Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

রূপ নিয়েছে জাতীয় সংকটে

জনবহুল দেশ, দক্ষতায় খরা

লোক বাড়ছে, দক্ষতা কমছে * শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, পুলিশ, আমলাতন্ত্র ও বেসরকারি খাত সবখানেই দক্ষতার সংকট * রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না : ড. হোসেন জিল্লুর রহমান * শিক্ষাব্যবস্থা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি দক্ষ মানুষ তৈরি করছে না : আলী ইমাম মজুমদার

Advertisement

মনির হোসেন

মনির হোসেন

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জনবহুল দেশ, দক্ষতায় খরা

Advertisement

সংখ্যাগত প্রায় সব দিক থেকেই এগোচ্ছে দেশ; কিন্তু মান কোথায়! ১৮ কোটি মানুষের দেশে দক্ষ জনবলের বিশাল ঘাটতির আলোচনা এখন সর্বত্র। আর এ আলোচনা এখন দেশের সব খাতে। রাজনীতিতে স্লোগানদাতা বেশি। কিন্তু প্রতিশ্রুতিশীল ও দেশপ্রেমিক নীতিনির্ধারক কম। অর্থনীতিতে হিসাবরক্ষক অনেক, উদ্ভাবক নেই। পুলিশের পদগুলো শূন্য না থাকলেও দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং অপরাধ তদন্ত; সর্বোপরি পুলিশিংয়ের দক্ষতা নেই বললেই চলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও নিজেদের দক্ষতা না বাড়িয়ে রাজনৈতিক দলের পেছনে ছুটছেন। গণমাধ্যমে সাংবাদিকের অভাব নেই সত্যি; কিন্তু নির্মোহ পেশাদারত্ব, নীতিবান এবং প্রতিশ্রুতিশীল অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার লোক কমছে। বেসরকারি খাতে কারখানা আছে; কিন্তু তা চালানোর জন্য নিজ দেশে দক্ষ ব্যবস্থাপক মিলছে না। সহজ কথায় বললে, দেশে লোকের অভাব নেই। কিন্তু অভাব দক্ষ লোকের। বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল-বর্তমানে দেশে দক্ষতার অভাব জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। এর প্রথম কারণ হলো, শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা। দ্বিতীয়ত, সমাজে যোগ্যতার বদলে তদবির এবং সততার বদলে সংযোগ বা পেছনের দরজাকে গুরুত্ব দেওয়ায় আজকের এ পরিস্থিতি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মেধা পাচার। বাংলাদেশ থেকে যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন, তারা আর দেশে ফিরছেন না। কারণ তাদের উপযুক্ত চাকরি এ দেশে নেই। অনেকের মতে, বাংলাদেশে রাষ্ট্রকাঠামোতে আজকে যে অগোছালো অবস্থা, এর মূলে রয়েছে প্রায় সব ক্ষেত্রে অদক্ষতার ছাপ। আবার কিছু দক্ষ লোক থাকলেও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের ভিড়ে তাদের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে বলে আলোচনা আছে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মনে করেন, দক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদারের মতে, শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং সমাজব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানুষ দক্ষ হয়ে ওঠেন। কিন্তু দেশে সেই ব্যবস্থা অনুপস্থিত। একই অভিমত ব্যক্ত করেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান। তার মতে, দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রকৃত সম্পদে রূপ দিতে দ্রুতই সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি ও সততাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কৌশল জরুরি।

