বলিউড বনাম দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা
কে কার প্রতিদ্বন্দ্বী
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় ভারতের মূলধারার সিনেমা বলতে চোখের সামনে ভেসে উঠত মুম্বাই। তারকা মানেই বলিউডের নায়ক-নায়িকা, বড় বাজেট মানেই হিন্দি ছবি, আর সারা দেশে ব্যবসার প্রশ্নে মুম্বাইয়ের তারকাদের দাপটই ছিল স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু সেই সমীকরণ বদলেছে। ‘বাহুবলী’, ‘কেজিএফ’, ‘আরআরআর’, ‘পুষ্পা’ কিংবা ‘কান্তারা’র মতো সিনেমা ভাষার সীমানা অতিক্রম করে সব ঘরানার দর্শকের ঘরে পৌঁছেছে। দক্ষিণের অভিনেতারাও এখন আর শুধু তামিল, তেলুগু, কন্নড় বা মালয়ালম দর্শকের তারকা নন; তাদের নিয়ে তৈরি হচ্ছে সর্বভারতীয় বাজার।
এই পরিবর্তনকে অবশ্য সরাসরি ‘বলিউড বনাম দক্ষিণ’ হিসাবে দেখতে নারাজ বলিউডের অন্যতম প্রভাবশালী নির্মাতা করণ জোহর। তিনি বলেছেন, দক্ষিণের সিনেমার সাফল্যকে বলিউডের প্রতিযোগিতা হিসাবে দেখা ভারতীয় সিনেমার বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকর; বরং বিভিন্ন ভাষার সিনেমা একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া উচিত। তার মতে-ভারতীয় সিনেমাকে উত্তর-দক্ষিণে ভাগ করা যায় না, সবাই মিলে তৈরি করছে ‘ইন্ডিয়ান সিনেমা’।
বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা শাহরুখ খানও দক্ষিণী সিনেমার শক্তিকে খাটো করেননি। তার মতে, দক্ষিণের সিনেমায় দুর্দান্ত গল্প বলার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষও রয়েছে। ‘জওয়ান’-এ দক্ষিণী পরিচালক অ্যাটলির সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়েও তিনি ইতিবাচক কথা বলেছেন। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, ভাষা আলাদা হলেও সিনেমার আবেগ ও গল্পের আবেদন সর্বজনীন।
তবে দর্শক ও বক্স অফিসের আচরণে পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। দক্ষিণের সিনেমার হিন্দি সংস্করণ একসময় ছিল বলিউডের অন্যতম নিরাপদ বাণিজ্যিক অস্ত্র। ২০০৮ সালের গজনি-সূরিয়ার তামিল সিনেমার হিন্দি রূপ-আমির খানকে নিয়ে বিশাল সাফল্য পায়। এরপর ওয়ান্টেড (পোক্কিরি), সিংহাম (সিংগাম), রাউডি রাঠোর (বিক্রমারকুডু), বডিগার্ড, দৃশ্যম, কবির সিং (অর্জুন রেড্ডি), সিম্বা (টেম্পার), বাঘি ২ (ক্ষণম)-একাধিক দক্ষিণী সিনেমার গল্প বলিউডে নতুন তারকা ও নতুন বাজার পেয়েছে।
এই তালিকা আসলে আরও দীর্ঘ। ‘ভুলভুলাইয়া’ এসেছে মালয়ালমের ‘মণিচিত্রাথাঝু’ থেকে, ‘রেহনা হ্যায় তেরে দিল মে’ তামিল ‘মিন্নালে’-র হিন্দি সংস্করণ, ‘সাথিয়া’ এসেছে ‘আলাইপায়ুথে’ থেকে। এমনকি বহু পুরোনো বলিউড সিনেমার সঙ্গেও দক্ষিণী সিনেমার সম্পর্ক রয়েছে। ‘শক্তি’, ‘রাম অউর শ্যাম’, ‘বম্বে টু গোয়া’, ‘মাসুম’, ‘আন্ধা কানুন’সহ একাধিক পরিচিত হিন্দি সিনেমা দক্ষিণী সিনেমা থেকে অনুপ্রাণিত বা পুনর্নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ দক্ষিণ থেকে বলিউডে গল্প যাওয়ার ইতিহাস নতুন নয়; নতুন হয়েছে তার ব্যাপ্তি ও দর্শকের সচেতনতা।
তবে এই রিমেকনির্ভর সম্পর্কের একটা সীমাও আছে। প্রযোজক বনি কাপুর বিক্রম ‘বেধা’ ও ‘জার্সি’র হিন্দি সংস্করণ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন যে, শুধু মূল সিনেমার গল্প অনুবাদ করলেই হয় না; স্থানীয় দর্শকের সাংস্কৃতিক আবহ ও ‘নেটিভিটি’ও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, এই সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে উত্তর ভারতীয় দর্শকের নিজস্ব আবহ যথেষ্টভাবে তৈরি হয়নি।
