বিমানের মহাপরিকল্পনায় প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন
বহর বাড়ছে, সক্ষমতা কোথায়
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বহর সম্প্রসারণে বড় পরিকল্পনা নিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির বহরে রয়েছে ১৯টি উড়োজাহাজ। এ বছর বোয়িংকে নতুন করে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার আদেশ দিয়েছে। আজ এয়ারবাসের আরও ১০টি কেনার চুক্তি হবে। পাশাপাশি ২০২৭ সালের মধ্যে ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু নতুন বহর বাড়ানোর এই মহাযজ্ঞে কতটা প্রস্তুত বিমান-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ, বিদ্যমান বহর পরিচালনাতেই নানা সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি। দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে যন্ত্রাংশ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট। প্রশ্ন রয়েছে প্রকৌশলী ও মেইনটেন্যান্স সক্ষমতা নিয়েও। এর সঙ্গে রয়েছে পাইলট সংকট। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না থাকা কর্মীরাও বিভিন্ন সময়ে অপারেশনাল জটিলতার কারণ হয়ে উঠছেন। সব মিলিয়ে বহর বাড়ানোর এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিমানের বর্তমান সক্ষমতা কতটা এবং নতুন উড়োজাহাজ পরিচালনায় অতিরিক্ত কতটা সক্ষমতা প্রয়োজন-তার সুস্পষ্ট রোডম্যাপ রয়েছে কিনা, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক এভিয়েশন বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব পুনরুদ্ধারে বহর বাড়ানোর উদ্যোগ যথাযথ। তবে শুধু বহর বড় করলেই হবে না; তা নিরাপদ ও দক্ষভাবে পরিচালনার সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে এয়ারলাইন্সের ব্যবসায়িক কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট রুটের ওপর নির্ভর না করে স্পোক-হাব মডেল, ইন্টারলাইন ও কোডশেয়ার চুক্তির মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণের কৌশল নিতে হবে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে পাইলট-ক্রুর পাশাপাশি বাড়াতে হবে প্রশিক্ষণ, সিমুলেটর, রক্ষণাবেক্ষণ, হ্যাঙ্গার, পার্কিং, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও বিমানবন্দর অবকাঠামো।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘বহর সম্প্রসারণ অবশ্যই ইতিবাচক। নতুন বিমান আসার আগেই পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী ও রক্ষণাবেক্ষণকর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ শেষ করতে হবে। সিমুলেটর, যন্ত্রাংশ, মেইনটেন্যান্স সুবিধা ও গ্রাউন্ড সাপোর্টও প্রস্তুত রাখতে হবে। শুধু পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ফ্লাইট দিয়ে বড় বহর পরিচালনা করা কঠিন। একই সঙ্গে কোন রুটে কখন কত যাত্রী সেটি বিবেচনায় নিয়ে উড়োজাহাজ ব্যবহার করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বহর বাড়ানোর সঙ্গে আর্থিক দায়ও বাড়বে। তাই এখনই অর্থায়ন, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ ও অবকাঠামোর সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে। হ্যাঙ্গার, পার্কিং ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সক্ষমতা না বাড়ালে নতুন উড়োজাহাজের বড় অংশই কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজে লাগানো যাবে না।’
জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত যুগান্তরকে বলেন, ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর সম্প্রসারণের উদ্যোগ বর্তমান সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত করার পাশাপাশি এগুলো পরিচালনার প্রয়োজনীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বহর সম্প্রসারণের সুফল নিশ্চিত করতে নিরাপদ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।’
পাইলট ও কেবিন ক্রুর সংকট : প্রাপ্ত তথ্যমতে, বর্তমানে ১৯টি উড়োজাহাজের বহর পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে রয়েছেন প্রায় ২১৮ জন পাইলট ও ৬০০ জন কেবিন ক্রু। আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে পাইলট দরকার অন্তত ৩০০ জন ও কেবিন ক্রু ৯০০ জন। বিদ্যমান বহর পরিচালনাতেই যখন জনবল নিয়ে চাপ রয়েছে, তখন একসঙ্গে কয়েক ডজন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত হলে প্রয়োজনীয় জনবল কোথা থেকে আসবে তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। নতুন ২৫টি বোয়িং, ১০টি এয়ারবাস এবং ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এই বহর ৬৪টি উড়োজাহাজে দাঁড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে আনুপাতিক হারে যদি জনবল তৈরি না হয় তাহলে আরেকটি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বিমান।
আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর ক্ষেত্রেও বহরের আকার বাড়ার সঙ্গে সমানতালে পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, মেইনটেন্যান্স কর্মী ও অন্যান্য অপারেশনাল জনবল বাড়ানো হয়। উড়োজাহাজের ধরন, রুট, দৈনিক ফ্লাইট ও অপারেশনাল সূচির ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় জনবলের পরিমাণও ভিন্ন হয়। উড্ডয়ন পরিচালনায় প্রচলিত জনবল কাঠামো বিবেচনায় ৬৪টি উড়োজাহাজের জন্য বিমানে অন্তত ৭৬৮ থেকে ৮৯৬ জন পাইলট এবং ১০২৪ থেকে ১২৮০ জন কেবিন ক্রু প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিমানকে বর্তমান জনবলের অতিরিক্ত আরও প্রায় ৫৮৮ থেকে ৭১৬ জন নতুন পাইলট এবং ৪২৪ থেকে ৬৮০ জন কেবিন ক্রু নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
বিমান পরিচালনায় আন্তর্জাতিক জনবল কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৫০ থেকে ৬০টি উড়োজাহাজ পরিচালনাকারী যে কোনো মানসম্মত বা বাজেট এয়ারলাইন্সে গড়ে ৬০০ থেকে ৭৫০ জন পাইলট এবং ৯০০ থেকে ১২০০ জন কেবিন ক্রু সার্বক্ষণিক কর্মরত থাকেন। উড়োজাহাজের ধরন ও রুটের ওপর ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলো প্রতি ওয়াইড-বডি (বোয়িং ৭৭৭ বা ৭৮৭) বিমানের জন্য ১৪ থেকে ১৬ জন এবং ন্যারো-বডি (এয়ারবাস এ৩২০ বা বোয়িং ৭৩৭) বিমানের জন্য ১০ থেকে ১২ জন পাইলটের স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন উড়োজাহাজ পাঁচ বছর পর এলেও জনবল তৈরির কাজ এখনই শুরু করতে হবে। পাইলট প্রশিক্ষণে দীর্ঘ সময় লাগে। একই সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ার, কেবিন ক্রু, মেইনটেন্যান্স ও অন্যান্য কারিগরি জনবলের চাহিদা আগাম নির্ধারণ করতে হবে। বিশ্বজুড়েই পাইলট সংকট রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে দেশীয় প্রশিক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
দেশেই প্রশিক্ষণ একাডেমি করার পরামর্শ : এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, কার্যকর পাইলট প্রশিক্ষণ অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমির মতো পুরোনো প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করে কীভাবে আধুনিকায়ন ও পুনরুজ্জীবিত করা যায়, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। উড়োজাহাজ থাকলে পাইলট লাগবেই। বিদেশ থেকে পাইলট এনে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব, তবে এতে পরিচালন ব্যয় বাড়বে। দেশে আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ তৈরি হবে এবং এতে ব্যয়ও কমবে।
বিমানের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ মেইনটেন্যান্স সক্ষমতা। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ঘাটতির কারণে উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ছে। কারিগরি ত্রুটিও নিয়মিতই সামনে আসছে। বোয়িংয়ের ২০২৫ সালের অক্টোবরের প্রতিবেদনে বিমানের কারিগরি ও পরিচালন ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে কর্মীদের অবসরে যাওয়ার সঙ্গে নতুন কর্মী নিয়োগের মধ্যে সমন্বয় রেখে দীর্ঘমেয়াদি জনবল পরিকল্পনার সুপারিশ করা হয়েছে। দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখতে ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
নতুন মডেলের উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়ানো এবং শিক্ষানবিশ কর্মসূচি চালুরও সুপারিশ রয়েছে। অর্থাৎ নতুন উড়োজাহাজ কেনার সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরির কাজও সমানতালে এগোনোর প্রয়োজন রয়েছে।
এছাড়া বিমানের কারিগরি ব্যবস্থার দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে হ্যাঙ্গার ও পার্কিং ব্যবস্থাপনাতেও। বোয়িং প্রতিবেদনে বলেছে, যাত্রী ওঠানামার স্থান থেকে বিমানের হ্যাঙ্গারের দূরত্ব ২০ থেকে ৪০ মিনিটের। কোনো উড়োজাহাজে শেষ মুহূর্তে কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে প্রকৌশলীদের হ্যাঙ্গার থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রিন্ট করে আনতে হয়। কারণ তাদের কাছে ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক ম্যানুয়াল দেখার জন্য প্রয়োজনীয় ট্যাব নেই। উড়োজাহাজের কাছে দ্রুত পৌঁছানোর জন্য বিমানবন্দরের ভেতরে প্রকৌশলীদের আলাদা গাড়িও নেই। হ্যাঙ্গারে উড়োজাহাজের উচ্চতায় পৌঁছানোর জন্য রয়েছে মাত্র একটি হাই-লিফট প্ল্যাটফর্ম। এ ধরনের সীমাবদ্ধতা যেখানে বর্তমান বহরের ক্ষেত্রেই রয়েছে, সেখানে বহর কয়েক গুণ বাড়লে পরিস্থিতি কী হবে সে প্রশ্নটিও তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিগত দিনের কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশি স্টেশনগুলোতেও বিমানের নিজস্ব কারিগরি সহায়তা ব্যবস্থা দুর্বল। বিদেশের বিমানবন্দরগুলোতে স্থানীয় কর্মী বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কর্মী