মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিত্যপণ্যের বাজারে
‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’
Advertisement
ফাইল ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নিত্যপণ্যের চড়া দামে এমনিতেই দিশেহারা মানুষ। সংসারের হিসাব মেলাতে যখন হিমশিম খেতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারকে, ঠিক তখনই মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। তেলের দাম বাড়ার একদিন না যেতেই বাজারে উত্তাপ ছড়িয়েছে সবজি, আটা-ময়দা, ভোজ্যতেলসহ অন্তত ১০টি পণ্যের দামে। আয় না বাড়লেও একের পর এক বাড়ছে মানুষের খরচ। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের সঙ্গে জ্বালানি ব্যয়ের বাড়তি চাপ-সব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সব শ্রেণি-পেশা ও সাধারণ মানুষ। সবার আশঙ্কা-তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে টিকে থাকাই দায় হয়ে পড়বে। সরকারকে তাদের বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাজার স্থিতিশীল রাখতে জোরদার করা হবে নজরদারি, নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।
এদিকে গত কয়েকমাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতির চাপে এমনিতেই কমে গেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। আয় না বাড়লেও ব্যয়ের বোঝা বাড়তে থাকায় সংসারে একের পর এক খরচ কমাতে হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তের অবস্থা এখন সবচেয়ে নাজুক। বিভিন্ন খাতে খরচ কমিয়ে বাধ্য হয়ে তাদের জীবনযাত্রার মান কমাতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার রোববার রাতে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে সোমবার থেকে কার্যকর করার আগেই বাজারে দামের আগুন ছড়িয়ে পড়ে।
সোমবার রাজধানীর একাধিক খুচরা বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিকেজি বেগুন আকার ও মানভেদে ৯০-১৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। যা একদিন আগেও ৮০-১২০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি শসা সর্বনিম্ন ৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এই একই শসা রোববার সর্বনিম্ন ৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। প্রতিকেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ১০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৬০ টাকা। যা একদিন আগে ছিল সর্বনিম্ন ৮০ টাকা। প্রতি হালি ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ৫৫ টাকায়। যা দুই দিন আগেও ৫০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি তেজপাতা বিক্রি হচ্ছে ২৫০-৩০০ টাকা। যা এক সপ্তাহ আগেও ১৯০-২৪০ টাকা ছিল। আমদানি করা রসুন বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১৮০ টাকা। যা আগে ১৬০ টাকা ছিল।
এছাড়া খুচরা পর্যায়ে বড় দানার মসুর ডাল প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১০০ টাকা। যা আগে ৯০-১০০ টাকা ছিল। প্রতিকেজি খোলা আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা আগে ৪৮ টাকা ছিল। পাশাপাশি প্রতিকেজি খোলা ময়দা প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা। যা আগে ৬৫ টাকা ছিল। খোলা পামওয়েল বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৭০ টাকা। যা আগের দিনও ১৬৬ টাকা ছিল।
রাজধানীর নয়াবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে এসেছেন মো. সোহাগ। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৪২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করি। মা-বাবা, স্ত্রী ও এক ছেলে নিয়ে আমার সংসার। সেখান আমিসহ তাদের খাবার জোগাড় করতে মাসে ৫০ কেজির এক বস্তা চাল ৪ হাজার, ৫ লিটার তেল এক হাজার, বাসা ভাড়া ১৪ হাজার, সবজি, মাছ, ব্রয়লার মুরগিসহ তরকারি রান্নার উপকরণ কিনতে ৯ হাজার, গ্যাস সিলিন্ডার ৩০০০, সাবান-ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পু ৫০০, মুদি বাজার আরও ২ হাজার, বিদ্যুৎ বিল ২ হাজার ও মোবাইল টকটাইমে খরচ হয় ৫০০ টাকা। মা-বাবার হাতে ৫ হাজার টাকা দিলে সব মিলিয়ে খরচ হয় ৪১ হাজার টাকা। সংসারের খরচ বহন করতে না পেরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছি। এর মধ্যে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেছে। এতে খাবারসহ সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। কি করব তাই বুঝতে পারছি না।
নয়াবাজারের মুদি ব্যবসায়ী মো. আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহণ ভাড়া বেড়ে গেছে। তাই যেসব পণ্য নতুন করে আনতে হয়েছে, সে সব পণ্যের দাম জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির একদিনের মাথায় দাম বেড়েছে। আর যেসব পণ্য আগে আনা আছে, সেগুলোর দাম এখনও বাড়েনি। ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির যুগান্তরকে বলেন, তেল সংকটের সময় তখন ৫-৭ হাজার টাকা ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। দুদিন আগেও বগুড়া থেকে একটি ট্রাক ঢাকায় আসতে ভাড়া ছিল ১৮-২০ হাজার টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে ২-৩ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণাই মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। কারণ তেলের দাম শুধু পরিবহণ ব্যয়ই বাড়ায় না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ে অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতে। শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির ব্যয়-সবখানেই বাড়বে খরচ। সেই বাড়তি ব্যয়ের শেষ বোঝাটিও বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তাকেই। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। তাই জ্বালানি তেলের মূল্যবদ্ধি প্রভাবে পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ার কথা অসাধুর কারসাজি করে বেশি না বাড়াতে পারে সেদিকে তদারকি সংস্থার নজরদারি করতে হবে।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে নজরদারি জোরদার কার হবে-বাণিজ্যমন্ত্রী : বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখতে বাজার নজরদারি আরও জোরদার করার হবে। সারা বছর নিত্যপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার-এমনটি জানিয়ে তিনি বলেন, এ লক্ষ্যে ব্যবসায়ী সংগঠন, আমদানিকারক, উৎপাদক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো হবে। সোমবার বিকালে সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও মূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা সংক্রান্ত সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে নিয়মিত বাজার পরিস্থিতির খোঁজ রাখার আহ্বান জানিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাজারে মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে নজরদারি ও মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানো হবে। আমদানিকারকদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করে পণ্যের মজুত, আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতিও পর্যালোচনা করা হবে।
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশকেও এর অর্থনৈতিক চাপ বহন করতে হয়। বাজার ও ব্যবসা স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে বিদ্যমান কর কাঠামোর বিভিন্ন দিকও পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি দেশে উৎপাদিত পণ্য এবং যেসব পণ্যের ঋণপত্র বা এলসি ইতোমধ্যে খোলা হয়েছে কিংবা যেগুলো জাহাজীকরণ পর্যায়ে রয়েছে, সেগুলোর তথ্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

