Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

মূল কাজ শুরু হবে ২০২৯ সালে

তিস্তার দুর্বল শাখা বন্ধের চিন্তা

Icon

আরমান হেকিম

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তিস্তার দুর্বল শাখা বন্ধের চিন্তা

Advertisement

তিস্তার দুর্বল শাখা নদীর প্রবাহ বন্ধ করে মূল চ্যানেলকে স্থিতিশীল করার সম্ভাবনা যাচাই করতে যাচ্ছে সরকার। এজন্য শাখা চ্যানেলে আড়াআড়ি কাঠামো নির্মাণ, পলি আটকে রাখা ও নদী খননের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। একই সঙ্গে নদীর প্রবাহ নির্দিষ্ট চ্যানেলে কেন্দ্রীভূত করে ভূমি উদ্ধারের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে। এ কাজে স্থিতিশীল চরে আইনগতভাবে বসবাসরত মানুষকে স্থানান্তর করতে হলে পুনর্বাসন, সামাজিক অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কত ব্যয় হবে, তাও নিরূপণ করা হবে।

তিস্তা অববাহিকার সমন্বিত ও টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রস্তাবনায় এসব বিষয় রেখেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সমীক্ষায় ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। তবে শাখা চ্যানেল বন্ধ, ভূমি উদ্ধার কিংবা বাসিন্দাদের স্থানান্তরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

পাউবোর মহাপরিচালক মো. রুহুল আমিন যুগান্তরকে জানান, কারিগরি কমিটির তৈরি প্রাথমিক ধারণাপত্র পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে বিস্তারিত সমীক্ষা করা হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এটি সমীক্ষা প্রস্তাব। সমীক্ষা শেষ হতে দেড় বছর লাগবে। এর সুপারিশের ভিত্তিতেই তিস্তা ব্যারাজের মূল কাজ এগোবে। অর্থাৎ, মূল কাজ শুরুর জন্য ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। ব্যারাজ নির্মাণে ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের যে হিসাব এখন করা হচ্ছে, তা চূড়ান্ত নয়। প্রকৃত ব্যয় বাড়তে বা কমতে পারে। এগুলো শুধু এখন ধারণা। সূত্র জানায়, সম্ভাব্য সমীক্ষা করতে চীনের সহযোগিতা নেওয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫০ শতাংশ পরামর্শক ও চীনের ৫০ শতাংশ পরামর্শক নেওয়ার ব্যাপারে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে চীন তাদের সিদ্ধান্তের কথা এখনো জানায়নি।

দুর্বল চ্যানেল বন্ধ হবে : সমীক্ষা প্রস্তাবনায় তিস্তার কম সক্রিয় শাখা চ্যানেল বন্ধ বা পরিত্যক্ত করার সম্ভাবনা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। এজন্য আড়াআড়ি কাঠামো বা ক্রসবার নির্মাণ এবং পলি আটকে রাখার উপযোগী ছিদ্রযুক্ত কাঠামোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। লক্ষ্য হলো নদীর প্রবাহ মূল চ্যানেলে কেন্দ্রীভূত করে তার স্থিতিশীলতা বাড়ানো এবং পলি ব্যবস্থাপনার উন্নতি করা।

এছাড়া নদীর বিভিন্ন অংশে খনন ও পুনঃখনন, নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, তীররক্ষা, স্পার বা গ্রোয়েন নির্মাণ এবং বাঁধের অবস্থান নির্ধারণের বিষয়ও সমীক্ষায় থাকবে। বিদ্যমান নদীশাসন কাঠামোর অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।

কোথায় শাখা চ্যানেল বন্ধ হবে, কী ধরনের কাঠামো নির্মাণ করা হবে কিংবা কতটুকু নদী খনন করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কারিগরি কার্যকারিতা, ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব ও সামাজিক পরিণতি বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত বিকল্প সুপারিশ করা হবে।

ভূমি উদ্ধারে স্থানান্তর হতে পারে বাসিন্দারা : নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, খনন ও মূল চ্যানেলে পানি কেন্দ্রীভূত করে ভূমি উদ্ধারের সম্ভাবনাও যাচাই করা হবে। উদ্ধারযোগ্য জমির ব্যবহার নির্ধারণে ভূমি ব্যবহারের মানচিত্র ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কোন জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং কোনটি সরকারি, তা চিহ্নিত করা হবে।

দীর্ঘদিন ধরে স্থিতিশীল চরে আইনগতভাবে বসবাসরত মানুষকে স্থানান্তর করতে হলে সম্ভাব্য ব্যয় নিরূপণ করা হবে। তাদের জন্য সামাজিক অবকাঠামো, কমিউনিটি সুবিধা ও ইউটিলিটি সেবা পুনঃপ্রতিষ্ঠার খরচও হিসাবের আওতায় আসবে। প্রয়োজনে পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনা ও ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা তৈরির বিষয়ও রয়েছে।

তবে প্রস্তাবনায় কোনো নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের উচ্ছেদ বা স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেই। এসব বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে সমীক্ষার ফলাফল ও সরকারের অনুমোদনের ওপর।

শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটও বিবেচনায় : বর্ষায় অতিরিক্ত পানি, বন্যা ও নদীভাঙন এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট তিস্তা ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে রয়েছে পলি জমা, চর সৃষ্টি ও নদীর গতিপথ পরিবর্তন। এসব সমস্যা মোকাবিলায় পানি সংরক্ষণ, প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও নদীশাসনের বিভিন্ন বিকল্প যাচাই করা হবে।

