কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের অপতৎপরতা বন্ধে ডিএমপির নির্দেশ
রাজধানীতে ঝটিকা মিছিল হলেই ওসি-ডিসি ক্লোজড
Advertisement
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোসহ অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ইদানীং ব্যাপক অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। আইনি বাধা উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ ও তাদের সহযোগী সংগঠনের কিছু উচ্ছৃঙ্খল কর্মী রাজপথে একের পর এক মিছিল করছে। স্লোগান দিচ্ছে। তারা হাসিনার প্রত্যাবর্তনের দাবি করে সরকারবিরোধী আওয়াজ তুলছে। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, যেন দলটি জুলাইয়ে গণহত্যা চালায়নি। কিংবা মানুষ সব ভুলে গেছে। কিংবা তাদের দলের প্রধানসহ র্শীর্ষ নেতারা দেশ ছেড়ে পালাননি। মনে হতে পারে একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা যেভাবে রাজপথে সরকারবিরোধী মিছিল করে, তারাও সেটিই করছে। কার্যত তা নয়। মূলত দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে জুলাইয়ে পরাজিত দলটি নতুন করে যে ষড়যন্ত্রের ছক আঁকছে তারই অংশ হিসাবে তারা কিছু নেতাকর্মীকে মাঠে নামিয়েছে।
এক্ষেত্রে আছে পুলিশের গাফিলতি। আছে গোয়েন্দা ব্যর্থতা। তাদের কাছে এ সংক্রান্ত আগাম কোনো তথ্য না থাকায় এমনটি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আবার কেউ মনে করছেন, পুলিশের ফ্যাসিস্টদের যে অংশটি এখনো ঘাপটি মেরে আছে তাদের পরোক্ষ সহায়তা নিয়েই এরা মাঠে নামার দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের উসকানি ও ষড়যন্ত্র ঠেকাতে এবার প্রিভেন্টিভ মেজার বা আগাম প্রতিরোধমূলক কৌশল নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। অপরাধ সংঘটনের পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর সনাতন ধারা বদলে সিটিটিসি, ডিবি ও থানা পুলিশের সমন্বয়ে রাজধানীর প্রবেশমুখগুলোতে কঠোর ব্লক চেক, স্পটভিত্তিক জিরো-গ্যাপ সিকিউরিটি এবং আবাসিক হোটেলের অতিথি তালিকা সংরক্ষণের মাধ্যমে বহিরাগতদের মুভমেন্ট ও সম্ভাব্য অপতৎপরতা রোধে কড়া নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ।
ডিএমপি কমিশনার মাঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। ছাত্রলীগ সংগঠন হিসাবেই নিষিদ্ধ। এসব নিষিদ্ধ সংগঠন বা দলের কোনো কার্যক্রম চলতে পারে না। ডিএমপির অপরাধ বিভাগের যে এলাকায় বা যে থানায় নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো ধরনের কার্যক্রম চলবে বা ঝটিকা মিছিল হবে সেই অপরাধ বিভাগের ডিসি ও ওসির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বাহিনীর কেউ ছাড় পাবে না। সোমবার ডিএমপি সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় কমিশনার এই কড়া নির্দেশনা দেন বলে জানা গেছে। কর্মকর্তাদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘থানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ ও এলাকার স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা ওসির কাজ। থানার ভেতর মশায় কামড়ালেও ওসির জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। একটি মশা মারা গেলেও তা ওসিকে জানতে হবে।’
ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্যের বরাত দিয়ে একজন অতিরিক্ত কমিশনার যুগান্তরকে বলেন, কোনো অবস্থাতেই অপরাধীদের প্রতি শিথিলতা দেখানো যাবে না। এক্ষেত্রে টহল ও চেকপোস্ট আরও জোরদার করতে হবে। তিনি বলেন, পুলিশের মূল লক্ষ্য এখন রাজপথের অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা। মাঠপর্যায়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক তৎপর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে করে কোনো স্থানে বিশৃঙ্খলা দানা বাঁধতে না পারে।