এ জায়গায়ই বদলে গেছে দক্ষিণী সিনেমার কৌশল। আগে দক্ষিণের সফল সিনেমা বলিউডে এসে নতুন তারকার শরীরে নতুন ভাষা পেত। এখন দক্ষিণের অনেক নির্মাতা সরাসরি সর্বভারতীয় দর্শককে মাথায় রেখে সিনেমা বানাচ্ছেন। ‘আরআরআর’, ‘কেজিএফ’ বা ‘পুষ্পা’কে আলাদা করে হিন্দি রিমেক করার প্রয়োজন হয়নি; মূল সিনেমাই হিন্দি বাজারে পৌঁছে গেছে। ফলে বলিউডের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কাঠামোটাও পালটেছে।
দক্ষিণের অভিনেতা নানি সম্প্রতি এই ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ তকমা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। তার যুক্তি, কোনো হিন্দি সিনেমা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফল হলে সেটিকে সাধারণত ‘হিন্দি সিনেমা’ বলা হয়, কিন্তু দক্ষিণের সিনেমা একইভাবে সফল হলেই ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ তকমা জুড়ে দেওয়া হয়। তার বক্তব্য মূলত সিনেমাকে ভাষাভিত্তিক পরিচয়ের বদলে ভারতীয় সিনেমার সামগ্রিক পরিসরে দেখার আহ্বান।
অভিনেতা সন্দীপ কিশনও মনে করেন, দক্ষিণী সিনেমার সঙ্গে বলিউডের সম্পর্ক মূলত সহযোগিতার। তিনি বলেন, বহু দশক ধরেই দুই অঞ্চলের অভিনেতা, পরিচালক ও প্রযোজকের মধ্যে আদান-প্রদান রয়েছে; সাম্প্রতিক সময়ে বদলেছে মূলত দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি। তার মতে, দক্ষিণের সিনেমা সম্পর্কে আগের ধারণা বদলে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো ডাবিং, স্ট্রিমিং ও সহজে সিনেমা দেখার সুযোগ বৃদ্ধি।
বলিউডের তারকারাও দক্ষিণের বাজারকে উপেক্ষা করতে পারছেন না। সালমান খান ২০২৫ সালে দক্ষিণী তারকাদের স্থানীয় দর্শকের সঙ্গে গভীর সংযোগের কথা তুলে ধরে বলেছিলেন, দক্ষিণের বাজারে হিন্দি সিনেমার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি জোর দিয়েছিলেন শক্তিশালী গল্পের প্রয়োজনীয়তার ওপর।
আর এখানেই হয়তো বর্তমান ভারতীয় সিনেমার আসল গল্প। একদিকে বলিউডের রয়েছে দীর্ঘদিনের সর্বভারতীয় তারকা-পরিচিতি, বিপুল হিন্দিভাষী বাজার ও শক্তিশালী প্রযোজনা কাঠামো। অন্যদিকে দক্ষিণী শিল্পগুলোর রয়েছে নিজস্ব তারকা-সংস্কৃতি, স্থানীয় গল্পের শক্তি, প্রযুক্তিনির্ভর নির্মাণ এবং এখন সর্বভারতীয় বাজারে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা। দুপক্ষই একে অপরের কাছ থেকে নিচ্ছে গল্প, শিল্পী, প্রযুক্তি ও বাজারের কৌশল।
তাই ‘বলিউড বনাম দক্ষিণ’ আসলে যতটা বক্স অফিসের লড়াই, তার চেয়ে বেশি দর্শকের মনোযোগের লড়াই। ‘গজনি’ থেকে ‘কবির সিং’-দক্ষিণের গল্প বলিউডকে বহুবার বাঁচিয়েছে। আবার ‘জওয়ান’, ‘পাঠান’ কিংবা অন্য হিন্দি সিনেমাও দেশের বিভিন্ন ভাষার দর্শকের কাছে পৌঁছে দেখিয়েছে, মুম্বাইয়ের বাজারও এখনো সর্বভারতীয় হতে পারে। পার্থক্য হলো, এখন কোনো একটি শিল্প একচেটিয়া ‘ভারতীয় সিনেমা’র প্রতিনিধি নয়।
সময়ের সঙ্গে তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংজ্ঞাটাও বদলেছে। আগে প্রশ্ন ছিল-বলিউড না দক্ষিণ? এখন প্রশ্নটা বরং-কার গল্প দর্শক ভাষার বাধা পেরিয়ে গ্রহণ করছে? কারণ শেষ পর্যন্ত পর্দায় ভাষা আলাদা হলেও দর্শকের চাহিদা একটাই-ভালো গল্প, বড় অভিজ্ঞতা এবং মনে থাকার মতো সিনেমা। সেই অর্থে বলিউড ও দক্ষিণী সিনেমা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী যেমন, তেমনি পরস্পরের সহযাত্রীও। আর এই আদান-প্রদানের মধ্যদিয়েই তৈরি হচ্ছে নতুন ভারতীয় সিনেমার মানচিত্র।

