মধ্যপ্রাচ্য থেকে এলএনজি আমদানি
স্পট মার্কেট পরিহারে ৩ মাসে সাশ্রয় হাজার কোটি টাকা
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কারসাজিসহ বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগে সরকার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত বদল করেছে। এর পরিবর্তে নানামুখী তৎপরতার কারণে ব্যয়সাশ্রয়ী স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদে চুক্তির আওতায় ডিসেম্বর পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করে ফেলেছে সরকার। তিন মাসে নিশ্চিত হওয়া প্রায় ২৯টি এলএনজিবাহী কার্গোর মধ্যে আগে বাড়তি দামে স্পট মার্কেট থেকে কেনা ৩টি কার্গোও রয়েছে। স্পট মার্কেট এড়ানোয় এই তিন মাসে সরকারের সাশ্রয় হচ্ছে এক হাজার কোটি টাকার বেশি। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান রোববার যুগান্তরকে বলেছেন, ডিসেম্বর পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি না কেনার চেষ্টা চলছে। এটি করা গেলে দেশের অনেক টাকা সাশ্রয় হবে। তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত এখনো কয়েকটি কার্গো কেনা বাকি আছে। সেগুলোও স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদে কেনার চেষ্টা চলছে।
এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জির একটি কার্গো চলতি মাসেই আসছে। এই এক কার্গোতে সরকারের সাশ্রয় হচ্ছে ৫৫৮ কোটি টাকার বেশি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই অক্টোবর মাসে ১০টি কার্গো আমদানি এবং রিগ্যাসিফিশনসহ অন্যান্য খরচ হবে প্রায় ৯৩ কোটি ডলার বা ১১ হাজার কোটি টাকার মতো। এদিকে আগামী বছর কাতার এনার্জি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় (সাশ্রয়ী) ২৬টি কার্গো দিতে রাজি হয়েছে। এছাড়া স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে ২০২৭ সালে স্পট মার্কেট থেকে তেমন কোনো কার্গো কিনতে হবে না। বড়জোর ৩-৪টি কার্গো স্পট থেকে কিনতে হতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হলে এলএনজি নিয়ে বাংলাদেশকে আরও বড় মাশুল দিতে হবে। গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বছরে ১১২ থেকে ১১৪টি কার্গো আমদানি করে থাকে পেট্রোবাংলা।
স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় জেকেএম (জাপান-কোরিয়া মার্কার) সূচকে বাংলাদেশ প্রতি ইউনিট এলএনজি কিনছে ২৫ ডলারে। সেখানে স্পট মার্কেট থেকে পেট্রোবাংলাকে কিনতে ব্যয় করতে হচ্ছে ২৯ ডলার পর্যন্ত।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, স্পট মার্কেট ঘিরে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে। এ নিয়ে ধারাবাহিক রিপোর্ট প্রকাশ করে দৈনিক যুগান্তর। আর এতেই টনক নড়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে। পরে স্পট মার্কেট এড়িয়ে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি কেনার নির্দেশ আসে শীর্ষ পর্যায় থেকে। এরপর জ্বালানি বিভাগের সচিব জিয়াউল হক বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সমঝোতা এবং কথা বলতে একাধিক কমিটি করে দেন। সেই কমিটির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশের উপকারে এসেছে। এখন স্পট মার্কেট থেকে বের হতে পারছে বাংলাদেশ।
অক্টোবরে অদ্ভুত চিত্র : চলতি মাসে ১০টি কার্গো আমদানি করছে পেট্রোবাংলা। এর মধ্যে ৩টি স্পট মার্কেটের, যেগুলো সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে কেনা। স্পট মার্কেট থেকে প্রতি ইউনিট ২৮ দশমিক ০৩০০ ডলারে কেনা বিপি সিঙ্গাপুরে কার্গো ২ অক্টোবর, প্রতি ইউনিট ২৬ দশমিক ৬৬৮৮ ডলারে কেনা বিটলের কার্গো আসবে আজ, স্পট মার্কেট থেকে ২৮ দশমিক ৯৫ ডলারে কেনা টোটাল এনার্জির এবং একই কোম্পানি ১১ অক্টোবর স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় ৩ ডলার কমে প্রতি ইউনিট ২৫ দশমিক ২৬৮০ ডলারের কার্গোও আসছে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, টোটাল এনার্জির চিত্র দেখলেই স্পট মার্কেটে বড় মাশুলের নজির মিলছে। বিষয়গুলো তদন্ত করলে অনেক কিছু বের হয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এছাড়া ১৫ অক্টোবর গানবোর দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ২৫ দশমিক ২৯৫৫ ডলারে, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরামকোর কার্গো আসবে ১৮ অক্টোবর, যার দাম দিতে হবে প্রতি ইউনিট ২৫ দশমিক ৩৫ ডলার। ২১ অক্টোবর আসবে দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার এনার্জির কার্গো। এরপর আবারও সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় (জেকেএম সূচকে) টোটাল এনার্জিসের কার্গো আসছে ২৪ অক্টোবর, দাম পড়ছে ২৫ দশমিক ২৬ ডলার। একই নীতিতে ৩০ অক্টোবর টোটাল আরও এক কার্গো এলএনজি দিচ্ছে, দাম পড়ছে ২৫ দশমিক ২৬ ডলার। এর আগে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় গানবোর এক কার্গো এলএনজি দিচ্ছে। দাম দিতে হচ্ছে ২৫ দশমিক ২৯ ডলার।
এক কার্গোতেই ৫০০ কোটি টাকার বেশি সাশ্রয় : মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে কাতার, ওমান এবং এক্সিলারেট এনার্জি কম দামের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধর থাকায় এলএনজির কার্গো বের হতে পারছে না। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে গিয়ে বাংলাদেশ বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক অনুরোধের পর কাতার এনার্জি ২৬ অক্টোবর এক কার্গো এলএনজি দিতে রাজি হয়েছে। যার প্রতি ইউনিট মূল্য পড়ছে মাত্র ১২ দশমিক ০৯২২ ডলার। এই কার্গোর বিল আসবে প্রায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। আর স্পট থেকে নিলে এই কার্গোর বিল আসত ৯ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের মতো। জেকেএম সূচকে পেট্রোবাংলা প্রতি কার্গোর বিল দিচ্ছে ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
স্পট থেকে বের হয়ে কত লাভ হলো : স্পট মার্কেটের বদলে আপাতত জেকেএম সূচকে বাংলাদেশকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। এতে করে প্রতি ইউনিট গ্যাস কমপক্ষে ২ ডলার কম পড়ছে। এই ২ ডলার কম হওয়ার কারণে প্রতি কার্গোতে সাশ্রয় হচ্ছে ৬৪ লাখ ৪০ হাজার ডলারের মতো। ডিসেম্বরে তিনটি স্পট খালি আছে। সেগুলো স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় কার্গো কেনার সমঝোতা চলছে। আগে প্রতিমাসে কমপক্ষে ৫-৬টি স্পট মার্কেট থেকে কার্গো কেনা হয়েছে। এই হিসাবে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত আর স্পট মার্কেট থেকে কোনো কার্গো কিনতে না হলে সরকারের সাশ্রয় হবে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এর আগে দৈনিক যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখানো হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে ৩৪ কার্গো এলএনজি কিনেছে পেট্রোবাংলা।
