সীমিত ক্ষমতায় সীমাহীন প্রত্যাশা
Advertisement
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজপথের সংগ্রাম থেকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদ। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হয়ে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তবে সংবিধানে তার ক্ষমতার সীমা বেঁধে দেওয়া।
দেশের বিদ্যমান সংবিধান অনুসারে সংসদ বহাল থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি অনেকটাই প্রতীকী রাজমুকুট। অর্থাৎ মর্যাদা আছে, কিন্তু কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। কিন্তু তাতে কী! প্রত্যাশার কোনো সীমানা নেই। মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন-এমন খবরে তার বাসায় শুভেচ্ছা জানাতে ছুটে গেছেন হাজার হাজার মানুষ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতাসীন বিএনপিতে ব্যক্তি হিসাবে মির্জা ফখরুলের গ্রহণযোগ্যতা ব্যাপক। রয়েছে সংকট মোকাবিলার বাস্তব অভিজ্ঞতা। ফলে দলীয় পরিচয়ের বাইরে তিনি মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠছেন। জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকবেন, এমনটাই প্রত্যাশা করছি।
সুজন (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের প্রত্যাশা, রাষ্ট্রের ক্রান্তিলগ্নে তিনি আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, আশা করছি রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে যে কোনো সংকটময় মুহূর্তে তিনি এগিয়ে আসবেন।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা : ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা কার্যত সীমিত হয়ে যায়। বর্তমানে রাষ্ট্রের প্রধানের প্রায় সব সিদ্ধান্তই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের ওপর নির্ভরশীল। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ আহ্বান করা, অধিবেশন স্থগিত করা এবং সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকলেও এই সিদ্ধান্তও তিনি একক ইচ্ছায় নিতে পারেন না। নিতে হয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই।
৮০ অনুচ্ছেদ অনুসারে সংসদে পাশ হওয়া কোনো বিলে রাষ্ট্রপতির সম্মতি প্রয়োজন। তবে তিনি চাইলে বিলটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠাতে পারেন। সংসদ সেই বিল অপরিবর্তিত রেখে আবার পাশ করলে রাষ্ট্রপতিকে তখন বাধ্যতামূলকভাবে সম্মতি দিতে হয়। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ বহাল বা কার্যকর না থাকলে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা রয়েছে।
তবে সংসদ বহাল থাকলে এই সুযোগ নেই। এছাড়া রাষ্ট্রপতির নামে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ সম্পন্ন হয়। ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ, ১১৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ, ৬৪ অনুচ্ছেদে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ, ১২৭ অনুচ্ছেদে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী এবং বিদেশে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।
তবে প্রধান বিচারপতি ছাড়া বাকি সব নিয়োগেই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শই চূড়ান্ত। এছাড়া সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এটি শুধুই আনুষ্ঠানিক পদমর্যাদা। সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদালতের দেওয়া যে কোনো দণ্ড স্থগিত, কমানো বা মওকুফ করার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির। তবে সবই নির্বাহী বিভাগের পরামর্শে।
১৪১(ক) অনুসারে জরুরি অবস্থা ঘোষণা, যুদ্ধ ঘোষণা কিংবা শান্তিচুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও তাকে প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শের ওপর নির্ভর করতে হয়। এমনকি সরকারের সব নির্বাহী পদক্ষেপ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রাষ্ট্রপতির নামে’ গৃহীত হয়েছে বলে ঘোষণা করা হলেও সংবিধানের ৫৫(৪) অনুচ্ছেদ অনুসারে প্রকৃত সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী।