প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩১৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশ প্রায় ১২০ কিলোমিটার। অববাহিকার আয়তন ১১ হাজার ২৫২ বর্গকিলোমিটার। নদীটি বছরে প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ টন পলি বহন করে। শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ কমে যাওয়ায় পলি বহনের সক্ষমতা হ্রাস পায়। এতে নদীর তলদেশ উঁচু হওয়া, চ্যানেল সংকুচিত হওয়া ও চর স্থিতিশীল হওয়ার পাশাপাশি কোথাও কোথাও তীরভাঙনের ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে বর্ষায় বিপুল পানি ও পলির প্রবাহে বন্যা, গতিপথ পরিবর্তন এবং কৃষিজমি ও অবকাঠামোর ক্ষতি হতে পারে।

তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প চালু হয় ১৯৯০ সালে। এর পরিকল্পিত কমান্ড এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর এবং সেচযোগ্য এলাকা ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে নির্ভরযোগ্য পানির ঘাটতি ও পলি জমার কারণে সেচ কার্যক্রম সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে বলে প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপযুক্ত স্থানে পানি সংরক্ষণ, প্রবাহ সরিয়ে নেওয়া এবং অববাহিকার অন্য নদীর সঙ্গে বিদ্যমান খাল নেটওয়ার্কের সংযোগ উন্নত করার সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হবে। তিস্তা ব্যারাজের সেচসুবিধা বাড়ানো এবং ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থিত পানির ব্যবহার সমন্বয়ের বিষয়ও বিবেচনায় থাকবে।

সরকারি অর্থায়নে দুই ধাপে হবে সমীক্ষা : প্রস্তাব অনুযায়ী, সমীক্ষার মেয়াদ ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে ২০২৮ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত। ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। পুরো অর্থ সরকারি তহবিল থেকে জোগানের প্রস্তাব রয়েছে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষার পাশাপাশি ভৌত মডেলিংয়ের ব্যয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত।

সমীক্ষার প্রথম ধাপে নদীর পানিপ্রবাহ, পলি, ভাঙন, বন্যা, ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থা, সেচের চাহিদা ও পরিবেশগত পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে ভৌত মডেলিংয়ের মাধ্যমে প্রস্তাবিত কাঠামোর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে।

কম, মাঝারি ও বেশি প্রবাহের পরিস্থিতিতে কাঠামোর স্থিতিশীলতা, পলি জমা, নদীর তলদেশের পরিবর্তন, ভাঙন এবং উজান-ভাটিতে সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই করা হবে। চরম বন্যায় নদীশাসন ও তীররক্ষা কাঠামো কতটা কার্যকর থাকবে, তাও পরীক্ষা করা হবে। এসব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বিভিন্ন বিকল্পের ব্যয়, অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা ও সম্ভাব্য প্রভাব তুলনা করে সুপারিশ দেওয়া হবে।

পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নে জলজ আবাসস্থল, মৎস্যসম্পদ, জলাভূমি এবং পরিবেশগত প্রবাহ বিবেচনায় থাকবে। তিস্তা আন্তঃসীমান্ত নদী হওয়ায় পানিবণ্টনের বিদ্যমান পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিনিময়, যৌথ পর্যবেক্ষণ ও বন্যার পূর্বাভাসের বিষয়ও পর্যালোচনা করা হবে।

সমীক্ষা শেষে নদী ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিকল্পের বিস্তারিত নকশা, ব্যয় প্রাক্কলন এবং স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা তৈরির কথা রয়েছে। নদীতে অবৈধ দখল ও পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টিকারী স্থাপনার তালিকা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নির্ধারণও কর্মপরিধির অংশ।

পরামর্শক নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয় : প্রস্তাবনায় সমীক্ষার প্রথম অংশের পরামর্শক হিসাবে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম), সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস), পানিসম্পদ প্রকৌশল (ডব্লিউআরই) এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফএম) নাম রয়েছে। ভৌত মডেলিংয়ের জন্য রিভার রিসার্চ ইনস্টিটিউট (আরআরআই), ডব্লিউআরই ও আইডব্লিউএফএম-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

পাউবো মহাপরিচালক জানান, বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশকে পরামর্শক সহায়তা দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। নেদারল্যান্ডস ও চীনের বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কোন দেশকে চূড়ান্ত করা হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

তিনি বলেন, বর্ষার শেষদিকে পানি ধরে রাখা গেলে শুষ্ক মৌসুমে সেই পানি সেচে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। এছাড়া তিস্তা ব্যারাজের খাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে অববাহিকার অন্যান্য নদীর সংযোগ স্থাপনের সম্ভাবনাও সমীক্ষায় বিবেচনা করা হবে। শাখা বন্ধ করার পরিবর্তে সেগুলো সেচের পানি জমা রাখার কাজে ব্যবহার করার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

মূল কাজ শুরু হবে ২০২৯ সালে তিস্তার দুর্বল শাখা বন্ধের চিন্তা

তিস্তার দুর্বল শাখা বন্ধের চিন্তা

আজ অবিস্মরণীয় ৭ নভেম্বর ‘আমি জিয়া বলছি’

‘আমি জিয়া বলছি’

জামায়াত-এনসিপি টানাপোড়েন দূরত্ব নাকি কৌশল

দূরত্ব নাকি কৌশল

ট্রাম্পের ধস : বাংলাদেশের লাভক্ষতি নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনার সুযোগ

নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনার সুযোগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম