Logo
Logo
×
   

প্রথম পাতা

সুইস ব্যাংকে বাড়ছে পাচারের টাকা

তথ্য পায় ভারত-পাকিস্তান পিছিয়ে বাংলাদেশ

মনির হোসেন

মনির হোসেন

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তথ্য পায় ভারত-পাকিস্তান পিছিয়ে বাংলাদেশ

গোপনীয়তার দেওয়াল ভেঙে সুইস ব্যাংক থেকে নিজ দেশের নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করছে ভারত-পাকিস্তানসহ বিশ্বের শতাধিক দেশ। এই তথ্য ব্যবহার করে দেশগুলো অর্থ পাচার ও করফাঁকি রোধ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এনেছে। কিন্তু এক্ষেত্রে এখনো অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। ফলে দেশ থেকে অর্থ পাচার ক্রমেই বাড়ছে। মাত্র এক বছরেই ব্যাংকটিতে বাংলাদেশিদের জমানো অর্থের পরিমাণ ৪১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুইস ব্যাংক থেকে ওইসব দেশ দুই পদ্ধতিতে পাচারের তথ্য নিচ্ছে। প্রথমত, কোনো কোনো দেশ সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি করেছে। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। আর যাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নেই, তারা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা ওইসিডির (অরগানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) মানদণ্ড অনুসরণ করে তথ্য নিচ্ছে। এই দুই প্রক্রিয়ায় ২০২৩ সাল পর্যন্ত সুইস ব্যাংক থেকে ৩৬ লাখ তথ্য নিয়েছে দেশগুলো। কিন্তু বাংলাদেশ এই দুটির কোনোটিতেই নেই।

এদিকে বৃহস্পতিবার সুইস কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে, দেশটির ব্যাংকগুলোতে মোট আমানত কমছে। যেসব দেশ সুইজারল্যান্ড থেকে তথ্য পায়, ওইসব দেশের আমানতও কমছে। বিপরীতে বাংলাদেশসহ অন্ধকারে থাকা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জমা অর্থের পরিমাণ বাড়ছে। সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো পদক্ষেপও নেই।

জানতে চাইলে মানি লন্ডারিং নিয়ে কাজ করা সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ)’ প্রধান ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ মামুন যুগান্তরকে বলেন, সুইস ব্যাংক কিংবা সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাক্ষিক কোনো চুক্তি নেই। অন্যদিকে ‘ওইসিডি’ একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। এই সংস্থাটি আয়কর সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করে। বিশ্বের অনেক দেশ এই সংস্থার সদস্য। আর এই সংস্থার সদস্যরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুইস ব্যাংকের তথ্য পায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ ওই সংস্থার সদস্য নয়। তিনি বলেন, এই সংস্থার সদস্য হওয়া সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দেখছে। কেন এখনো বাংলাদেশ ওইসিডির সদস্য হতে পারল না বা মানদণ্ড অনুসরণ করতে পারছে না, এনবিআর তা বলতে পারবে।

বৃহস্পতিবার সুইস ব্যাংক প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৫ সাল শেষে দেশটির বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৮৩ কোটি ৪১ লাখ সুইস ফ্র্যাংক। প্রতি ফ্র্যাংক ১৫২ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ১২ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা। আর এক বছরে আমানত বেড়েছে প্রায় ৩ হাজার ৮শ কোটি টাকা। আগের বছরের চেয়ে এই আমানত ৪১ শতাংশ বেশি। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। কিন্তু আলোচ্য সময়ে সুইস ব্যাংকে বিশ্বের দেশগুলোর মোট আমানত কমেছে।

