যুগান্তরকে এসবিবিআইএফ’র প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান
অপপ্রচার সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত করছে
Advertisement
মনির হোসেন
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। এর মধ্যে ধর্মীয়, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক, কৌশলগত অংশীদারত্ব এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়) আসছে দেশটি থেকে। এছাড়া রপ্তানি, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন জোট ও ফোরামে দুই দেশের শক্তিশালী অংশীদারত্ব রয়েছে। এই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে দুই দেশই চেষ্টা করছে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত ঘটনা না জেনে বিভিন্ন অপপ্রচার দুই দেশের সম্পর্ক বাধাগ্রস্ত করছে। যুগান্তরের সঙ্গে আলাপকালে সৌদি-বাংলাদেশ বিজনেস অ্যান্ড ইনভেস্টরস ফোরামের (এসবিবিআইএফ) প্রেসিডেন্ট আবদুর রহমান এসব কথা বলেন। তার মতে, আগামী ২০৩৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য মেগা প্রকল্পে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ রয়েছে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যুগান্তরের বিজনেস এডিটর মনির হোসেন।
যুগান্তর : সম্প্রতি সৌদিতে দুই প্রবাসী বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা কী?
আবদুর রহমান : দেশটিতে নজরুল ইসলাম ও সিতি আক্তার (সুইটি) নামের দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তারা সৌদি আরবের ‘আল মাজাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসাবে কাজ করতেন। দুজনকেই ২০২৩ সালে আটক করা হয়েছিল। তারা পবিত্র হেরেম শরিফের এরিয়াতেই অবৈধ যৌন অপরাধে জড়িয়েছিলেন, যা সৌদি আইনে চরম অপরাধ। শুরুতে বাংলাদেশি মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে তারা স্বামী-স্ত্রী। কিন্তু তা সত্য নয়। তিন বছর ধরে তাদের বিচার চলেছে। এ সময় প্রতি সপ্তাহে ৮ মিনিট তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সৌদি সরকার তাদের বিনামূল্যে আইনজীবী দিয়েছে। অর্থাৎ পুরো ঘটনা পরিবার জানে। কিন্তু দণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশে থাকা তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কাউকে জানানো হয়নি। বিষয়টি সৌদিতে নিযুক্ত তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত কাজী ইমদাদুল হকও জানতেন। সম্প্রতি তিনি কানাডায় পালিয়ে গেছেন। পরে আপিল আদালতসহ বিভিন্ন বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। সৌদিতে সবকিছু স্বচ্ছ। লুকোচুরির কোনো বিষয় নেই। ইন্টারনেটে শিরñেদের যে ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, তা এই দুই বাংলাদেশির নয়। বিমানবন্দরে কফিন নিয়ে যাওয়ার যে ভিডিও প্রচার করা হয়েছিল, সেটিও সত্য নয়। তার মতে, প্রবাসীরা বড় ধরনের সংকটে পড়লে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দূতাবাস, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় অথবা নিজ দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত।
যুগান্তর : সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বর্তমানে সে দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের চিত্র কেমন দেখছেন?
আবদুর রহমান : দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। এর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। কারণ সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের আত্মিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন যুগ যুগ ধরে বিস্তৃত। স্বাধীনতা অর্জনের পর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে সৌদির শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের যাত্রা শুরু। আজ তা একটি বিশাল অর্থনীতির ভিত্তিমূলে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক জনশক্তি রপ্তানির গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হয়েছে।
যুগান্তর : আগে তো প্রবাসীদের ব্যবসা নিয়ে নানা জটিলতা ছিল। এখন পরিস্থিতি কী?
আবদুর রহমান : বর্তমানে সৌদিতে বৈধভাবে ৩৫ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত। যাদের মধ্যে প্রায় দেড় লাখ নারী শ্রমিক। দেশের অর্থনীতিতে এই প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের অবদান অতুলনীয়। সৌদি আরব থেকে আসা এই বৈদেশিক মুদ্রা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী করছে। তবে জনশক্তি খাতের এই সম্ভাবনাকে ধরে রাখতে ‘ফ্রি ভিসা’ বা ব্যক্তিগত ভিসার নামে চলা অনিয়ম রোধ করা জরুরি। দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিটি ভিসা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হলে কর্মীরা যেমন প্রতারণা থেকে বাঁচবেন। তেমনি দেশ উপকৃত হবে। দেশটিতে বর্তমানে ভিশন-২০৩০ ও অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। প্রকল্পগুলো হবে বিশ্বমানের। পাশাপাশি ২০৩৪ সালে দেশটিতে ফুটবল বিশ্বকাপের আসর বসবে। এজন্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। এই কর্মযজ্ঞে দক্ষ ও কারিগরিভাবে প্রশিক্ষিত বাংলাদেশিদের কাজের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, এর আগে সৌদিতে প্রবাসীদের নিজস্ব নামে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ ছিল না। স্থানীয় ‘কফিল’ বা স্পন্সরের ওপর নির্ভর করতে হতো। তবে চার বছর আগে বিদেশি মালিকানায় ব্যবসার সুযোগ দিয়েছে দেশটির সরকার। বর্তমানে বহু বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ইনভেস্টর লাইসেন্স নিয়ে স্বাধীনভাবে ব্যবসা করছেন। এমনকি অনেক প্রবাসী তাদের মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ সৌদি সরকারের মর্যাদাপূর্ণ ‘প্রিমিয়াম রেসিডেন্স (গোল্ড কার্ড) অর্জন করেছেন। এই কার্ডের মাধ্যমে তারা পরিবারসহ স্থায়ীভাবে বসবাস, সম্পত্তি কেনা এবং স্বাধীন ব্যবসা বা চাকরি করার আইনি অধিকার পেয়েছেন।
যুগান্তর : দেশটিতে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার কেমন? এখানে কি কোনো বড় বাধা রয়েছে?
আবদুর রহমান : বাংলাদেশের কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং তৈরি পোশাকের জন্য সৌদি আরব একটি অত্যন্ত লাভজনক বাজার। বাংলাদেশি প্রায় ২০টি ব্র্যান্ডের মসলা, বিস্কুট ও স্ন্যাক্স সৌদিসহ মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে শীর্ষস্থান দখল করেছে। একসময় কনজুমার ফুডের এই বাজার পাকিস্তান বা ভারতের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তবে কিছু অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও সিন্ডিকেটের খামখেয়ালিপনা রপ্তানি বাণিজ্যে বাধা সৃষ্টি করছে। যেমন-নামসর্বস্ব কিছু অ্যাসোসিয়েশনের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে পান রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ভারতীয় পান সৌদির বাজার দখলের চেষ্টা করছে। একইভাবে সুগন্ধি চাল (যেমন কালোজিরা ও চিনিগুড়া চাল) রপ্তানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এতে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং ভারতের কাছে বাজার হারাচ্ছেন। এই খাতগুলোকে বাঁচাতে অপ্রয়োজনীয় সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর তদারকি ও নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত জরুরি।
