বাংলাদেশের ওপর নতুন শুল্কারোপ
শুল্ক প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার তাগিদ
‘জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের’ ব্যাখ্যা জানতে চান ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক কারণে বাংলাদেশের পোশাক খাত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে রপ্তানি খাতের জন্য তা ক্ষতিকর হতে পারে। সরকারের উচিত, নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চাওয়া। একই সঙ্গে কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শুল্ক আরোপ করা থেকে বিরত রাখা। বুধবার যুগান্তরকে দেওয়া তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদরা এসব কথা বলেছেন।
মঙ্গলবার ‘জোরপূর্বক শ্রমে’ উৎপাদিত পণ্যে নিষেধাজ্ঞা আরোপে ব্যর্থ হওয়ায় বাংলাদেশসহ ৬০টি দেশের পণ্যে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির কার্যালয় (ইউএসটিআর)। এ তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়া আরও আছে-ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও যুক্তরাজ্য।
ইউএসটিআরের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্যে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। যেসব অর্থনীতি এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করেনি, তাদের জন্য শুল্কের হার হবে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশকে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হতে পারে। বাকি ৪৫টি দেশের ক্ষেত্রে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে দেশের রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এমনিতেই এ খাত বর্তমানে দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা চাপের মুখে রয়েছে। তারা সরকারকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ আপিলের প্রস্তুতি নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক শ্রম নির্মূলে আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে সমর্থন করে আসছে। শ্রমমান ও এর প্রয়োগ আরও শক্তিশালী করতে কাজ করছে। তাই বাংলাদেশের উচিত ইউএসটিআরের লক্ষ্যকে সমর্থন করা। তবে তাদের প্রস্তাবিত কাঠামোর মৌলিক ধারণাগত ভিত্তিকে চ্যালেঞ্জ করা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের উচিত দ্বিমুখী কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করা। ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয় জোরদারের পাশাপাশি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বজায় রেখে একটি বিশ্বাসযোগ্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার রোডম্যাপ উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ নিটপণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নতুন শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপট পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ কীভাবে দেবে তা আরও আলোচনার প্রয়োজন আছে। এ বিষয়ে মার্কিন দূতাবাসের কাছে সরকারের ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। অতীতে দেখা গেছে এ ধরনের শুল্ক দিয়ে নতুন কোনো ইস্যুতে নেগোশিয়েশন করা হয়। নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বস্ত্র আমদানিতে পরোক্ষভাবে কোটা পদ্ধতি চালুর চিন্তা করছে হয়তো। এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধি-বিধানের পরিপন্থি।
তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংগঠন বিজিএপিএমইএর সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, কী কারণে বাংলাদেশের ওপর এমন শুল্ক আরোপ করা হলো, তার ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত। তা ছাড়া জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত কিনা তা কিভাবে শনাক্ত করা হবে, তারও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা জরুরি। এ ধরনের কোনো স্বীকৃত মেকানিজম আছে কিনা তা খুঁজে দেখা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, কোনো দেশ জোরপূর্বক শ্রম দিয়ে পণ্য উৎপাদন করলে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ব্যবস্থা না নিয়ে কেন বিকল্প উপায়ে অন্য দেশের ঘাড়ে শুল্ক আরোপ করছে, বাংলাদেশ সরকারের উচিত এ বিষয়ে জানতে চাওয়া।
স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়াসহ নানা কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে অতিরিক্ত শুল্কের বোঝা রপ্তানি খাতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তবে প্রস্তাবিত শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর ওপরও একই ব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে। সে ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্কহার বাংলাদেশকে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রাখতে পারে। তবুও অতিরিক্ত যেকোনো শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাওয়াই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশকে যথাযথ কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আপিল ও আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত কোনো শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা দূর করা যায়। কারণ বাংলাদেশে জোরপূর্বক শ্রমের কোনো প্রমাণ নেই। ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পরও এ ধরনের পদক্ষেপকে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শোভন ইসলাম বলেন, ইউএসটিআরের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে-বাংলাদেশ জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি। এটা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত কঠিন কাজ, কারণ বাংলাদেশকে অনেক দেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
