বিশ্ব বসতি দিবস আজ
আবাসনের চাপে পিষ্ট মানুষ
সিটি করপোরেশনে ৭১ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায়, ব্যয় মেটাতে নাভিশ্বাস * দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৫০ লাখ মানুষ * সব মানুষের সাশ্রয়ী আবাসন নিয়ে ভাবতে হবে-ড. আদিল মুহাম্মদ খান
Advertisement
বসতবাড়ি না থাকায় ফুটপাতে পলিথিন টানিয়ে বসবাস করছেন ছিন্নমূল বৃদ্ধা। রোববার মতিঝিল এজিবি কলোনির সামনে -রফিকুল ইসলাম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মিরপুর-১২ নম্বরের বাসিন্দা সালমান হোসেন। স্ত্রীসহ দুই কক্ষের ভাড়া বাসায় থাকেন। কর্মজীবী এই দম্পতির মাসিক আয় ৬০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১৮ হাজার টাকা চলে যায় বাসা ভাড়ায়। অর্থাৎ আয়ের ৩০ শতাংশই খরচ হয় ঘর ভাড়া মেটাতে। এর বাইরে রয়েছে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যাতায়াত খরচ। সালমানের ভাষ্য-প্রতি বছর এক হাজার টাকা করে ভাড়া বাড়ান বাড়ির মালিক। আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সংসারের হিসাব মেলানো কঠিন হচ্ছে।
অন্যদিকে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে এক কক্ষের ঘরে থাকেন গৃহকর্মী রোকসানা খাতুন। মাসে ঘর ভাড়া পাঁচ হাজার টাকা। একটি বাতি ও পাখার বিদ্যুৎ বিল বাবদ দিতে হয় ৬০০ টাকা। পানির জন্য ৩০০-৪০০ টাকা এবং এক চুলার গ্যাসের জন্য আরও ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে তার মাসিক খরচ প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা। এরপর মেটাতে হয় খাবার, চিকিৎসা ও যাতায়াত খরচ। শুধু সালমান বা রোকসানাই নন, বড় শহরগুলোতে বসবাসকারী ৭১ শতাংশ ভাড়া-নির্ভর পরিবারকে আবাসন ও নাগরিক সেবার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এতে তাদের আয়ের বড় অংশই ফুরিয়ে যায়। এমন বাস্তবতায় ‘সবার জন্য উপযুক্ত আবাসন’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব বসতি দিবস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, কর্মস্থল, চিকিৎসাকেন্দ্র ও মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে সাশ্রয়ী আবাসন গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের আবাসন নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাণীতে তিনি বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণের লক্ষ্যে সরকার দেশের প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করছে। নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জলবায়ু-সহনশীল ও টেকসই নগর গড়ে তোলার পাশাপাশি সবার জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বড় শহরে ভাড়া-নির্ভরতা বেশি : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর নগরাঞ্চল প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় সাধারণ খানার (পরিবার) মাত্র ২৬ দশমিক ৯০ শতাংশ নিজেদের বাসগৃহে বসবাস করে। আর ভাড়া বাসায় বসবাসকারী পরিবারের হার ৭০ দশমিক ৮২ শতাংশ। অন্যদিকে পৌরসভাগুলোতে নিজস্ব বাসায় থাকে ৬৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ পরিবার এবং ভাড়া বাসায় থাকে ৩০ দশমিক ৩২ শতাংশ। সিটি করপোরেশন এলাকার ৫৭ দশমিক ২৫ শতাংশ খানা ভাড়া বাসায় থাকলেও অন্যত্র তাদের নিজস্ব বাসগৃহ রয়েছে। আর ১৩ দশমিক ৫৭ শতাংশের অন্যত্রও নিজস্ব বাসগৃহ নেই। ফলে ভাড়া বাসায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর আবাসনের পরিস্থিতি এক নয়। ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের এই তথ্য ২০২২ সালের শুমারির।
বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২ বলছে, শহরের পরিবারগুলোর মোট ভোগব্যয়ের ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশই যায় আবাসন ও বাড়িভাড়া খাতে। গ্রামে এ হার ৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং জাতীয়ভাবে ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ। তবে এটি সব পরিবারের মোট ভোগব্যয়ের অনুপাত নয়। শুধু ভাড়াটে পরিবারের আয়ের কত অংশ ভাড়ায় খরচ হয়, তার হিসাব নয়।
আবাসন শুধু চার দেয়ালের ঘর নয় : জাতিসংঘের মানববসতি কর্মসূচি ইউএন-হ্যাবিট্যাটের মতে, উপযুক্ত আবাসনের সঙ্গে ব্যয় বহনের সক্ষমতা, মৌলিক সেবা, বসবাসের উপযোগিতা, দখলস্বত্বের নিরাপত্তা ও উপযুক্ত অবস্থানের সম্পর্ক রয়েছে। কর্মস্থল, বিদ্যালয়, চিকিৎসাকেন্দ্র ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধায় প্রবেশাধিকারও এর অন্তর্ভুক্ত।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে আবাসনের বিষয়টি মূলত বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল। সরকারি অর্থায়ন বা ঋণসুবিধাও বেশ জটিল হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধান মিলছে না। বিশ্বের অন্যান্য দেশে সব মানুষের আবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকারের দায়বদ্ধতা থাকে। সুন্দরভাবে বসবাস নিশ্চিত করতে আমাদেরও সব মানুষের সাশ্রয়ী আবাসন নিয়ে ভাবতে হবে।
দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৫০ লাখ মানুষ : আবাসনের অনিশ্চয়তা রয়েছে দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনেও। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে পরিচালিত জাতীয় মূল্যায়নে দেশে দুর্যোগের কারণে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের আনুমানিক সংখ্যা ৪৯ লাখ ৫৫ হাজার ৫২৭। তাদের ৮৫ শতাংশ ইউনিয়ন এলাকায় বসবাস করেন। বাস্তুচ্যুত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাসন নিশ্চিত করাও বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

