শুটিং নেই তবু ক্যামেরা ওপেন
তারকাদের ভিন্ন ঠিকানা ইউটিউব
আনন্দনগর প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সাকরাইন উৎসবে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে মেহজাবীন চৌধুরীর আপলোড করা ভিডিওর একটি দৃশ্য।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নাটক-সিনেমায় কাজের অনিশ্চয়তা। কখনো দীর্ঘবিরতি, কখনো পছন্দসই চরিত্রের অভাব। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের একদল তারকা নিজেদের ক্যামেরার সামনে রেখেই খুঁজে নিয়েছেন বিকল্প পথ-ইউটিউব, ভ্লগিং ও নানা ধরনের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি। কেউ করছেন ভ্রমণভিত্তিক ভ্লগ, কেউ খাবারের ভিডিও, কেউ ব্যক্তি জীবনের গল্প, আবার কেউ সাক্ষাৎকার কিংবা সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ভিডিও। অবসর কাটানোর পাশাপাশি কারও কারও জন্য এটি হয়ে উঠেছে আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
* কাজের ফাঁকে নিজের প্ল্যাটফর্ম
নাটক ও সিনেমার বাজারে যে আগের মতো নিয়মিত কাজ নেই, তা নিয়ে নির্মাতা-প্রযোজকদের নানা সময়ে কথা বলতে দেখা গেছে। চলতি বছরের শুরুতেও নির্মাতা ও প্রযোজকরা স্পনসর সংকট ও বাজেট ঘাটতির কারণে টেলিভিশন নাটক নির্মাণ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এ বাস্তবতায় তারকাদের একটি অংশ নির্ভর করছেন নিজেদের প্ল্যাটফর্মের ওপর। দেশি গণমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী শাকিব খান, মেহজাবীন চৌধুরী, সাফা কবির, মুমতাহিনা টয়া, হৃদয় খান, ইমরান মাহমুদুল ও কণা নিজেদের ইউটিউব চ্যানেল নিয়ে সক্রিয়। মেহজাবীনের ক্ষেত্রে ভ্রমণ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ভিডিও যেমন রয়েছে, তেমনি তিনি জানিয়েছেন, চ্যানেলটি তার কাজ ও জীবনের আর্কাইভ হিসাবেও থাকছে এবং সেখান থেকে আয়ও হচ্ছে। তবে তালিকাটি আরও দীর্ঘ। ইউটিউব ও সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় তারকাদের মধ্যে রয়েছেন মোশাররফ করিম, শাহরিয়ার নাজিম জয়, আদনান ফারুক হিল্লোল, অপু বিশ্বাস, পরীমণি, শবনম বুবলী, বিদ্যা সিনহা মিম, মাহিয়া মাহী, জয়া আহসান, সিয়াম আহমেদ, নিলয় আলমগীর, আফরান নিশো, তৌসিফ মাহবুব, ফারহান আহমেদ জোভান, মুশফিক আর ফারহান, সাবিলা নূর, পূর্ণিমা, দীঘি, নুসরাত ফারিয়া, তাহসান খান, হাবিব ওয়াহিদ, ন্যান্সি, ঐশী, আঁখি আলমগীর, কনকচাঁপা, পড়শী, তানিয়া আহমেদ, ভাবনা, রুনা খান, তানজিন তিশা, নওশাবা, মম, অনন্ত জলিল, বর্ষা নিরব, ইমনসহ আরও অনেকে।
অবশ্য এ তালিকায় থাকা সবাই যে ‘কাজ না থাকায়’ ইউটিউবিং করছেন, বিষয়টি এমন নয়। বরং মূলধারার অভিনয় বা গানের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে অনেকেই নিজেদের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় শাখা হিসাবে দেখছেন।
* মূল পেশা থেকে সরে গিয়ে ভগিং
এর ভালো উদাহরণ অভিনেতা আদনান ফারুক হিল্লোল। একসময় নাটক-সিনেমার ব্যস্ত অভিনেতা হিসাবে পরিচিত হিল্লোল এখন দীর্ঘদিন ধরেই খাবার ও ভ্রমণভিত্তিক কনটেন্ট করছেন। তার ‘ডাইন আউট উইথ আদনান’-এ দেশ-বিদেশের রেস্তোরাঁ, খাবার, দাম ও পরিবেশ উঠে আসে। ডিজিটাল কনটেন্টের চাহিদা বুঝেই তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি এ পথে আসেন।
আবার নির্মাতা মালেক আফসারী সিনেমা নির্মাণ থেকে অনেকটাই সরে এসে ইউটিউব ও ফেসবুককেন্দ্রিক কনটেন্টে মন দিয়েছেন। তার ভাষ্য, ইউটিউব থেকে তিনি সময় দেওয়ার বিনিময়ে সরাসরি আয় পাচ্ছেন। বছরদুয়েক আগে তিনি জানিয়েছিলেন, মাসে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা আয় হচ্ছিল তার ফেসবুক-ইউটিউব থেকে।
