পাবনায় জোড়া খুন
টেন্ডার ছাড়াই ১৪ বছর ধরে পুষ্পপাড়া হাটের খাস আদায়
Advertisement
পাবনা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পাবনার জোড়া খুনের ঘটনায় সামনে আসছে পুষ্পপাড়া হাটের আধিপত্য নিয়ে নানা তথ্য। উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় গরুর হাটটি ১৪ বছর ধরে টেন্ডার ছাড়াই খাস আদায়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতেন নিহত আব্দুস সালাম। অভিযোগ রয়েছে, একটি সিন্ডিকেট ও মামলার কৌশল কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন হাটের ইজারার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন তিনি। এ হাটের বার্ষিক রাজস্ব আয় আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা হতে পারত বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। অথচ চলতি বাংলা ১৪৩৩ সনে সপ্তাহে মাত্র ২ লাখ ৩ হাজার টাকায় খাস আদায়ের দায়িত্ব পান সালাম। জোড়া খুনের ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পর মামলা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে সন্দেহভাজন এক আসামিকে।
উপজেলা পরিষদ সূত্র জানায়, বাংলা ১৪২০ সাল থেকে পুষ্পপাড়া হাটের টেন্ডার বন্ধ রয়েছে। এর আগে পুষ্পপাড়া কামিল মাদ্রাসার পক্ষে জমির বিরোধ-সংক্রান্ত একটি মামলায় হাটের টেন্ডার প্রক্রিয়া স্থগিতের আদেশ দেওয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে ওই আদেশের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়নি। অভিযোগ রয়েছে, এ সুযোগে একটানা ১৪ বছর সালাম খাস আদায়ের দায়িত্ব পান। প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার হাট বসে। আগের বছরও মাত্র ২ লাখ ২ হাজার টাকায় হাটের খাস আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, পুষ্পপাড়ার তুলনায় ছোট টেবুনিয়া হাটে এ বছর বার্ষিক ৭৬ লাখ টাকায় ইজারা হয়েছে। সে হিসাবে পুষ্পপাড়া হাটে নিয়মিত টেন্ডার হলে সরকারের কয়েক কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব ছিল। অভিযোগ রয়েছে, সালামের পক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারাও সুপারিশ করতেন।
নিহত সালাম সদর উপজেলা শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক ছিলেন। তার ভাগনে রিপন হোসেন ছিলেন আতাইকুলা ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি। সালামের বড় ভাই কাল্যা কালাম পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি এমএল লাল পতাকার আঞ্চলিক নেতা। স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তারা দীর্ঘদিন হাটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন।
রোববার সকালে আতাইকুলার পুষ্পপাড়া পূর্ব বনগ্রামে অভিযান চালিয়ে মুসা নামে এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে এসআরবি। তিনি আতাইকুলা থানার ধর্মগ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে ও চরমপন্থি দলের সদস্য। এসআরবি-১২ পাবনার ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডার সহকারী পুলিশ সুপার ডলি রানী সরকার জানান, মুসা মামলার এজাহারনামীয় ৯ নম্বর সন্দেহভাজন আসামি। তাকে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থার জন্য আতাইকুলা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে মুখোশ পরা ৫ থেকে ৭ জন সশস্ত্র দুর্বৃত্ত গুলি করে সালাম ও তার ভাগনে রিপন হোসেনকে হত্যা করে। শনিবার রাতে রিপনের ভাই রুবেল হোসেন বাদী হয়ে আতাইকুলা থানায় মামলা করেন। মামলায় ১৫ জনকে সন্দেহভাজন এবং অজ্ঞাত আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ জানান, দীর্ঘদিন হাটের ইজারা থেকে বঞ্চিত একাধিক পক্ষের সঙ্গে সালামের লোকজনের বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে একসঙ্গে চারজন খুন হওয়াসহ গত দেড় দশকে পুষ্পপাড়া হাটের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিহত আব্দুস সালাম ছিলেন কুরআনের হাফেজ। তিনি একাধিকবার হজ পালন করেছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৭ বছরে তিনি শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকার চেষ্টা করতেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল পুষ্পপাড়া হাটের ইজারা ও আধিপত্য ধরে রাখা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি জামায়াতের নেতাদের ছত্রছায়ায় যান। এলাকাবাসীর দাবি, সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনি দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন। অন্যদিকে তার ভাগনে নিহত রিপন ছিলেন শ্রমিক দলের নেতা। এভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে তারা হাটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতেন। সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামারা তাসবিহা জানান, ১৪২০ সাল থেকে উন্মুক্ত ডাকে খাস কালেকশনের মাধ্যমে সালামকে হাটের দায়িত্ব দেওয়া হতো। তিনি বলেন, ‘আমি তো অল্পদিন হলো এখানে এসেছি। শুনেছি, সালাম ছাড়া অন্য কেউ ডাকে অংশ নিতেন না।’
