে এখনো মানুষের মুখে মুখে ঘোরে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ের দর্শকপ্রিয় অনেক সিনেমাও তেমন কোনো সংলাপ উপহার দিতে পারেনি, যা জনজীবনের ভাষার অংশ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের সিনেমার স্বর্ণসময় হিসাবে বিবেচিত আশি ও নব্বইয়ের দশকে সংলাপ ছিল একটি সিনেমার অন্যতম আকর্ষণ। ওই সময় অসংখ্য সিনেমার সংলাপ দর্শকের আবেগ, হাসি কিংবা প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল। শুধু তাই নয়, একটি সংলাপ সিনেমার সাফল্যের প্রতীকও হয়ে উঠেছিল কখনো কখনো। এই যেমন, ‘মা গো, আমি ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছি!’- জহির রায়হানের কালজয়ী সিনেমা ‘জীবন থেকে নেয়া’র এ সংলাপটি সাফল্যের প্রতীক হিসাবে আজও ব্যবহৃত হয়। ‘এই জানোয়ারটা একটা পোকা’-খান আতাউর রহমানের ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমার তীব্র ও বাস্তবধর্মী একটি সংলাপ। ‘টাকা দিয়ে কি সব কিছু কেনা যায়, চৌধুরী সাহেব?’-সামাজিক ও রোমান্টিক ঘরানার সিনেমায় ধনী-গরিবের বৈষম্য বোঝাতে এরকম সংলাপ বহুবার ব্যবহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে এসব সংলাপ বেশি শোনা যেত প্রয়াত অভিনেতা রাজীবের কণ্ঠেই। যেমন, একটি সিনেমায় কোনো কাজ কর্মে বা কারও ওপর বিরক্ত হলেই বলতে শোনা যায়, ‘শান্তি নাইরে শান্তি নাই, কবরে গিয়াও শান্তি নাই’। এই সংলাপটি আবুল খায়ের বুলবুল পরিচালিত ‘মীরজাফর’ সিনেমার। সেই সংলাপ লুফে নিয়েছিল দর্শক। এছাড়া রাজীব অভিনীত ‘দাঙ্গা’ সিনেমায় ‘আমি মাইন্ড করলাম’, ‘বিক্ষোভ’ সিনেমায় ‘রাজনীতিতে একটা কথা আছে’, ‘আসামী গ্রেফতার’ সিনেমায় ‘আমার চেহারা মাপ আমি আরজুর বাপ’, ‘বিদ্রোহী সন্তান’ সিনেমায় ‘আমি এল এল বি লাইফ লং ব্যাচেলর’, ‘লক্ষীর সংসার’ সিনেমায় ‘আগুন নিয়ে খেলতে আমি ভালোবাসি’, ‘খলনায়ক’-এ ‘আপনি পচা’, ‘ত্রাস’ সিনেমায় ‘কী আশচাইযো’, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ সিনেমায় কপিলা চরিত্রের কণ্ঠে ‘আমারে নিবা মাঝি লগে?’, মান্নার কণ্ঠে ‘মাথা নষ্ট’ সিনেমায় ‘আমার মাথা নষ্ট! মনে বড় কষ্ট!’, ‘তেজী’ সিনেমায় ডিপজলের কণ্ঠে ‘সানডে মানডে ক্লোজ কইরা দিমু’- এ সংলাপগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে। সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আম্মাজান’-এর মাকে ঘিরে মান্নার আবেগময় সংলাপটি আজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, নাট্যচর্চা ও সাধারণ মানুষের কথোপকথনে উদ্ধৃত হয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে সিনেমা থেকে যেন হারিয়ে গেছে মনে রাখার মতো সংলাপ। সিনেমা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শক্তিশালী গল্প, সাহিত্যসমৃদ্ধ সংলাপ এবং স্মরণীয় চরিত্রের অভাবই এর প্রধান কারণ।

গবেষকদের মতে, তখনকার সংলাপ জনপ্রিয় হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে ‘ভাইরাল’ হওয়ার জন্য নয়; বরং গল্প ও চরিত্রের স্বাভাবিক প্রবাহে। দর্শক চরিত্রের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পেতেন বলেই সংলাপগুলোও ব্যক্তিগত অনুভূতির অংশ হয়ে উঠেছিল। সিনেমা গবেষক অনুপম হায়াৎ বলেন, ‘একটি সংলাপ তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন সেটি একটি শক্তিশালী গল্পের ভেতর থেকে আসে। এখন মৌলিক গল্প, সাহিত্যনির্ভর চিত্রনাট্য এবং সংলাপ রচনার প্রতি আগের মতো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ফলে স্মরণীয় সংলাপও তৈরি হচ্ছে না।’

প্রখ্যাত নির্মাতা মতিন রহমান মনে করেন, দর্শকের সঙ্গে সিনেমার আবেগীয় সম্পর্কও আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। তিনি, ‘শুধু একটি সংলাপ লিখে সেটিকে জনপ্রিয় করা যায় না। সংলাপকে ধারণ করার মতো চরিত্র ও গল্প থাকতে হয়। এখন সেই জায়গাতেই ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।’