সভায় ডিউটিরত কর্মকর্তা ও সদস্যদের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাদের বলা হয়েছে, সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) থেকে শুরু করে প্রতিটি মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যকে ডিউটি চলাকালে দৃশ্যমানভাবে আইডি কার্ড ঝুলিয়ে রাখতে হবে এবং যথাযথ ইউনিফর্ম পরিধান করতে হবে। প্রতিটি থানায় ‘নারী ও শিশু সার্ভিস ডেস্ক’ নতুন করে সক্রিয় ও কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী ও শিশুরা যাতে কোনো প্রকার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছাড়া থানায় এসে সমস্যার কথা বলতে পারেন, সেজন্য নারী পুলিশ সদস্যদের মাধ্যমে পেশাদারত্ব ও মানবিকতার সঙ্গে আইনি সেবা দেওয়ার নির্দেশ দেন ডিএমপি কমিশনার।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, সহকারী কমিশনার (এসি) ও অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনারদের (এডিসি) নিয়মিত থানা পরিদর্শন এবং তদন্তকাজে তদারকি চালাতে হবে। থানায় আসা কোনো সেবাগ্রহীতা সেবা না পেয়ে ফিরে গেলে তার সব দায়ভার সংশ্লিষ্ট ওসির ওপর বর্তাবে। থানাকে দালালমুক্ত রাখা এবং সাধারণ মানুষের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করাই পুলিশিংয়ের প্রথম শর্ত বলে পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। রাজধানীবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত, মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় বিবেচনা না করার নির্দেশ দেন। বলেছেন, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি, অনলাইন জুয়া ও সাইবার অপরাধে জড়িত ব্যক্তি যিনিই হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনাতে হবে।
সভা সূত্র জানায়, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্পটগুলোতে স্পটভিত্তিক নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট ও ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের (ডিবি) সদস্যদের ক্রাইম বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে হটস্পটগুলোতে ২৪ ঘণ্টা মাঠপর্যায়ে টহল দেবে।
সভায় গুরুত্বপূর্ণ ও ক্লুলেস মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত শেষ করার জন্য বিশেষ সুপারভাইজরি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। মামলা তদারকির জন্য পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত), সহকারী কমিশনার (এসি) ও এডিসিদের সমন্বয়ে গঠিত এসব কমিটি কাজ করবে। এছাড়া ওসিদের নিজ নিজ এলাকার অপরাধ সংঘটনস্থলে সরাসরি গিয়ে আলামত সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়।
মানুষের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে ডিএমপি বেশকিছু সংস্কার ও বিশেষ নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলে সভায় জানানো হয়। নগর নিরাপত্তা জোরদার করতে ‘এআই’-চালিত সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম ঢাকা শহরের প্রবেশমুখগুলোতে সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগরের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা বিধানসহ উত্তম কাজের স্বীকৃতি হিসাবে ডিএমপির বিভিন্ন পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করা হয়েছে অপরাধ পর্যালোচনা সভায়।
সভায় অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মাসুদ করিম, শফিকুল ইসলাম, আবুল বাশার তালুকদার, মোহাম্মদ ওসমান গণি এবং মোহাম্মদ শামসুল হকসহ সব যুগ্ম পুলিশ কমিশনার, উপপুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার, সহকারী পুলিশ কমিশনার, থানার ওসি উপস্থিত ছিলেন।
একজন যুগ্ম কমিশনার বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যে কোনো ধরনের অপরাধ বিস্তার রোধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহসহ পরিকল্পনামাফিক কাজ করার বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা দমনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
সভায় উপস্থিত একজন উপকমিশনার বলেন, বিট পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করে সাধারণ মানুষের চলাচলের উপযোগী করতে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারের উপকমিশনার আকতার হোসেন বলেন, সভায় আবাসিক হোটেলসহ বিভিন্ন হোটেলের অতিথিদের তালিকা নিয়মিতভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হোটেলগুলো থেকে অতিথিদের তথ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় যেন এসব তথ্য দ্রুত পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। কমিশনার আরও বলেছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অপরাধীরা যাতে ঢাকায় এসে অপরাধ সংঘটিত করতে না পারে, সেজন্য রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্লক চেকসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও তাৎক্ষণিকভাবে কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

