Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি

বেশি প্রভাব দশ খাতে

চাহিদা কমাতে সরকারের চার পদক্ষেপ * শিগগিরই যুদ্ধ বন্ধ না হলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ

Advertisement

মনির হোসেন

মনির হোসেন

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বেশি প্রভাব দশ খাতে

Advertisement

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আর এর প্রভাব পড়েছে সব খাতে। ইতোমধ্যেই দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংক খাতসহ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা টালমাটাল অবস্থায় আছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সেটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের কারণে দেশের অন্তত ১০টি খাতের প্রভাব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে-বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহণ, শিল্প খাত, কৃষি, আমদানি-রপ্তানি, গৃহস্থালি, সেবা, নির্মাণ, পর্যটন ও বিনোদন এবং টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি খাত। বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর। মোট জ্বালানির ৬৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। আবার জ্বালানি মজুদেরও তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি আমদানির গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বড় সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। সংকট মোকাবিলায় সরকার মার্কেট খোলা রাখার সময় কমিয়ে আনা, বিদ্যুতের লোডশেডিং বাড়ানো, অফিস সময় এগিয়ে আনা এবং জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি সব উদ্যোগের মূল কথা হলো-চাহিদা কমানো। কিন্তু সরবরাহ বাড়াতে তেমন কোনো বিকল্প ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ। তাদের মতে, ইরান যুদ্ধ দেশের অর্থনীতিতে বড় দুর্বলতা তৈরি করেছে এমন নয়। দেশের অর্থনীতি আগে থেকেই দুর্বল ছিল। ইরান যুদ্ধ সেটার প্রকাশ ঘটছে।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে দেশের সবকিছুর সম্পৃক্ততা রয়েছে। বর্তমানে জ্বালানি খাতে যে সংকট চলছে, তা অর্থনীতিকে অত্যন্ত খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। শিগগিরই যুদ্ধ না থামলে সামনে পরিস্থিতি হবে আরও ভয়াবহ। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়েছে দেশ। কারণ বর্তমানে বিদেশি ঋণ রয়েছে ১১৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকারকে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিতে হচ্ছে। যার অন্যতম একটি কারণ হলো-বড় অঙ্কের সুদ পরিশোধের চাপ। এ অবস্থায় জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলবে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে। জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে অবশ্যই বিকল্প পথে জ্বালানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ইরানে ২৮ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। পালটা পদক্ষেপ হিসাবে তেল পরিবহণের অন্যতম রুট হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। এর ফলে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশে তেলের সংকট দেখা দেয়। এতেই বহুমুখী সংকট তৈরি হয়। বর্তমানে তেলের জন্য পেট্রোলপাম্পগুলোতে একরকম যুদ্ধ চলছে। মালিক ও ক্রেতাদের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ হচ্ছে। তবে সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়কমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত আছে।

তিন ধরনের জ্বালানি বাংলাদেশে ব্যবহৃত হয়।

এগুলো হলো-তেল, গ্যাস এবং কয়লা। এর মধ্যে তেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। গ্যাসের আমদানি তুলনামূলকভাবে কম। আবার কয়লার আমদানি বেশি। আর জ্বালানি হিসাবে তেলের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু হরমুজ প্রণালি বন্ধের কারণে সব খাতে প্রভাব পড়েছে। এই সংকট ক্রমেই জাতীয় সমস্যায় রূপ নিচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বিশেষ করে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তিনটি খাত কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এছাড়াও জাতীয় বাজেট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে প্রভাব পড়তে পারে। তবে ১০টি খাতে বেশি প্রভাব পড়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন : বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল (ডিজেল), গ্যাস ও কয়লার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তেল ও গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানির অভাবে শনিবার পায়রা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ ছিল। অন্য কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় লোডশেডিং বাড়িয়েছে সরকার। এতে দেশের প্রায় সব শিল্প ও সেবা খাতে প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে আবাসিক ভবনগুলোতে জেনারেটর চালানো হয়। এই জেনারেটরের মাধ্যমে এসি, ফ্যান এবং লিফট পর্যন্ত চলে। কিন্তু তেলের সংকটে সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে।

পরিবহণ খাত : পরিবহণ খাতে বাস, ট্রাক, লঞ্চ, জাহাজ, বিমান এবং প্রাইভেটকার সবই জ্বালানিনির্ভর। প্রাইভেটকার ও বিমান ছাড়া সব যানবাহন ডিজেলে চলে। কিন্তু তেলের সংকটে বর্তমানে এর কোনো কিছুই স্বাভাবিকভাবে চলছে না। এতে পণ্য পরিবহণে ভাড়া বেড়েছে। পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজ এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রভাব পড়েছে। এছাড়াও তেল সংকটের কারণে রাস্তায় প্রাইভেটকারের সংখ্যাও কমে গেছে। এতে পরিবহণের সঙ্গে জড়িত ড্রাইভার, হেলপার এবং অন্যান্য কর্মচারীদের আয়ও কমে যাচ্ছে।