জানতে চাইলে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘কীভাবে একটি দক্ষ সমাজ তৈরি করা যায়, সেদিকে আমাদের নজর কম। দক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে দেশের সব খাতেই দক্ষতার ঘাটতি আছে।’ তিনি বলেন, ‘মেধা এবং দক্ষতা দুটি আলাদা বিষয়। মেধার চেয়ে দক্ষতা আরও গভীর শব্দ। এটি শুধু সার্টিফিকেটে সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষতা হলো-তাত্ত্বিক জ্ঞান, বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সমাজের নানামুখী সমস্যার সমাধানমূলক চিন্তার যোগ্যতা থাকা।’ তার মতে, দেশের শিক্ষা খাতে যথেষ্ট অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু শিক্ষার মানোন্নয়ন হয়নি। তাই দক্ষতা বাড়াতে হলে তিনটি বিষয়ে জোর দিতে হবে। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। দেশে অনেক মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ আছে। কিন্তু পুরোটাই থিউরিটিক্যাল বা পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ। প্র্যাকটিস করার সুযোগ কম। কিন্তু দক্ষতার জন্য বই এবং প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞানের কার্যকর সংমিশ্রণ জরুরি। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষায় তার ব্যাপক ঘাটতি আছে। দ্বিতীয়ত, দক্ষতাকে লালন করা বা লোকজনকে আমরা সমাদর করছি কিনা। দুঃখজনকভাবে এর জবাব হলো ‘না’। কারণ আমরা প্রাতিষ্ঠানিক সংকীর্ণ মনোভাবের মধ্যে আছি। এটি বিশ্ববিদ্যালয়, কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য যে কোনো খাত বা পেশায় এই সংকীর্ণতা আছে। এই অর্থনীতিবিদের মতে, দক্ষ লোকজনকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। অনেক শিক্ষক, আমলা কিংবা বড় ডাক্তার আছেন; যাদের প্রমোট করা হয় না। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এফআর খানের মতো বিশ্ববিখ্যাত স্থপতি স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে এসে সেবা দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বুয়েট (বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) তাকে আগ্রহ নিয়ে গ্রহণ করেনি। তৃতীয়ত, নিজেদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মধ্যে সংকীর্ণ রাজনৈতিক চিন্তা কাজ করছে। তাদের মধ্যে পেশাদারত্ব নেই। যেমন-শিক্ষক, ডাক্তার এবং প্রকৌশলীদের সংগঠনগুলো নামেই পেশাজীবী। বাস্তবে তারা রাজনৈতিক দলের মতো। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, ওই দলের সংগঠন সামনে আসে। বাংলাদেশকে এগোতে হলে এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।

দক্ষতার সংকটের গভীরতা উঠে এসেছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্তেও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ ৬ হাজার। এক দশক আগের তুলনায় যা প্রায় আটগুণ বেশি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্নকারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স-২০২৫-এ চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরির সক্ষমতায় বাংলাদেশের অবস্থান ৮১ দেশের মধ্যে ৬৭তম। যেখানে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি। তরুণদের অবস্থাও উদ্বেগজনক। সরকারের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের কৌশলপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি প্রায় ৫৫ লাখ তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কোনো প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত নেই (নন-এডুকেশন এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং এনইইটি)। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ অনুযায়ী দেশের সামগ্রিক এনইইটি হার প্রায় ৪১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার (আইএলও) তথ্যমতে, এনইইটির বৈশ্বিক গড় ২২ শতাংশ। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার আরও ভয়াবহ। এটি প্রায় ৬২ শতাংশ। ইউনেস্কোর তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়েই বর্তমান কর্মীবাহিনীর প্রায় ৪০ শতাংশের দক্ষতা শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; আর ২০৩০ সালের মধ্যে প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ কর্মীকে নতুন পেশায় খাপ খাইয়ে নিতে হবে। দক্ষতা উন্নয়নে এখনই মনোযোগ না দিলে বাংলাদেশের জন্য সংকট আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পে এখনো বহু উচ্চপদে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিতে হয়। কারণ স্থানীয়ভাবে দক্ষ ব্যবস্থাপক তৈরির প্রক্রিয়া দুর্বল। শিল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রতিবেশী দেশ থেকে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে দক্ষ জনবল আনতে বাংলাদেশকে প্রতিবছর মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। শ্রমবাজারের পরিসংখ্যানও একই গল্প বলছে। জনশক্তি রপ্তানির তথ্য অনুযায়ী, বিদেশগামী কর্মীদের মধ্যে দক্ষ কর্মীর হার মাত্র প্রায় সাড়ে ২৩ শতাংশ। আর স্বল্প দক্ষ বা অদক্ষ হিসাবে যাচ্ছেন প্রায় ৫৪ শতাংশের বেশি মানুষ। ফলে সমপরিমাণ জনশক্তি পাঠিয়েও ফিলিপাইনের মতো দেশ যেখানে অনেক বেশি রেমিট্যান্স আয় করে, বাংলাদেশ সেখানে তুলনামূলক কম আয় করছে। কারণ পাঠানো জনশক্তির বড় অংশ অদক্ষ শ্রেণির।

বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সি তরুণ। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি বিশাল ‘জনমিতিক লভ্যাংশ’ (ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড)। এই তরুণ জনগোষ্ঠীকে সঠিকভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে দেশের রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও উৎপাদনশীলতাসহ সবকিছুতেই বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসত। বিদেশে পাঠানো প্রতিটি কর্মী দক্ষ হলে রেমিট্যান্স আয় বহুগুণ বাড়ত। দেশের ভেতরে বেসরকারি খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার হাত ধরে বাংলাদেশ দ্রুত সময়ে উন্নত অর্থনীতির কাতারে পৌঁছাতে পারত।

দক্ষতার সংজ্ঞা : দক্ষতা মানে শুধু সনদ নয়। একটি নির্দিষ্ট কাজ সঠিকভাবে, দ্রুততার সঙ্গে এবং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সম্পন্ন করার সক্ষমতাই দক্ষতা। এর তিনটি স্তম্ভ থাকে। জ্ঞান (নির্দিষ্ট বিষয়ে বোঝাপড়া), ব্যবহারিকতা (হাতে-কলমে কাজ করার সামর্থ্য) এবং দৃষ্টিভঙ্গি বা নৈতিকতা (কাজের প্রতি সততা ও দায়বদ্ধতা)। এই তিনটি একসঙ্গে না থাকলে একজন মানুষ শুধু পদে বসতে পারেন, কাজ করতে পারেন না। বাংলাদেশে সংকটটা ঠিক এখানেই। সনদধারী মানুষ প্রচুর, কিন্তু বাস্তব কাজ করার মতো দক্ষতা ও নৈতিকতার সমন্বয় বিরল।

মূল্যবোধের সংকট : যোগ্যতার পরিবর্তে যখন সম্পর্ক, তদবির, উৎকোচ বা রাজনৈতিক পরিচয়ে মানুষ গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে যায়, তখন একটি বার্তা স্পষ্ট হয়; দক্ষতা নয়, সংযোগই সাফল্যের চাবিকাঠি। এই বার্তা থেকেই জন্ম নেয় মূল্যবোধের সংকট। মেধাবী তরুণ দেখেন, অদক্ষ কেউ শুধু ‘সম্পর্কের জোরে’ এগিয়ে যাচ্ছেন, আর তখন তিনিও নীতি-নৈতিকতার পথ ছেড়ে শর্টকাট পথ খোঁজেন। দক্ষতার সংকট আর মূল্যবোধের সংকট এভাবেই একে অপরকে পুষ্ট করে চলে।

দক্ষ মানুষ তৈরি হয় কীভাবে : দক্ষ মানুষ রাতারাতি তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, মানসম্মত শিক্ষা, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে শেখার সুযোগ এবং যোগ্যতার স্বীকৃতি। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (টিভিইটি), শিল্প-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংযোগ, ইন্টার্নশিপ, রিস্কিলিং ও আপস্কিলিং কর্মসূচি। এসবই দক্ষতা তৈরির মূল হাতিয়ার। কিন্তু আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) এক জরিপ বলছে, গত তিন বছরে বাংলাদেশের প্রায় ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ একদিনের জন্যও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেননি। অথচ অর্ধেকের বেশি মানুষ নিজেরাই বলছেন, তাদের কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণ দরকার। অর্থাৎ চাহিদা আছে, কিন্তু জোগানের ব্যবস্থা নেই। সংশ্লিষ্টদের মতে, অদক্ষ মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নেন। ভুল প্রকল্প অনুমোদন করেন। রাজনীতিতে অদক্ষ নীতিনির্ধারণের খেসারত দিতে হয় পুরো জাতি ও অর্থনীতিকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে দক্ষ তদন্তকারীর অভাবে অনেক মামলার প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে না। এতে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। সাংবাদিকতায় দক্ষ প্রতিবেদকের সংকটে গুজব ও ভুল তথ্য সহজে ছড়িয়ে পড়ে, জনআস্থা কমে যায়। বেসরকারি খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে উৎপাদনশীলতা কমে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারান।