জানা গেছে, উন্নত অনেক দেশ ওইসিডির মাধ্যমে সুইস ব্যাংক থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। ওইসিডি মূলত উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর একটি নীতি-নির্ধারণী আন্তর্জাতিক সংস্থা। ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার সদর দপ্তর প্যারিসে। সংস্থার ৩৮টি সদস্য দেশ সুইস ব্যাংক থেকে সহজে তথ্য পায়। এর বাইরে ৬৩টি দেশ ওইসিডির আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ‘কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড’ (সিআরএস) এবং ‘অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন’ (এইওআই) কাঠামো অনুসরণ করে সুইস ব্যাংক থেকে তথ্য নেয়। এই দুই প্রক্রিয়ায় ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১০১টি দেশ সুইস ব্যাংক থেকে ৩৬ লাখ তথ্য নিয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব আইন ‘ফরেন অ্যাকাউন্ট ট্যাক্স কমপ্লায়েন্স অ্যাক্টে’র (এফএটিসিএ) আওতায় ২০১৪ সাল থেকে সুইস ব্যাংকে থাকা মার্কিন নাগরিকদের অর্থের তথ্য নিচ্ছে। আবার ২০২৪ সালে দুই দেশের সরকার পর্যায়ে পারস্পরিক তথ্য বিনিময়ের জন্য নতুন চুক্তি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অনেক দেশ সুইস ব্যাংক থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সাইপ্রাস, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, গ্রিস, হাঙ্গেরি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, লুক্সেমবার্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া, স্পেন, সুইডেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং, ভারত, পাকিস্তান, তুরস্ক, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া।

এক সময় সুইস ব্যাংকের তথ্য ছিল অতি গোপনীয়। কিন্তু ২০০৮ সালে বিশ্বমন্দার পর কর ফাঁকি এবং কালোটাকা রোধে চাপ বাড়ায় ওইসিডি। এর ফলে চালু হয় সিআরএস। বাংলাদেশ ওইসিডির সিআরএস কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত নেই। তবে জুলাই জাতীয় সনদের ৭৪ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে-দেশে-বিদেশে আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করবে। আর এটি বাস্তবায়নে সব ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেবে। জুলাই সনদে স্বাক্ষর করা সব রাজনৈতিক দল এই প্রস্তাবে একমত হয়েছে।

সুইস ব্যাংকের মোট আমানত কমছে : এদিকে তথ্য প্রকাশের পর থেকে সুইস ব্যাংকে মোট আমানতের স্থিতি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১ সালে দেশটির ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৪৭ কোটি সুইস ফ্র্যাংক। পরের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালে তা ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৩৯ কোটিতে নেমে এসেছে। ২০২৩ সালে আরও কমে ৯৮ হাজার ৩৪৫ কোটি, ২০২৪ সালে ৯৭ হাজার ৭১২ কোটি এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে আমানত আরও কমে ৮৯ হাজার ৬৩৮ কোটি ফ্র্যাংকে নেমেছে।

দেশভিত্তিক হিসাবেও কমছে : ওইসিডির আওতায় কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড ফলো করে যেসব দেশ তথ্য পাচ্ছে, ইতোমধ্যে সুইস ব্যাংকে তাদের আমানত কমে আসছে। যেমন ২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের আমানত ছিল ৩৭ হাজার ৫২০ কোটি ফ্র্যাংক। পরের বছর তা কমে ১৯ হাজার ৯৪৩ কোটি ফ্যাংকে নেমেছে। এরপর ২০২৩ সালে ২৫ হাজার ৪৬৯ কোটি, ২০২৪ সালে ২১ হাজার ২৩৫ কোটি এবং ২০২৫ সালে ১৮ হাজার ৩৯০ কোটি ফ্র্যাংকে নেমেছে। এমনকি এশিয়ার দুর্বল দেশ পাকিস্তানের আমানতও ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২১ সালে সুইস ব্যাংকে পাকিস্তানের আমানত ছিল ৭০ কোটি ফ্র্যাংক। ২০২২ সালে ৩৮ কোটি, ২০২৩ সালে ২৮ কোটি, ২০২৪ সালে ২৭ কোটি এবং ২০২৫ সালে ২৩ কোটি সুইস ফ্র্যাংকে নেমেছে। ভারতের আমানত ২০২৪ সালে ছিল ৩৫০ কোটি ফ্র্যাংক। ২০২৫ সালে তা ৩২৩ কোটিতে নেমেছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .