ঠাকুরগাঁওয়ে নজিরবিহীন সিন্ডিকেট
গুদামে সারবোঝাই অর্ধশত ট্রাক আটকা, মাঠে হাহাকার
Advertisement
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কৃষি মন্ত্রণালয়ের অগ্রিম সার উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকলেও ঠাকুরগাঁওয়ে তা বাস্তবায়ন করেনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ফলে পীরগঞ্জ সড়কের মাদারগঞ্জ বিএডিসি সার গোডাউনের সামনে ৫৮টি সারবোঝাই ট্রাক খোলা আকাশের নিচে অলস পড়ে আছে। গুদামে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত মজুত এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সময়মতো ডিলারদের মাঝে সার বিতরণ না করায় এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে গোডাউন ও সড়কে ট্রাকের দীর্ঘ জট, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে চরম সার সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষক। এই প্রশাসনিক উদাসীনতার সুযোগ নিয়ে ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও কিছু অসাধু কর্মকর্তার সিন্ডিকেট, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৪ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে এক নির্দেশনায় অক্টোবর মাসের বরাদ্দকৃত সার ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই অগ্রিম উত্তোলনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দীর্ঘসূত্রতায় সেই সার যথাসময়ে উত্তোলন করা হয়নি।
ঠাকুরগাঁও বিএডিসি সার সহকারী পরিচালকের কার্যালয়ের উপসহকারী কর্মকর্তা আহাদ আলী জানান, গোডাউনের ধারণক্ষমতা ২ হাজার ১০০ টন। অথচ অক্টোবর মাসে বরাদ্দ এসেছে ৯ হাজার ৫৫৯ টন। এর বাইরেও আগের ৭ হাজার টন সার মজুত রয়েছে। ফলে গুদামে নতুন সার রাখার তিল পরিমাণ জায়গাও নেই। বণ্টন না হওয়ায় ডিলাররাও সার তুলতে পারছেন না। বিসিআইসির শিবগঞ্জ বাফার গুদামের সহকারী হিসাব কর্মকর্তা মজনু রহমান জানান, সাড়ে ৭ হাজার টন ধারণক্ষমতার গুদামে ৮ হাজার ৭৩৪ টন ইউরিয়াসহ অন্য সার মজুত রয়েছে এবং অক্টোবর মাসের নতুন বরাদ্দও এসে পৌঁছেছে।
এদিকে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভয়াবহ। সদর উপজেলার চিলারং ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার মেসার্স দবিরুল ইসলামের স্বত্বাধিকারী রাজিউর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, পরিবারে ৫ কেজি চালের জায়গায় ২ কেজি দিলে যেমন চলে না, তেমনি কৃষকের চাহিদার সিকিভাগ সার দিয়ে ঘাটতি পূরণ অসম্ভব। ডিলার পয়েন্ট না বাড়িয়ে বরাদ্দ না বাড়ালে এই সংকট কাটবে না।
নারগুন কহরপাড়া গ্রামের কৃষক মামুনুর রশীদ ও বেগুনবাড়ির মনসুর আলীর অভিযোগ, আমন ও শাকসবজির ভরা মৌসুমে এলাকায় সারের তীব্র কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। সরকারিভাবে টিএসপি ও ইউরিয়া সারের দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা নির্ধারিত থাকলেও তাদের কিনতে হচ্ছে যথাক্রমে ১ হাজার ৫৫০ ও ১ হাজার ৬শ টাকায়। বেগুনবাড়ির কৃষক ইউসুফ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ডিলাররা এনআইডি নিয়ে মেমো কেটে ৩০ বিঘা জমির জন্য মাত্র ১ বস্তা সার ধরিয়ে দিচ্ছেন। অথচ খোলাবাজারে সার নেই। কিছু অসাধু ডিলার ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার (বিএস) গোপন সিন্ডিকেট সাধারণ কৃষকদের বঞ্চিত করে খুচরা দোকানদারদের কাছে পাইকারি দরে সার পাচার করছে। সেই সার অতিরিক্ত দামে গোপনে বিক্রি করছে দোকানদাররা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্য সচিব মাজেদুল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাটি বাধ্যতামূলক ছিল না। অক্টোবর-নভেম্বর মাসের জন্য বরাদ্দটি নিরাপদ রাখতে চেয়েছিলাম এবং আগামী ৭ থেকে ৮ অক্টোবরের মধ্যে নিয়মিত বরাদ্দ ছাড় করা হবে। তিনি জানান, জেলায় ইউরিয়া, টিএসপি এবং এমওপি সারের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তবে ডিএপি সার চাহিদার চেয়ে কিছুটা বেশি পাওয়া গেছে।
কৃষকদের ভাষ্য, আমন ধানের এই শেষ সময়ে জমিতে সার প্রয়োগের মোক্ষম সময় পার হয়ে যাচ্ছে। মাঠের পর মাঠ ফসল যখন পুষ্টি সংকটে ধুঁকছে, তখন আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর সিন্ডিকেটের কারসাজিতে সারের এই কৃত্রিম সংকট কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে।