শিল্প খাত : দেশে শিল্প উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি জ্বালানির প্রয়োজন হয়। গার্মেন্ট, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, স্টিল, সিরামিকসহ সব কারখানায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ডিজেল লাগে। কিন্তু গত এক মাসে কোনো খাতেই পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রপ্তানি এবং শ্রমিকদের বেতন ভাতা। কারণ পণ্য উৎপাদন না হলে রপ্তানি কমবে। এতে আয় কমবে শ্রমিকদের। সামগ্রিকভাবে এটি অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে।

কৃষি : জ্বালানি চাহিদার অন্যতম খাত কৃষি। সেচপাম্প, ট্রাক্টর, ধান মাড়াই এবং পরিবহণসহ সবকিছুতেই জ্বালানি লাগে। এক্ষেত্রে একদিকে সরাসরি ডিজেল এবং অপরদিকে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। কিন্তু বর্তমানে সরবরাহ কম। ফলে আগামীতে কৃষি উৎপাদনে এর প্রভাব পড়বে। এতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকিতে পড়তে পারে।

বাণিজ্য : আমদানি-রপ্তানিসহ সব ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে জ্বালানি প্রয়োজন। জাহাজ পরিবহণ, কনটেইনার, বন্দর কার্যক্রমের জন্য জ্বালানির বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সংকটে এ খাতগুলো অনেক ক্ষতিগ্রস্ত।

গৃহস্থালি খাত : বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক বাতি, ফ্যান, জেনারেটর, এসি, ফ্রিজ, ওভেন সবকিছুই চালাতে বিদ্যুতের প্রয়োজন। এছাড়া রান্নায় প্রয়োজন গ্যাস ও বিদ্যুৎ। সাম্প্রতিক সংকটে গৃহস্থালির এ খাতেও প্রভাব পড়েছে।

সেবা খাত : দেশের সেবা খাতগুলোর অন্যতম হাসপাতাল, ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) অন্যতম। বিদ্যুৎ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠান চলা প্রায় অসম্ভব। আর জ্বালানি সংকটে খাতটিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

নির্মাণ শিল্প : দেশের নির্মাণ শিল্প খাতের মধ্যে রড-সিমেন্ট, ইটভাটা এবং নির্মাণ যন্ত্রপাতি অন্যতম। এর সবকিছুই জ্বালানিনির্ভর। চলমান সংকটে এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

পর্যটন ও বিনোদন : দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত পর্যটন। এ খাতের সঙ্গে আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, বিনোদন পার্ক ও সামগ্রী সম্পৃক্ত। চলমান জ্বালানি সংকটে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে চলছে না।

টেলিযোগাযোগ ও প্রযুক্তি : মোবাইল টাওয়ার, নেটওয়ার্ক, ডাটা সেন্টারসহ এ খাতের সব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

জ্বালানি তেলের দামে বড় পতন

জ্বালানি তেলের দামে বড় পতন

নিষেধাজ্ঞা এড়াতে মিয়ানমারের নতুন কৌশল, ডিজেল বলে আনছে ইরানি জেট ফুয়েল

নিষেধাজ্ঞা এড়াতে মিয়ানমারের নতুন কৌশল, ডিজেল বলে আনছে ইরানি জেট ফুয়েল

বিশ্ববাজারে ডলারের চাপে তেল-স্বর্ণে অস্থিরতা

বিশ্ববাজারে ডলারের চাপে তেল-স্বর্ণে অস্থিরতা

বিশ্ববাজারে তেলের দামে পতন

বিশ্ববাজারে তেলের দামে পতন

বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় লাফ

বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় লাফ

৪০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পথে রুশ ট্যাংকার

৪০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পথে রুশ ট্যাংকার

আরও পড়ুন

আওয়ামী আমলের আমলনামা : তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন স্থানীয় সরকারে অবিশ্বাস্য দুর্নীতি

স্থানীয় সরকারে অবিশ্বাস্য দুর্নীতি

৪৬ বছর পর ফিরছে গ্রাম সরকার

৪৬ বছর পর ফিরছে গ্রাম সরকার

টোকিওতে ব্যস্ত দিন কাটালেন প্রধানমন্ত্রী

টোকিওতে ব্যস্ত দিন কাটালেন প্রধানমন্ত্রী

আইএমএফ’র পূর্বাভাস মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম