নরসিংদীতে পাঁচজনসহ নিহত ১০, আহত সহস্রাধিক
শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল দেশ
৩০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প * রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭ * উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদী * আতঙ্কে ভবন থেকে সড়কে বেরিয়ে আসেন হাজারো মানুষ, কেউ কেউ লাফিয়ে পড়েন * অসংখ্য ভবনে ফাটল ও হেলে পড়েছে * কন্ট্রোল রুম খুলেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর * প্রধান উপদেষ্টার শোক
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ভূমিকম্পে পুরান ঢাকায় নিহত আব্দুর রহিম ও মেহরাব হোসেন রিমনের (ডানে) স্বজনদের আহাজারি ও নিহত মেডিকেল শিক্ষার্থী রাফিউল ইসলাম (ডানে ওপরে)। শুক্রবার মিটফোর্ড হাসপাতাল মর্গের সামনে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট। হঠাৎ ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশ। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষ আতঙ্কে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে আসেন। কেউ সড়কে, কেউ সিঁড়িতে, কেউ বা ছাদে, কেউ আবার খাটের নিচে আশ্রয় নেন জীবন বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টায়। অনেকে ভবন থেকে লাফিয়েও পড়েন। কয়েক সেকেন্ডের কম্পনেই প্রাণ হারালেন ১০ জন। আহত হলেন সহস্রাধিক মানুষ। রাজধানী ও এর বাইরে বিভিন্ন হাসপাতালে আহত হয়ে ৬০৬ জন চিকিৎসা নিয়েছেন বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। অসংখ্য ভবনে ফাটল ধরেছে, কোথাও হেলে পড়েছে। নিমিষে দেশজুড়ে নেমে আসে শোক, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দিনটি শুক্রবার না হলে হতাহতের সংখ্যা হয়তো আরও বেশি হতো। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো দ্রুত অপসারণ না করলে আরও ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছেন তারা।
নিহতদের মধ্যে রাজধানীতে চারজন, নরসিংদীতে বাবা-ছেলেসহ ৫ জন এবং নারায়ণগঞ্জে এক শিশু রয়েছে। গাজীপুরে হুড়োহুড়ি করে কারখানা থেকে নামতে গিয়ে ৬ শতাধিক পোশাক শ্রমিক আহত হয়েছেন। নরসিংদীতে আহত হয়েছেন শতাধিক, জেলার বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ভবনে ফাটলও ধরেছে। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে অনেক ভবন হেলে পড়েছে ও ফাটল ধরেছে। ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাবস্টেশনের একটি ট্রান্সফরমারে আগুন লেগে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হল ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন ৪ শিক্ষার্থী। এছাড়া হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে আরও ৬ জন আহত হন।
হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এক শোকবার্তায় তিনি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে উদ্ধার কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দেন। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং ক্ষতির পূর্ণ বিবরণ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, জনগণ ধৈর্য ও সাহসের সঙ্গে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাঝারি মাত্রার এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নরসিংদীর মাধবদী, যা ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের ক্ষতি নিরূপণে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক ই আজম। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাসহ এর আশপাশেও মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে।
ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবির বলেছেন, ৩০ বছরের মধ্যে দেশে সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প এটি। হিরোশিমা, নাগাসাকিতে ফেলা একটি বোমা যে শক্তি রিলিজ করেছিল, আজকের ভূমিকম্প সেই মাত্রার শক্তি রিলিজ করেছে।
রাজধানীতে কম্পন শুরুর পরপরই চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যেন অপ্রত্যাশিত মৃত্যুভয় তাড়া করছিল তাদের। আতঙ্কিত মানুষ বাঁচার জন্য যে যার মতো ছোটাছুটি করতে থাকেন। রাস্তায় নেমে আসেন বহু মানুষ। ভবন থেকে লাফিয়ে, সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে আহত হয়েছেন অনেকে।
ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ভূমিকম্পের সময় রাজধানীর আরমানিটোলার কসাইটুলি এলাকার একটি ৮ তলা ভবনের পাশের দেওয়াল এবং কার্নিশ থেকে ইট ও পালেস্তারা খসে পড়ে। সেখানে একটি গরুর মাংসের দোকান ছিল। ওই সময় সেখানে ক্রেতা ও পথচারীরা আহত হন। ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় লোকজন তাদের হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে চিকিৎসক তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। তারা হলেন-স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের (মিডফোর্ট) ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাফিউল ইসলাম রাফি, হাজী আব্দুর রহিম (৪৭) ও মেহরাব হোসেন রিমন (১২)। আরমানিটোলার ঘটনায় আহত ১০ জন মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, যে বাড়িটির ইট ও দেওয়াল ধসে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে সেই বাড়ির মালিক তিন ভাই। ঘটনার পর থেকেই তারা পলাতক। তাদের খুঁজে বের করতে অভিযান অব্যাহত আছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রাজধানীর মুগদার মদিনাবাগে ভূমিকম্পে নির্মাণাধীন ভবনের রেলিং ধসে পড়ে এক নিরাপত্তাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। তার নাম মাকসুদ (৫০)। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে তার লাশ নিয়ে আসে মুগদা থানা পুলিশ।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর জানিয়েছে, খিলগাঁওয়ে নির্মাণাধীন ভবন থেকে পার্শ্ববর্তী দোতলা একটি ভবনে একটি ইট পড়ে একজন আহত হয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিসের জোন-১ এর কমান্ডার মো. এনামুল হক জানান, আরমানিটোলা এলাকার প্রতিটি ভবনের রেলিং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। কোনো রেলিংই সঠিকভাবে পিলারের সঙ্গে সংযুক্ত নয়। আবার ভূমিকম্প হলে আরও রেলিং ধসে বহু লোক হতাহত হতে পারেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের আমরা অনুরোধ করছি, প্রতিটি রেলিং পরীক্ষা করে দেখতে।
ভূমিকম্পের প্রভাবে বারিধারা ব্লক-এফ, রোড-৫-এ একটি বাসায় আগুনের সংবাদ পাওয়া গেছে। বারিধারা ফায়ার স্টেশনের ২টি ইউনিট অগ্নিনির্বাপণে কাজ করে। সূত্রাপুরের স্বামীবাগে দুটি বহুতল ভবন হেলে পড়েছে। এছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে ফায়ার স্টেশন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কোনো ক্ষয়ক্ষতি দেখতে পায়নি বলে জানিয়েছে। কলাবাগানের আবেদঢালী রোডে একটি ৭ তলা ভবন হেলে পড়ার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যায়। পরিদর্শন শেষে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ভবনটি ঠিক আছে, লোকজন আতঙ্কিত হয়ে ফোন করেছিল।
এদিকে ভূমিকম্পের ঘটনায় ৭০ জন আহত হয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে (পঙ্গু হাসপাতাল) চিকিৎসা নিয়েছেন। হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান জানান, দুপুর ১২টার পর থেকে প্রায় ৭০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে এসেছেন। এর মধ্যে ১৫ জনকে ভর্তি করা হয়েছে, বাকিদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন ছাত্র আছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে।
অপরদিকে উত্তর বাড্ডা এলাকার সৈনিক ভবন (লিংক রোড জোড়া বিল্ডিং) হেলে পড়ার তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ভবনটি পরিদর্শনের পর রাজউকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরীক্ষা করে তারা কোনো ত্রুটি পাননি। হাতিরঝিলের মধুবাগের মিরেরটেক এলাকায় নির্মাণাধীন সাততলা ভবনের দেওয়াল ধসে তিনজন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে।
ঢামেক সূত্র জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আহত হয়ে শিক্ষার্থী ও শিশুসহ অন্তত ৩৯ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে আসেন। বেশির ভাগই প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। একজন শিশুসহ দুজনকে ভর্তি রাখা হয়েছে। যারা ঢামেকে আসেন তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন, আরাফাত, নুরুল হুদা, সুবিয়া, সোহেল, হারুনুর রশিদ, আবুল খায়ের, অজ্ঞাত এক পুরুষ, তানজিল হোসেন, তানভীর হোসেন, হারুনুর রশিদ, সাদিক শিকদার, রিপন, বিল্লাল, ফারজানা তানভীর, প্রভা, গালিব, মধু ও সজীব।
শুক্রবার দুপুরে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ঢামেকে গিয়ে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ সময় চলমান চিকিৎসা কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং রোগীদের অবস্থা সম্পর্কে তাকে অবহিত করে।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ উপদেষ্টা ফারুক ই আজম। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে তাৎক্ষণিক একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের টেলিফোন ০২৫৮৮১১৬৫১ নাম্বারে সবাইকে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, এ নিয়ে কোনো ধরনের গুজব বা বিভ্রান্তিতে কান না দিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত ১৪টি ভবনের প্রাথমিক তালিকা দিয়েছে ঢাকা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিসার। এর মধ্যে মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, আরমানিটোলা, সূত্রাপুর, বনানী, কলাবাগান, বসুন্ধরা, নর্দা, দক্ষিণ বনশ্রী, মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, বাড্ডা, মগবাজার ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় একটি করে ভবন রয়েছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
নরসিংদী : জেলায় বাবা-ছেলেসহ পাঁচজন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন। এছাড়া শতাধিক ভবনে ফাটল ধরেছে। শহরের গাবতলীতে ছয়তলা নির্মাণাধীন ভবনের দেওয়াল ধসে একতলা ভবনের ওপর পড়লে দেলোয়ার হোসেন, ছেলে ওমর ও মেয়ে তাসফিয়া আহত হয়। তাদের প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাবা-ছেলেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে তাদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তাদের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ার শোকের ছায়া নেমেছে।
পলাশ উপজেলার মালিকা গ্রামে মাটির ঘরের দেওয়াল চাপায় কাজম আলী (৭৫) নামে একজন মারা গেছেন। নিহত কাজম আলী উপজেলার চরসিন্দুর ইউনিয়নের মালিতা পশ্চিমপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। নিহতের চাচাতো ভাই আউয়াল মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একই উপজেলার ডাঙ্গা কাজিরচর এলাকায় সিরাজ উদ্দিনের ছেলে নাসির উদ্দিন (৬৫) আতঙ্কে হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। এছাড়া শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নের আসকিতলা গ্রামে গাছে উঠে ডাল কাটার সময় পড়ে মারা যান ফুরকান মিয়া (৪৫)। তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা। ফুরকান কৃষিকাজ করতেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইয়াসমিন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে ঘোড়াশাল এলাকায় ৬টি বাড়ি ও এসএ প্লাজা নামে একটি ৭ তলা বিশিষ্ট শপিংমলে ফাটল ধরেছে। ঘোড়াশাল বাজার এলাকার বিভিন্ন ভবনের ছাদ থেকে দেয়ালের ইট পড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। পলাশ রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজের আঙিনায় মাটি দেবে যায়। ঘোড়াশাল ঈদগাহ রোডের মারকাসুল সুন্নাহ তাহফিজুল কুরআন সুন্নাহ মাদ্রাসার পরিচালক মুফতি সালা উদ্দিন আনসারী বলেন, আমাদের ৬ তলা ভবনের ৪-৫ জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে।
এদিকে ভূমিকম্পে ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাবস্টেশনের একটি ট্রান্সফরমারে আগুন লেগে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অপর ট্রান্সফরমারগুলোর অধিকাংশ সংযোগ ভেঙে পড়ে। পলাশ ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. গুলশানা কবির বলেন, ভূমিকম্পে আহত হয়ে প্রায় অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষ চিকিৎসা নিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁ : রূপগঞ্জে দেওয়াল ধসে ফাতেমা (১) নামে এক নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় তার মা কুলসুম বেগম ও প্রতিবেশী জেসমিন বেগম আহত হয়েছেন। নিহত ফাতেমা গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ইসলামবাগ ৫ নম্বর ক্যানেল এলাকার আব্দুল হকের মেয়ে। স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা ভুলতা গাউছিয়া যাওয়ার সময় সড়কের পাশের দেয়াল ধসে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই নবজাতকের মৃত্যু হয়। আহত কুলসুম বেগম ও জেসমিন বেগমকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা হাসপাতালে নিয়ে যান।