জানতে চাইলে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, তিনি নামমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান। ফলে নিজের বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই। দেশের বর্তমান সংবিধান অনুসারে রাষ্ট্রপতি চাইলে ভালোও করতে পারেন, কিংবা মন্দও করতে পারেন এই সুযোগ নেই। কারণ সংবিধানে তাকে ক্ষমতা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। তবে আমার প্রত্যাশা রাষ্ট্রের কোনো সংকট সৃষ্টি হলে তখন তিনি সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়াবেন। ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি হিসাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জীবন বিসর্জন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকবেন, এমনটাই প্রত্যাশা করছি।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত। সবকিছু তাকে প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুসারে করতে হয়। কিন্তু দুঃসময়ে মির্জা ফখরুল বিএনপিকে রক্ষা করেছেন। সে সময়ে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, তা অতুলনীয়। আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সব সময় সত্য কথা বলার চেষ্টা করেছেন।
যেমন কিছুদিন আগে তিনি বলেছেন, সবকিছু আগের মতোই আছে। কোনো পরিবর্তন হয়নি। আশা করি রাষ্ট্রপতি হিসাবেও তিনি সত্য কথা বলার চেষ্টা করবেন। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা সীমিত হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি হিসাবে তিনি নৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করবেন। তিনি দল হিসাবে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছেন। রাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারী সংস্কারের জন্য তারও ভূমিকা ছিল। বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাব হিমাগারে চলে গেছে।
সেক্ষেত্রে আগামীতেও নেপথ্যে থেকে যতটুকু পারেন, রাষ্ট্র সংস্কারে মির্জা ফখরুল কাজ করবেন। আরেক প্রশ্নের জবাবে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দেশের আগের রাষ্ট্রপতির প্রতি আমাদের বহুদিনের আস্থাহীনতা রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের ক্রান্তিলগ্নে মির্জা ফখরুল ইসলাম আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন এটাই প্রত্যাশা। মানুষ ওনাকে নিয়ে গর্ব করতে পারে এমন কাজ তিনি করবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে মির্জা ফখরুল কার্যত দলটির নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। দলের দুর্দিনে নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন, মামলা ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময়ে তিনিই ছিলেন দলের প্রধান মুখ। রাজনৈতিক আন্দোলনের কারণে বহুবার কারাগারে যেতে হয়েছে তাকে। এই দীর্ঘ সংগ্রামী পথ এবং সঙ্গে থাকা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি তাকে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা এনে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দল পরিচালনার অভিজ্ঞতা এবং ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে তার প্রভাবের কারণে স্বাভাবিকভাবেই তার রাষ্ট্রপতি হওয়াকে ঘিরে জনমনে এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, দেশের সংকটকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও অংশীজনদের বঙ্গভবনে ডেকে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার মতো ব্যক্তি মির্জা ফখরুল। কারণ বিএনপি ছাড়া অন্যান্য দলের মধ্যেও তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মনে করেন, আইনিভাবে হয়তো রাষ্ট্রপতির খুব বেশি ক্ষমতা নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসাবে সংকটকালে তার ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে আমার প্রত্যাশা; রাষ্ট্রের যে কোনো সংকটময় মুহূর্তে তিনি এগিয়ে আসবেন। সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে প্রয়োজন হলে তিনি সংলাপের আয়োজন করবেন। সংকট উত্তরণের উদ্যোগ নেবেন।
তিনি বলেন, অতীতে রাষ্ট্রপতিরা এ ধরনের উদ্যোগ নিলে দেশকে এই সংকটে পড়তে হতো না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের মতে, সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও রাষ্ট্রপতির কিছু উদ্যোগ জনগণের জন্য বার্তা এবং সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে সংসদে কোনো বিল পাশ হলে রাষ্ট্রপতির সামনে তিনটি অপশন। তিনি বিলটি স্বাক্ষর করতে পারেন, ফেরত পাঠাতে পারেন কিংবা ড্রয়ারে রেখে দিতে পারেন। আর রেখে দিলেও ৪৫ দিন পর সেটি পাশ হয়ে যাবে। কিন্তু বিলটি পাশ হলেও এই বিলে রাষ্ট্রপতির সম্মতি নেই, এটি দেশের জন্য বড় বার্তা। পাশাপাশি এটি সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে।

