মাথাপিছু ঋণ ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আজ যে শিশুটি জন্ম নেবে, তার মাথায় ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা ঋণের দায় চাপবে। কারণ, বর্তমানে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মাথাপিছু এই পরিমাণ ঋণ রয়েছে। তবে এ ঋণ ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্র পরিচালনায় বিভিন্ন সময়ে সরকার দেশ-বিদেশ থেকে যে ঋণ নিয়েছে, তার সর্বশেষ সমষ্টি। আবার নতুন অর্থবছরের (২০২৬-২৭) বাজেটে জনপ্রতি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাথাপিছু বরাদ্দের চেয়ে ঋণ প্রায় আড়াই গুণ। এ কারণে চলতি বাজেটেও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দের খাত রাখা হয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমানে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধ করছে সরকার। এর মানে হলো, দেশ এক ধরনের ঋণের ফাঁদে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এই অতিরিক্ত ঋণ নিয়েছিল। উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তমান সরকারকে ঋণের দায় নিতে হচ্ছে। এটি অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে পর্যায়ক্রমে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে দেশকে বিনিয়োগনির্ভর করা হবে।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সরকার ইতোমধ্যে ঋণের ফাঁদে পড়েছে। এখান থেকে উত্তরণ জরুরি। কারণ, বর্তমানে নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে। এটি একটি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়। তিনি বলেন, আগের সরকার ঋণ নিয়ে ঘি খেয়েছে। এখন দায় পরিশোধ করতে হচ্ছে। ঋণের মাধ্যমে সব কাজ করতে পারলে পৃথিবীর সব দেশ এই কাজ করত। আগে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে উন্নয়ন করত, পরে সব ঠিক হয়ে যেত। তার মতে, পরিস্থিতি যেখানে দাঁড়িয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণ এত সহজ নয়। এ অবস্থার উত্তরণে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের এতগুলো মন্ত্রণালয় দরকার নেই। মন্ত্রণালয় কমালে সরকারের পরিচালন ব্যয় কিছুটা হলেও কমবে।
সোমবার সংসদে দেওয়া অর্থমন্ত্রীর তথ্য অনুসারে বর্তমানে সরকারের ঋণ ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে দেশীয় ঋণ ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা এবং বিদেশি ঋণ ৯ লাখ ৪৯ হাজার ১৮১ কোটি টাকা। এই পরিমাণ অর্থ ৬০টির বেশি পদ্মা সেতুর নির্মাণ ব্যয়ের সমান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যা ১৭ কোটি ২৯ লাখ। সে হিসাবে মোট ঋণকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু ঋণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে দেশি ঋণ ৬৯ হাজার ১০০ এবং বিদেশি ঋণ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা। অর্থাৎ কোনো পরিবারে চারজন সদস্য থাকলে ওই পরিবারে সরকারি ঋণের দায় প্রায় ৫ লাখ টাকা। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রাষ্ট্রের আর্থিক দায় কতটা বড় আকার ধারণ করেছে এবং ভবিষ্যতে সেই ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে সরকারের ওপর কতটা চাপ তৈরি হবে।
অন্যদিকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশে বেসরকারি খাতে ঋণের স্থিতি ১৮ লাখ ২৪ হাজার কোটি টাকা। যেহেতু বেসরকারি খাতের ঋণের দায় শুধু ঋণগৃহীতা ব্যক্তির ওপর, তাই বেসরকারি খাতের ঋণকে মাথাপিছু ঋণের হিসাবে আনা হয়নি।
নতুন অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বাজেটে ব্যয়ের খাত হিসাবে জনপ্রশাসনের পরেই রয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধের অবস্থান। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং প্রতিষ্ঠান ফিস (ঋণের মান নির্ণয়ক সংস্থা) সম্প্রতি তাদের রিপোর্টে বলেছে, বর্তমানে ঋণ ধারণ সক্ষমতায় মধ্যম মানের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে এই ঝুঁকি ছিল নিম্নমানের। অর্থাৎ আগের চেয়ে ঝুঁকি বেড়েছে।
এ ব্যাপারে আবু আহমেদ বলেন, ঋণ নেওয়া অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ ও অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ঋণ নেওয়া হয়। কিন্তু ঋণের ব্যবহার, কার্যকারিতা এবং পরিশোধের সক্ষমতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, কোনো দেশের ঋণ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব আয় বাড়াতে না পারলে তা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। বর্তমানে বাংলাদেশ সে অবস্থায় আছে।
বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে জাতীয় সংসদে সোমবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে ব্যাপক হারে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঋণ ধারণ সক্ষমতার ঝুঁকিতে পড়েছে দেশ। তিনি বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে এই ঋণের দায় আমাদের ওপর পড়েছে। এরপরও যথাসময়ে আমাদের ঋণ ও ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতি সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। অবস্থার উত্তরণে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর করা, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং ব্যাংক থেকে মধ্যমেয়াদে ঋণ গ্রহণ কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে সরকার ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে মাথাপিছু ব্যয় ৫৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাথাপিছু সরকারি বরাদ্দের চেয়ে সরকারি ঋণ আড়াই গুণ। এছাড়া আলোচ্য বছরে সরকার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। আর মাথাপিছু আয় ৪০ হাজার ৮৮২ টাকা। এবার ঘাটতির পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে মাথাপিছু ঘাটতি ১৪ হাজার ২৯৪ টাকা। অন্যদিকে এবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা। আর মাথাপিছু বরাদ্দ ১৭ হাজার ৬৪৭ টাকা।