ভাগাভাগির চুক্তি না থাকায় বিমানের উড়োজাহাজে কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে অনেক ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে প্রকৌশলী পাঠাতে হয়। ভিসা, যাতায়াত ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার কারণে মেরামত কাজ শুরু করতেও সময় লেগে যায়। ৭ আগস্ট রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে বিমানের একটি বোয়িং ৭৮৭। টরন্টো থেকে ঢাকাগামী উড়োজাহাজটিতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটি রোমে আটকে যায়। পরে ঢাকা থেকে দুজন প্রকৌশলী ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাঠাতে হয়। এ ঘটনায় প্রায় ২৬০ জন যাত্রী ৪০ ঘণ্টার বেশি সময় সেখানে আটকে ছিলেন।
নতুন উড়োজাহাজের সঙ্গে প্রয়োজন হবে প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান, যন্ত্রপাতি এবং রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা। বাড়াতে হবে হ্যাঙ্গার ও পার্কিং সুবিধাও।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, এতগুলো উড়োজাহাজ এলে সেগুলো কোথায় থাকবে এবং কোথায় মেইনটেন্যান্স হবে তার পরিকল্পনা এখনই করতে হবে। ঢাকায় পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলে সিলেট, কক্সবাজারসহ অন্যান্য বিমানবন্দরকে বিকল্পভাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা যেতে পারে। কারণ বহর বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে শুধু ফ্লাইট সংখ্যা নয়, বাড়বে উড়োজাহাজের পার্কিং, মেইনটেন্যান্স, যাত্রী, লাগেজ, কার্গো এবং টার্নঅ্যারাউন্ডের চাপ।
এদিকে, দীর্ঘ বহর ও নতুন উড়োজাহাজ মানেই বাড়তি ফ্লাইট। বাড়বে যাত্রী ও লাগেজের চাপ। একই সঙ্গে বাড়বে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ। বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমান রানওয়ের সক্ষমতা সীমিত। এখনই নতুন রানওয়ে করা না গেলেও বিদ্যমান রানওয়ের ক্যাপাসিটি কীভাবে আরও ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানো যায়, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে এখনই তা নিয়ে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে পার্কিং, হ্যাঙ্গার ও অন্যান্য অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে এবং কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসাবে ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। তবে বিমানবন্দর ও গ্রাউন্ড অপারেশন একই গতিতে প্রস্তুত না হলে বাড়তি বহরের কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া কঠিন হবে।
পরিবর্তন আনতে হবে রুট ব্যবস্থাপনায় : বিমানের বহর সম্প্রসারণের সঙ্গে রুট ব্যবস্থাপনাতেও কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হবে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলেও সঠিক রুট পরিকল্পনা না থাকলে তা উলটো আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। বর্তমানে বিমান ২২টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে। নতুন উড়োজাহাজ এলে কোনটি কতটা লাভজনক, কোন রুটে চাহিদা বেশি এবং কোথায় লোকসান হচ্ছে-তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি।
এটিএম নজরুল ইসলামের মতে, বিমানকে ধীরে ধীরে স্পোক-হাব ক্যারিয়ার হিসাবে গড়ে তোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এয়ারলাইনসের সঙ্গে ইন্টারলাইন ও কোডশেয়ার চুক্তি বাড়াতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী বড় ও ছোট উড়োজাহাজ ব্যবহারের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সকালে যাত্রীর চাপ বেশি হলেও দুপুরে তা কম থাকতে পারে। তাই সময় ও চাহিদা বিবেচনায় উড়োজাহাজের আকার পরিবর্তনের মতো নমনীয় ফ্লিট ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।
অর্থসংস্থানও বড় চ্যালেঞ্জ : বহর সম্প্রসারণের সঙ্গে বিমানের আর্থিক দায়ও দ্রুত বাড়বে। নতুন উড়োজাহাজের প্রি-ডেলিভারি ও ডেলিভারি পেমেন্ট, লিজের দায় এবং পরিচালন ব্যয় সামলাতে এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন উড়োজাহাজ আসার আগেই চাহিদাসম্পন্ন রুটগুলোতে স্বল্পমেয়াদি লিজে উড়োজাহাজ নিয়ে বাজারে অবস্থান শক্ত করা যেত। পরে নতুন উড়োজাহাজ এলে লিজের উড়োজাহাজ সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হতো। এতে আগেই বাজার তৈরি ও ক্যাশফ্লো নিশ্চিত করা যেত। এখনই ক্যাশ পেমেন্টের পাশাপাশি ক্রেডিট ও অন্যান্য অর্থায়ন সুবিধা ব্যবহারের সমন্বিত ফাইন্যান্সিং মডেল তৈরি করতে হবে। তা না হলে বড় বহরই এক সময় বিমানের জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানের সাফল্য বহরের আকারে নয়; বরং কতগুলো উড়োজাহাজ নিরাপদে, নিয়মিত ও লাভজনকভাবে পরিচালনা করতে পারছে-সেটিতেই নির্ধারিত হবে।

