বাইরে আন্দোলন, ভেতরে চুক্তি
ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে এনসিটি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিয়েছে সরকার। ১৫ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চুক্তি সইয়ের সময় এর বিরোধিতা করে ঢাকায় অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে বিক্ষোভ করেছে কয়েকটি রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠন। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিপেটা করে পুলিশ। বিক্ষোভ হয়েছে চট্টগ্রামেও।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে এ চুক্তি সই হয়। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। অনুষ্ঠানে নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম ১০ বছরে এনসিটির আধুনিকায়নে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। চুক্তির শুরুতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি দেওয়ার কথাও রয়েছে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে দেওয়ার কথা। ইনভেস্ট বাংলাদেশ জানায়, টার্মিনালের আয় থেকে রয়্যালটি পাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। গড় টার্মিনাল আয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতি কনটেইনারে বন্দরের অংশ ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বাইরে প্রতিবছর প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে। নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে তা কমিয়ে ১০ লাখ টিইইউ করার সুযোগ থাকবে।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বিদ্যমান কৌশলগত সম্পদগুলোর সক্ষমতা ও দক্ষতা দ্রুত বাড়ানো। বিভিন্ন টার্মিনালে একাধিক আন্তর্জাতিক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার মাধ্যমে সেবার মান ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানো এবং সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করাই সরকারের বৃহত্তর নীতির অংশ। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির ফলে কেউ চাকরি হারাবে না, বরং সক্ষমতা বাড়বে।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এসা কাজিম বলেন, বাংলাদেশ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উৎপাদন অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে এবং দেশের এই উন্নয়নে সহযোগিতা করতে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে এনসিটিকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক বন্দর, সরবরাহ অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের যোগাযোগ আরও নির্বিঘ্ন হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, চুক্তিটি এনসিটির পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য পরিবহণে প্রতিবন্ধকতা কমাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করবে।
দীর্ঘদিনের বিরোধিতা : এনসিটি বিদেশি অপারেটরের হাতে দেওয়ার বিরোধিতা দীর্ঘদিনের। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) টার্মিনালটি বিদেশিদের হাতে না দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। এ দাবিতে বন্দর অচল করে রাখার ঘটনাও ঘটেছে। গত ২ মাসে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও মশাল মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। সবশেষ বৃহস্পতিবার চুক্তি সইয়ের সময় আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে সিপিবি, বাসদসহ কয়েকটি সংগঠন। দুপুর ২টা থেকে তারা সেখানে অবস্থান নেন। বেলা পৌনে ৩টার দিকে পুলিশ লাঠিপেটা করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সিপিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এতে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
সিপিবির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, আমরা আজ সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই এখানে এসেছিলাম। আমরা মনে করি, এ চুক্তি বাংলাদেশকে বিক্রি করার শামিল। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সম্পৃক্ততা আছে, তাদের ওয়েবসাইটে গেলে বিষয়টি বোঝা যাবে। তিনি আরও বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দেওয়ার মানে হলো, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর আমেরিকা সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারবে। আমাদের নৌবন্দর, বিমানবন্দর-সব ব্যবহার করবে তারা।
সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল : এনসিটি চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড়। ২০০৭ সালে চালু হওয়া এ টার্মিনাল দিয়ে বর্তমানে বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহণের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালিত হয়। টার্মিনাল নির্মাণ ও আধুনিকায়নে ইতোমধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। বর্তমানে নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান ড্রাইডক এটি পরিচালনা করছে। এদিকে এনসিটির পরিচালন সক্ষমতা নিয়েও সরকারের উদ্বেগ রয়েছে। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে পরিচালিত হলেও একটি কনটেইনারের গড় অবস্থানের সময় ৯ দিনের বেশি। সমপর্যায়ের কয়েকটি বন্দরে এ সময় ২ দিনেরও কম। একটি জাহাজের অবস্থানকালও আড়াই দিনের বেশি, যেখানে কয়েকটি আন্তর্জাতিক বন্দরে তা ১৫ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। ২০২৫ সালের কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স সূচকে ৪০০ বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রামের অবস্থান ছিল ৩৬৪তম।
সরকারের হিসাবে, বন্দরের পরিচালনগত অদক্ষতা ও আধুনিকায়নের ঘাটতির কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। বছরে এর পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বন্দরে কনটেইনার পড়ে থাকার সময় ১ দিন কমানো গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়তে পারে।
চুক্তির উদ্যোগ ছিল আগেও : বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগটি অবশ্য নতুন নয়। আগের আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও পিপিপি ও জিটুজি কাঠামোর আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। পরে অন্তর্বর্তী সরকার এ প্রক্রিয়া শুরু করে। ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটি বিদেশি অপারেটরের কাছে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করা হলেও ৪ জুন বিএনপির নতুন সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়। চুক্তিতে এনসিটির মালিকানা বা সার্বভৌম কর্তৃত্ব হস্তান্তরের কথা নেই। টার্মিনালের জমি, মূল অবকাঠামো ও সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। নিরাপত্তা, শুল্ক ও অভিবাসনসহ সরকারি দায়িত্বগুলোও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের অধীন থাকবে। টার্মিনালের কার্যক্রম তদারকি, নিরীক্ষা ও নিয়মিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
সেবার মান ধরে রাখতে চুক্তিতে কর্মদক্ষতার নির্দিষ্ট সূচক ও লক্ষ্যমাত্রাও রাখা হয়েছে। ট্রাক চলাচলের সময় ও ক্রেনের উৎপাদনশীলতার মতো বিষয় এর আওতায় রয়েছে। কোনো নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা টানা ৩ মাস পূরণ করতে না পারলে আর্থিক জরিমানার বিধান কার্যকর হবে। ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের ৪০টির বেশি দেশে ৮০টির বেশি সমুদ্র ও অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল পরিচালনা করে। তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বের মোট কনটেইনার পরিবহণের প্রায় ১০ শতাংশ পরিচালিত হয়। এনসিটির দায়িত্ব পাওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দরের বড় একটি কনটেইনার টার্মিনালের ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক এই অপারেটর যুক্ত হলো।
চট্টগ্রামে পুলিশ ব্যারিকেডের মধ্যেই বিক্ষোভ মিছিল : চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে বিক্ষোভ করেছে বন্দর রক্ষা কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠন। সামনে-পেছনে পুলিশ ব্যারিকেডের মধ্যে থেকেই এই মিছিল করতে হয়েছে তাদের। বৃহস্পতিবার বিকালে ঢাকায় যখন চুক্তি সই হচ্ছিল ঠিক সেই সময় চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল ও বন্দর রক্ষা সংগ্রাম বিক্ষোভ মিছিল করে। পরে সমাবেশ থেকে চুক্তি বাতিল এবং বন্দর শ্রমিক-কর্মচারী ও দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের দাবিতে সোমবার বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের সামনে শ্রমিক-কর্মচারীদের গণঅনশন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।