সিনেমার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একসময় নির্মাতা ও সংলাপ রচয়িতাদের অনেকেই সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জহির রায়হান, আমজাদ হোসেন, হুমায়ূন আহমেদসহ একাধিক নির্মাতা সংলাপকে কেবল তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসাবে নয়, চরিত্র নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে ব্যবহার করতেন। ফলে তাদের সিনেমার সংলাপে যেমন ছিল কাব্যিকতা, তেমনি ছিল সমাজবাস্তবতার প্রতিফলন। বর্তমান সময়ে সিনেমা নির্মাণে প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্যামেরার ভাষা ও সম্পাদনার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হলেও সংলাপের গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রভাবে সংলাপ এখন আরও সংক্ষিপ্ত ও বাস্তবধর্মী। এতে সিনেমার গতি বেড়েছে, কিন্তু উদ্ধৃতিযোগ্য সংলাপের সংখ্যা কমেছে।

এ ছাড়া বর্তমানে দর্শকের বিনোদন গ্রহণের ধরনও বদলে গেছে। আগে একটি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মাসের পর মাস চলত। একই সিনেমা অনেকে একাধিকবার দেখতেন। ফলে সংলাপ সহজেই মানুষের মুখে ছড়িয়ে পড়ত। এখন প্রেক্ষাগৃহে একটি সিনেমার প্রদর্শনকাল তুলনামূলকভাবে কম। পাশাপাশি ওটিটি, ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিপুল কনটেন্টের ভিড়ে একটি সংলাপ দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকার সুযোগও কমে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘পরাণ’, ‘হাওয়া’, ‘প্রিয়তমা’সহ কয়েকটি সিনেমা বাণিজ্যিক ও সমালোচনামূলক সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু এসব সিনেমার সংলাপ আগের প্রজন্মের মতো জনজীবনের ভাষায় স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারেনি। গবেষকদের মতে, বর্তমান দর্শক সংলাপের চেয়ে চরিত্রের অভিনয়, দৃশ্য নির্মাণ এবং সামগ্রিক সিনেমাটিক অভিজ্ঞতার প্রতি বেশি মনোযোগী। সিনেমা-সংশ্লিষ্টদের অভিমত, কালজয়ী সংলাপ আলাদা করে লেখা যায় না। এটি জন্ম নেয় একটি পূর্ণাঙ্গ সিনেমার ভেতর থেকে। যখন গল্প, চরিত্র, অভিনয় এবং সংলাপ একে অন্যকে সমৃদ্ধ করে, তখনই একটি বাক্য সময়ের সীমানা অতিক্রম করে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে।

বাংলাদেশের সিনেমা এখন নতুন প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণ এবং বৈশ্বিক বাজারের দিকে এগোলেও স্মরণীয় সংলাপ তৈরির সেই ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে হলে মৌলিক গল্প, শক্তিশালী চিত্রনাট্য এবং ভাষার নান্দনিক ব্যবহারে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে-এমনটাই মনে করছেন সিনেমা গবেষক ও নির্মাতারা। তাদের বিশ্বাস, দর্শকের জীবন, সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করতে পারলে আবারও এমন সংলাপ জন্ম নেবে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকবে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

১০ বডিগার্ড নিয়ে আদালতে পরীমনি

১০ বডিগার্ড নিয়ে আদালতে পরীমনি

এক নায়কে ডুবছে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি

এক নায়কে ডুবছে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি

ডিভোর্স নিয়ে এখনো আলোচনায় শবনম ফারিয়া

ডিভোর্স নিয়ে এখনো আলোচনায় শবনম ফারিয়া

ভিন্ন অ্যাকশন অবতারে এনটিআর ও প্রভাস

ভিন্ন অ্যাকশন অবতারে এনটিআর ও প্রভাস

এক শর্তে জ্যাক স্প্যারো হয়ে ফিরতে রাজি জনি ডেপ

এক শর্তে জ্যাক স্প্যারো হয়ে ফিরতে রাজি জনি ডেপ

পপিকে নিয়ে মিল্টন খন্দকারের স্মৃতিচারণ

পপিকে নিয়ে মিল্টন খন্দকারের স্মৃতিচারণ

আরও পড়ুন

এক নায়কে ডুবছে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি

এক নায়কে ডুবছে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি

ডিভোর্স নিয়ে এখনো আলোচনায় শবনম ফারিয়া

ডিভোর্স নিয়ে এখনো আলোচনায় শবনম ফারিয়া

ভিন্ন অ্যাকশন অবতারে এনটিআর ও প্রভাস

ভিন্ন অ্যাকশন অবতারে এনটিআর ও প্রভাস

এক শর্তে জ্যাক স্প্যারো হয়ে ফিরতে রাজি জনি ডেপ

এক শর্তে জ্যাক স্প্যারো হয়ে ফিরতে রাজি জনি ডেপ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম