ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি : পরিবারে শোকের মাতম
মারা যাওয়া ১৮ বাংলাদেশির ১২ জন সুনামগঞ্জের
Advertisement
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে অন্তত ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। এদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। তবে দায়িত্বশীল কোনো কর্তৃপক্ষ অফিশিয়ালি এই তথ্য নিশ্চিত করেনি। স্থানীয়ভাবে পরিবার, প্রতিবেশী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এ পর্যন্ত ১২ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটের কারণে তারা প্রাণ হারিয়েছেন। ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। জানা গেছে, মারা যাওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুরের ৫ জন ও দোয়ারাবাজারের ১ জন রয়েছেন।
তারা হলেন-দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের আবু সাঈদ সরদারের ছেলে নুরুজ্জামান সরদার ময়না, আব্দুল গণির ছেলে সাজিদুর রহমান, ইসলাম উদ্দিনের ছেলে শাহান মিয়া, রনারচর গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান, বাসুরি গ্রামের মো. সুহানুর রহমান ও মাটিয়াপুর গ্রামের তায়েফ মিয়া।
জগন্নাথপুরের চিলাউড়া গ্রামের সোহানুর রহমান, টিয়ারগাঁওয়ের শায়েখ আহমেদ, চিলাউড়া কবিরপুরের মো. নাঈম, পাইলগাঁওয়ের আমিনুর রহমান, ইছগাঁওয়ের মোহাম্মদ আলী। দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের ফয়েজ উদ্দিনের ছেলে ফাহিম আহমেদ মুন্না।
প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্বজনরা বলেন, দালালরা ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে বড় নৌকা দিয়ে ইতালি কিংবা গ্রিসে পাঠানোর কথা থাকলেও পরে ঝুঁকিপূর্ণ ছোট প্লাস্টিকের নৌকায় তাদের সাগরপথে ছেড়ে দেয়। ২ দিনের মধ্যে তারা গন্তব্যে পৌঁছে যাবে এমনটি বলা হলেও যাত্রাপথে ভুল রাস্তায় গিয়ে ৬ দিনেরও বেশি সময় সাগরে কাটানোর কারণে তারা খাবারের অভাব ও পানির পিপাসায় কাতর হয়ে মারা যায়। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, সুনামগঞ্জের মারা যাওয়া ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়া বলেন, আমরা সুনামঞ্জের ৩টি উপজেলায় মোট ১২ জনের প্রাণহানির তথ্য জানতে পেরেছি। তবে এ ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে এ ব্যাপারে সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জগন্নাথপুরের পাঁচ যুবকের পরিবারে বুকফাটা কান্না : জগন্নাথপুর প্রতিনিধি জানান, নৌকাডুবির ঘটনার পর জগন্নাথপুরের পাঁচ তরুণের পরিবারে চলছে শোকের মাতম। এ ঘটনায় পুরো উপজেলাবাসী শোকে মুহ্যমান। রোববার সরেজমিন মারা যাওয়া নাঈম মিয়ার বাড়ি চিলাউড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তার মা আকি বেগম ছেলের মৃত্যুতে হাউমাউ করে কাঁদছেন। তার বুকফাটা কান্নায় কাঁদছেন স্বজনরাও। একই গ্রামের ইজাজুল হক রেজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পিনপতন নীরবতা।
এদিকে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের খোঁজ নিচ্ছেন জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরকত উল্লাহ।
দালালরা কথা রাখেনি : দিরাই প্রতিনিধি জানান, দালালরা কথা রাখেনি, দোতলা জাহাজ না হলে একতলা জাহাজে নেওয়ার কথা, তা না করে প্লাস্টিকের নৌকায় নেয়। দালাল বলছিল খাদ্যের কোনো অভাব হবে না কিন্তু খাদ্যের অভাবে আমার ছেলে মারা গেছে। আমার ছেলেকে আমি বৈধপথে বিদেশ পাঠাতে পাসপোর্টসহ এক লাখ টাকা একটি ট্রাভেলসে জমা রাখি। কিন্তু জগদল গ্রামের মাও আব্দুল ওয়াসিরের ছেলে ইতালি প্রবাসী দালাল সালেহ আহমদের প্রলোভনে পড়ে আমার ছেলে ইউরোপ যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। ২২ মার্চ আমার ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়, সে বলছিল আব্বা আমার কষ্ট হলেও তুমি কোনো চিন্তা করিও না। এরপর থেকে আমি দালাল সালেহ আহমদকে ফোন দিলে ফোন ধরেনি। ক্ষোভে-দুঃখে এসব কথা বলছিলেন সোহানুর রহমান এহিয়ার বাবা সালিকুর রহমান। এছাড়া উপজেলায় মারা যাওয়া অন্য ব্যক্তির স্বজনরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
বেঁচে গেলেন কিশোরগঞ্জের কাদির : কিশোরগঞ্জ ব্যুরো জানায়, মানব পাচার চক্রের খপ্পরে পড়ে গ্রিসের পথে পাড়ি জমানোর সময় ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেন কিশোরগঞ্জের এক যুবক। তার নাম আবদুল কাদির। তিনি কিশোরগঞ্জের হাওড় উপজেলা অষ্টগ্রামের দেওঘর ইউনিয়নের পশ্চিম সাবিয়া নগরের বাসিন্দা। অষ্টগ্রামের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিলভিয়া স্নিগ্ধা নিশ্চিত করেছেন, তিনি বেঁচে যাওয়া যুবকের বাড়িতে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছেন।