এদিকে হুড়োহুড়ি করে ভবন থেকে বের হওয়ার সময় নারী-শিশুসহ কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। অনেক ভবনের পলেস্তারা, টাইলস খুলে পড়ে। সিদ্ধিরগঞ্জের হাউজিং এলাকা, হীরাঝিল আবাসিক এলাকা, আল ইসলাম নগর, রনি সিটির ৪ নম্বর গলি ও ৫ নম্বর রোড-এসব জায়গায় বহু ভবনের দেওয়াল, কলাম, সিঁড়ি ও সাইড ওয়ালে গুরুতর ফাটল দেখা গেছে। কিছু ভবনের সাইড ওয়াল ভেঙে পাশের টিনশেড ঘরের ওপর পড়ে ক্ষতি করেছে। তবে কেউ আহত হননি। একটি স্কুলের বহুতল ভবনের নিচ তলার দেওয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জ আদমজী ইপিজেডে ভূমিকম্পের আতঙ্কে ৭ জন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অসুস্থদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
৬৫ বছর বয়সি গোপালদী এলাকার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, আমি জীবনে এমন ভূকম্প দেখিনি। কয়েক সেকেন্ডের জন্য হলেও মনে হয়েছিল সবকিছু ভেঙে পড়বে।
সোনারগাঁ উপজেলার মোগরাপাড়া ইউনিয়নের কাবিলগঞ্জে দেওয়াল পড়ে রাকেশ রায় নামে এক যুবক আহত হয়েছেন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে তাকে ভর্তি করা হয়েছে। বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের উলুকান্দি মাদ্রাসার ছাত্র মারুফ হোসেন দ্বিতীয় তলা থেকে লাফিয়ে নিচে পড়ে মারাত্মক ভাবে আহত হয়। তাকে সোনারগাঁ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়াও উপজেলার কাঁচপুর শিল্পনগরীতে একটি কারখানায় হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে প্রায় ৮ জন শ্রমিক আহত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ভবন থেকে লাফ দিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত চার শিক্ষার্থী। সব মিলিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কয়েকজন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাজী মুহাম্মদ মহসীন হলের চারতলা ভবন থেকে লাফ দিয়ে তানজীর হোসেন নামের এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন। এই হলের আরও দুজন শিক্ষার্থী ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আহত হয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের এক শিক্ষার্থী লাফিয়ে পড়ে আহত হয়েছেন। তার পা ভেঙে গেছে। কবি জসীমউদ্?দীন হল, সূর্যসেন হল, ফজলুল হক মুসলিম হল ও ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ হলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর আহত হওয়ায় খবর পাওয়া গেছে। কয়েকটি ভবনের পলেস্তারা খসে পড়েছে।
চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমের মালিকানাধীন একটি বহুতল ভবন হেলে পড়েছে। হেলে পড়া ভবনটি নগরীর ডবলমুরিং থানাধীন মনসুরাবাদ মিয়া বাড়ি এলাকায় অবস্থিত। চট্টগ্রামের কোথাও প্রাণহাটির ঘটনা ঘটেনি। আতঙ্কে আগ্রাবাদ, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় লোকজন বাসাবাড়ি থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। বাঁশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট আগে থেকেই বন্ধ ছিল। ভূমিকম্পের পর আরেকটি ইউনিটও বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।
রাবি : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শেরেবাংলা ফজলুল হক হল ভবন ভূমিকম্পে হেলে পড়েছে। হলের বিভিন্ন দেয়ালে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। আতঙ্কিত আবাসিক শিক্ষার্থীরা দ্রুত তাদের অন্য আবাসিক হলে স্থানান্তর ও ক্ষতিগ্রস্ত স্থান পুনর্নির্মাণের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। এদিকে ভূমিকম্পের পর রাজশাহী মহানগরে বহুতল ভবন নির্মাণে ত্রুটি এবং ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করছেন মহানগরবাসী।
কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) : কেরানীগঞ্জের জিনজিরা এলাকায় একটি সাততলা ভবন হেলে পড়েছে। জিনজিরা বাস রোডের সাথে আব্দুর সাত্তার মিয়ার ভবনটি পাশের মো. ভুট্টো মিয়ার সাততলা ভবনের ওপর হেলে পড়ে। এ সময় দুটি বাড়ির লোকজন জীবন রক্ষার জন্য দৌড়ে নিচে নামেন। এতে হুড়োহুড়িতে কয়েকজন সামান্য আহত হন। জিনজিরা এলাকার বাসিন্দা আজগর আলী বলেন, আবদুর সাত্তার মিয়ার বাড়িটি ইঞ্জিনিয়ারের প্ল্যান ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটি তিনতলা নির্মাণের উপযুক্ত। অথচ সাততলা করার কারণেই হেলে পড়েছে।
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) : ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে ঈশ্বরগঞ্জের জাহেদা খাতুন (৪৫) নামের এক নারী মারা গেছেন। উপজেলার কাকনহাটী গ্রামের ড্রাইভার মজিবুর রহমান স্ত্রী জাহেদাকে নিয়ে ঢাকার পুরাতন কচুক্ষেত মুসলিম মডার্ন রোডের সিবিএ-১ এর ৫ম তলায় থাকতেন। শুক্রবার ভূমিকম্প অনুভূত হলে জাহেদা আতঙ্কে স্বামীর খোঁজে নিচে নেমে আসেন। স্বামীকে দেখে জড়িয়ে ধরার মুহূর্তেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। মজিবুর রহমান বলেন, ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে আমার স্ত্রী এমনভাবে মারা যাবে, তা কখনো ভাবিনি।
পলাশ (নরসিংদী) : নরসিংদীর পলাশের ঘোড়াশালে ভূমিকম্পে বিভিন্ন ভবনের ফাটল দেখা দিয়েছে। ভূমিকম্পের সময় দৌড়ে বাইরে বের হতে গিয়ে ও মাথায় দোকানের মালামাল পড়ে একজন নিহত ও প্রায় ২০ জন আহত হয়েছে। এদিকে ঘোড়াশাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাবস্টেশনে আগুন লেগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। ভূমিকম্পের পর ঘোড়াশালসহ পলাশে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন করার চেষ্টা করছে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ। এদিকে পলাশের মালিতা গ্রামে কাজম আলী (৭৫) নামে এক বৃদ্ধ মাটির ঘরের দেওয়ালচাপা পড়ে মারা গেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পলাশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন।
মাভাবিপ্রবি : ভূমিকম্পে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি হলের দেওয়ালে (শেখ রাসেল হল ও আমেনা খাতুন হল) ফাটল দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শেখ রাসেল হলের শিক্ষার্থী রিয়াদ বলেন, আমরা ২০২৩ সালের শুরুর দিকে হলে উঠেছি। তখন ৬ষ্ঠ তলায় দেওয়ালে খুব সামান্য ফাটল দেখা যেত। কিন্তু আজকের ভূমিকম্পের পর সেই ফাটল আরও বড় হয়ে গেছে, পাশাপাশি বিমের মাঝেও স্পষ্ট ফাটল ধরা পড়েছে।
জাবি : ভূমিকম্পের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সদ্যনির্মিত ছয়টি দশতলা আবাসিক হলে নতুন করে ফাটল দেখা দিয়েছে। মেঝে, দেওয়াল ও ওয়াশরুমের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরা পড়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা জানান, তিন বছর আগে নির্মিত নতুন হলগুলোতে শুরু থেকেই নিুমানের কাজের অভিযোগ ছিল। এ পরিস্থিতিতে তারা জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন। উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকৌশল বিভাগকে জরুরি তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ দল ফাটলের প্রকৃতি পরীক্ষা করার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বন্দর (নারায়ণগঞ্জ) : ভূমিকম্পের কারণে বন্দরে একটি তুলার প্রেস হাউজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ভূমিকম্পের পর পরই লাগা এ আগুনে পুড়ে গেছে ওই প্রেস হাউজের এক-তৃতীয়াংশ তুলার বেল্ট। আগুন নেভাতে গিয়ে আহত হয়েছেন তিনজন। বন্দর ও সোনারগাঁ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ৫টি ইউনিট প্রায় ৩ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বন্দর থানার ওসি লিয়াকত আলী জানান, ভূমিকম্পের সময় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে তুলা ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগে। এতে তুলা ভস্মীভূত হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
