কুমিল্লায় হুন্ডি রাসেলের রাজত্ব
মাসে অর্ধশত কোটি টাকা ভারতে পাচার
বিজিবির ওপর হামলা, অস্ত্র লুটের মামলার আসামি প্রকাশ্যে, পদক্ষেপ না নেওয়ায় বেপরোয়া
Advertisement
আবুল খায়ের, কুমিল্লা
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কুমিল্লা সীমান্তের নিশ্চিন্তপুর ও বড়জ্বালা এলাকাকে রুট হিসাবে ব্যবহার করে প্রতি মাসে অন্তত অর্ধশত কোটি টাকা ভারতে পাচারের অভিযোগ উঠেছে ‘হুন্ডি রাসেল সিন্ডিকেটের’ বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, সীমান্তের মাদক ও চোরাচালান ঘিরে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করছে চক্রটি। বিজিবির সদস্যকে মারধর ও সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মামলার আসামি হলেও রাসেল মিয়া প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাসেল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা নিশ্চিন্তপুর ও হানকিজলা এলাকার আবুল মিয়ার ছেলে রাসেল মিয়া কয়েক বছর ধরে সীমান্তে হুন্ডি ও চোরাচালানের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি, মাদক ব্যবসায়ী, স্বর্ণ চোরাকারবারি ও অবৈধ পণ্যের কারবারিদের আর্থিক লেনদেনে ব্যবহৃত হচ্ছে তার এ নেটওয়ার্ক। স্থানীয় সূত্র জানায়, নিশ্চিন্তপুর ও বড়জ্বালা সীমান্ত দিয়ে আসা মাদক ও চোরাচালানের পণ্যের মূল্য পরিশোধ করা হয় রাসেলের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। বাংলাদেশি কারবারিদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে ভারতীয় চক্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এভাবে প্রতিদিন গড়ে অন্তত দুই কোটি টাকা পাচার হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। তাদের হিসাবে, মাসে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় অর্ধশত কোটি টাকার বেশি। এ ধরনের অবৈধ লেনদেনে দেশের রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনীতিও ঝুঁকিতে পড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের দাবি, রাসেলের সঙ্গে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল কাজ করে। তার প্রধান সহযোগী হিসাবে শ্যালক আমির হোসেন, বড় ভাই মনির মিয়া ও চার্লি জাহিদ হাসানের নাম উল্লেখ করেছেন তারা। অভিযোগ রয়েছে, এ দলের সদস্যরা সীমান্ত পাহারা, টাকা সংগ্রহ এবং ভারতে অর্থ হস্তান্তরের কার্যক্রম তদারকি করেন। বিজিবি ও থানা পুলিশ সূত্র জানায়, ১২ সেপ্টেম্বর রাসেলের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ভারতীয় রুপি, চোরাই মোবাইল ফোন ও একটি ওয়াকিটকি জব্দ করা হয়। অভিযানের সময় রাসেলের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ ব্যক্তিরা বিজিবির টহল দলের ওপর হামলা চালান। এতে বিজিবির নায়েক সাইফুল ইসলাম গুরুতর আহত হন। একপর্যায়ে তার সরকারি অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে অস্ত্রটি উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় বিজিবি সদস্যকে মারধর ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। এর আগে সিন্ডিকেটের এক নারী সদস্যকে ২০ লাখ টাকাসহ আটক করে বিজিবি। নায়েক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হুন্ডি রাসেলের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে সে ও তার লোকজন আমার ওপর হামলা করে একটি অস্ত্র লুটে নেয়। এতে আমার মাথায় জখম হয়। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে।’ পরে তিনি অন্যত্র বদলি হয়েছেন বলেও জানান। স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও রাসেল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান তৎপরতা নেই। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের অর্থ পাচার ও চোরাচালান সীমান্তের নিরাপত্তা এবং দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। বড়জ্বালার বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, রাসেলের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারিরা ভারতে টাকা পাঠিয়ে মাদক ও চোরাই পণ্য সংগ্রহ করেন। নিশ্চিন্তপুরের বাসিন্দা ইয়াছিন আরাফাতের দাবি, রাসেলের কাছে টাকা পরিশোধ করলেই ভারত থেকে মাদক ও চোরাচালানের পণ্য আসে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে রাসেল মিয়া বলেন, ‘আমি মোবাইল ফোন ও অন্যান্য সামগ্রী আনি। আমি নিজের টাকা পাঠাই। হুন্ডি কারবার করি না।’ কুমিল্লা ডিবির ওসি মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ বলেন, ‘হুন্ডি রাসেল সিন্ডিকেটের তথ্য আমাদের কাছে নেই। আপনাদের মাধ্যমে বিষয়টি জেনেছি। খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, হুন্ডি রাসেলকে গ্রেফতারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিজিবি-৬০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এসএম শরীফুল ইসলাম বলেন, নির্দিষ্ট কোনো সিন্ডিকেট নয়, পুরো অপরাধীচক্রের বিরুদ্ধেই বিজিবির পদক্ষেপ রয়েছে। হুন্ডি ও মাদক চোরাচালানবিরোধী অভিযান চলমান রয়েছে।