উপস্থাপক-অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয়ও ডিজিটাল মাধ্যমে বেশ পুরোনো খেলোয়াড়। আজ থেকে সাত বছর আগেও তার ইউটিউব আয় এক মাসে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত হয়েছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি ডিজিটাল কনটেন্ট ও উপস্থাপনাকে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছেন।
* কেন এই ঝোঁক
প্রথমত, নিজের দর্শক নিজের হাতে। টেলিভিশন বা সিনেমায় শিল্পীর কাজ দর্শকের কাছে পৌঁছাতে প্রযোজক, পরিচালক, চ্যানেল কিংবা পরিবেশকের ওপর নির্ভর করতে হয়। ইউটিউবে সেই মধ্যবর্তী স্তর অনেকটাই কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, আয়ের সুযোগ। ইউটিউবের বিজ্ঞাপন আয়, স্পনসরশিপ, ব্র্যান্ড সহযোগিতা ও পেইড কনটেন্ট-সব মিলিয়ে তারকারা নিজেদের জনপ্রিয়তাকে অর্থে রূপান্তর করতে পারেন। পরিচিত মুখ হওয়ার কারণে নতুন একজন ইউটিউবারের তুলনায় তারকারা দ্রুত দর্শক ও সাবস্ক্রাইবার পেতে পারেন।
তৃতীয়ত, নিজের আর্কাইভ। তারকাশিল্পীদের অভিনীত নাটক বা গান অনেক সময় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় চলে যায়। কিন্তু ব্যক্তিগত ভগে তারকা নিজের পছন্দের গল্প, ভ্রমণ, পরিবার, কাজের পেছনের অভিজ্ঞতা কিংবা ব্যক্তিগত ভাবনা সংরক্ষণ করতে পারেন। সংগীতশিল্পী কণাও জানিয়েছেন, নিজের চ্যানেলে পছন্দের গান রাখার স্বাধীনতাটি তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
* তবে ঝুঁকিও কম নয়
ইউটিউব মানেই সহজ আয়, এমন ধারণা বিপজ্জনক। কনটেন্ট তৈরি করতে ক্যামেরা, সম্পাদনা, স্ক্রিপ্ট, থাম্বনেইল, প্রচারণা-সবকিছুর পেছনে সময় ও অর্থ লাগে। সবচেয়ে বড় বিষয়, নিয়মিত মানসম্মত কনটেন্ট না দিলে দর্শক ধরে রাখা কঠিন। প্রসঙ্গক্রমে সামাজিক মাধ্যম বিশেষজ্ঞ সাইফ আহমাদ বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েশনে কেউ লাখ টাকা আয় করছেন, কেউ হাজার টাকা; কিন্তু মানসম্মত কনটেন্ট ছাড়া দীর্ঘদিন টিকে থাকা অসম্ভব।
আরও একটি সমস্যা হলো ভিউয়ের চাপ। তারকা যখন অভিনয়ের পরিবর্তে নিজের জীবনকেই কনটেন্ট বানাতে শুরু করেন, তখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সীমা ক্রমে সংকুচিত হতে পারে। শুধু আলোচনায় থাকার জন্য অতিরঞ্জিত বা পরিকল্পনাহীন ভিডিও তৈরি করলে তারকার ব্র্যান্ড-ইমেজও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
* বিকল্প নয়, নতুন ক্যারিয়ার
তারকাদের ইউটিউব যাত্রাকে তাই শুধু ‘নাটক-সিনেমায় কাজ নেই’ এই ব্যাখ্যায় দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এটি একইসঙ্গে কাজের অনিশ্চয়তার প্রতিক্রিয়া, নিজের ব্র্যান্ড নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং নতুন আয়ের বাজারে প্রবেশের কৌশল। একসময় তারকার পরিচয় নির্ধারিত হতো সিনেমার পোস্টার, টেলিভিশনের পর্দা কিংবা পত্রিকার পাতায়। এখন সেই তারকাই নিজের ক্যামেরা, নিজের চ্যানেল এবং নিজের দর্শক নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি ছোট্ট মিডিয়া প্রতিষ্ঠান। মূলধারার কাজ ফিরলে তারা আবার শুটিংয়ে যাবেন; কিন্তু ভ্লগিংয়ের ক্যামেরাটি সম্ভবত আর বন্ধ হবে না। কারণ এটি এখন নিছক অবসর কাটানোর জায়গা নয়, বাংলাদেশের তারকাশিল্পীদের জন্য ক্রমেই হয়ে উঠছে বিকল্প পেশা, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড এবং আয়ের নতুন জানালা।