জানতে চাইলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সাবেক সচিব আলী ইমাম মজুমদার শনিবার যুগান্তরকে বলেন, পৃথিবীতে কেউ দক্ষ হয়ে জন্মায় না। শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং সমাজব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানুষ হয়ে ওঠেন; কিন্তু আমাদের ছেলেরা দক্ষ হয়ে উঠছে না। ফলে চাকরির ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে রয়েছেন। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বড় বড় পদগুলোতে (ম্যানেজারিয়াল পজিশন) প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং শ্রীলংকার লোকজন কাজ করে। এখানে নিজ দেশের লোকজন কম। কারণ হলো, আমাদের দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যারা পাশ করেন, তারা যথেষ্ট দক্ষতা (নলেজ) নিয়ে আসছে না। তার মতে, বড় পদগুলোতে দেশের ভেতর থেকে যোগ্য লোক পাওয়া গেলে, উদ্যোক্তারা নিশ্চয়ই বিদেশিদের চাকরি দিতেন না। যোগ্য লোক পাওয়া যায় না বলেই বিদেশিদের নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রথমত, আমাদের দেশের ছেলেরা ইংরেজিতে কথা বলায় (স্পোকেন ইংলিশ) পিছিয়ে রয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ মানুষ তৈরির ক্ষেত্রে সমাজব্যবস্থার দায় আছে। জানতে চাইলে ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান যুগান্তরকে বলেন, দক্ষতার ঘাটতি এখন বড় সমস্যা। সব খাতেই এই সমস্যা আছে। এর প্রধান কারণ হলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা দক্ষ মানুষ তৈরি করছে না। তার মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা ইংরেজিতে কথা বলার ক্ষেত্রে। দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যারা পাশ করে বের হচ্ছে, তারা ইংরেজিতে কথা বলতে পারছে না। এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসছে। শিল্প ও শ্রমের ধরনেও পরিবর্তন আসছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান হয়ে যাচ্ছে ‘এআই’ভিত্তিক। ফলে দক্ষতা না থাকলে চলবে না। এ সময়ে তিনি নার্সিং এবং কারিগরি শিক্ষায় জোর দেওয়ার সুপারিশ করেন।

শিক্ষা ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মুখস্থনির্ভর ও সনদসর্বস্ব কাঠামোয় আটকে আছে। এর ফলে শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাদের মতে, এই সংকট উত্তরণে বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে পাঠ্যক্রমে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বাড়ানো, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সংযোগ জোরদার করা, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে একমাত্র মানদণ্ড করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে টেকসই বিনিয়োগ ও শ্রমবাজারমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত হলে বিশাল জনমিতিক সম্ভাবনা উলটো দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

বাইরে আন্দোলন, ভেতরে চুক্তি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি

ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি

বিশ্ব ডাক দিবস আজ মুমূর্ষু ডাকঘর, নেই সেবা

মুমূর্ষু ডাকঘর, নেই সেবা

বিটিআরসির সিদ্ধান্তে বাড়তি সুবিধা এস আলমের কোম্পানির পোয়াবারো, নতুন বিতর্ক

এস আলমের কোম্পানির পোয়াবারো, নতুন বিতর্ক

শাহজালাল বিমানবন্দর ঘিরে অপরাধ ভাড়ায় খাটে দুর্ধর্ষ ডাকাতরা

ভাড়ায় খাটে দুর্ধর্ষ ডাকাতরা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম