Logo
Logo
×

Advertisement

প্রথম পাতা

ট্রাম্পের ধস : বাংলাদেশের লাভক্ষতি

নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনার সুযোগ

Icon

হক ফারুক আহমেদ

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নীল রঙের প্লাবনে ভেসে গেছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের স্বপ্ন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেট-দুই জায়গাতেই পরাজিত হয়েছেন। ডেমোক্র্যাটদের অভূতপূর্ব বিজয়ে ট্রাম্প সামাজ্য এখন তছনছ হওয়ার পথে। হঠাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির এই মোড় পালটে দিচ্ছে সব হিসাব-নিকাশ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে এখন মূলত তার প্রেসিডেন্সির ক্ষমতা ছাড়া এককভাবে তেমন কিছুই করার নেই। বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাকে সিনেটের সমর্থন নিতে হবে। ফলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহার করে ইসরাইলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ইরানে যুদ্ধ চালিয়ে যাবেন নাকি বিশ্বশান্তি ও নিজ দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে কাজ করবেন সেটি এখন দেখার বিষয়।

বিশ্ব রাজনীতি ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী এই নির্বাচনের ফল মূলত ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের সুস্পষ্ট অবস্থানের প্রকাশ। মার্কিন রাজনীতির বিশেষ এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তড়িঘড়ি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তি নতুন করে পর্যালোচনা করা উচিত। ডোনাল্ড ট্রাম্প যে কঠোর অভিবাসন নীতি গ্রহণ করেছিলেন সেখান থেকে সরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে ডেমোক্র্যাটদের বর্তমান বিজয়ের ফলে। এতে দেশটিতে অভিবাসনপ্রত্যাশী অনেক বাংলাদেশির জন্য নতুন করে সুযোগ সৃষ্টি হবে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ব্লু সুনামির কথা বলা হচ্ছে। এই ব্লু সুনামিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জোরালোভাবে আমেরিকার জনগণ বিশেষ করে তরুণরা বুঝিয়ে দিয়েছেন তারা যুদ্ধের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনে ইসরাইলের পক্ষে যে অস্ত্র সুবিধা দেওয়া এবং গাজায় যে গণহত্যা চলছে তার বিরুদ্ধেও তারা স্পষ্ট অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন এই নির্বাচনের মাধ্যমে।

তিনি বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য নতুন করে সুযোগ তৈরি হতে পারে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করা হয়েছে তা নিয়ে সমালোচনা আছে। এই চুক্তিকে সামনে রেখে দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। সেই জায়গায় নতুন করে এই চুক্তিটি পর্যালোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। শুল্কের বিষয়ে যদি পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় তাহলে তা বাংলাদেশ লাভবান হবে। তবে এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ভোটের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কি ধরনের পরিবর্তন আসে সেটি আগে দেখতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার পর ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা আসে। সেই সময় বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ বাড়তি শুল্ক আরোপের কথা জানানো হয়। পরে সেটি ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে (এআরটি) সই করে। এই চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত পালটা শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাঁচামাল (তুলা ও কৃত্রিম তন্তু) আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানির ক্ষেত্রে কোনো পালটা শুল্ক দিতে হবে না বলে শর্ত যুক্ত করা হয়।

বিনিময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩৭০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য, ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানি পণ্য এবং বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম কেনার অঙ্গীকার করে। অন্যদেশ থেকে বাংলাদেশের কেনাকাটার ক্ষেত্রেও কিছু শর্ত আরোপ করা হয়।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস স্টাডিজের পরিচালক অধ্যাপক ড. এম জসিম উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানের যে পরাজয় এটি আসলে গণতন্ত্রের বিজয়। আমেরিকার জনগণ তাদের সুবিবেচনার পরিচয় দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই পরাজয়ের কারণ ইরান যুদ্ধ। জনগণ সে যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের রায় দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যেই তারেক রহমানের নতুন সরকার শুরতেই বিড়ম্বনার শিকার হয়। বিশেষ করে এলএনজি এবং তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি আমাদের বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখন যদি যুদ্ধের উত্তেজনাটা কমে আসে তাহলে অবশ্যই তেল আমদানি ব্যয় বা বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়টা কমবে। ট্রাম্পের এই পরাজয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনগণ এবং ছাত্রছাত্রী যারা আমেরিকায় উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে চায়, যাদের আত্মীয়স্বজনরা আমেরিকা বসবাস করে এবং যারা পরবর্তীতে আমেরিকায় ইমিগ্রেন্ট হতে চান তাদের স্বস্তি দিচ্ছে। এক ধরনের উল্লাস তারা প্রকাশ করেছেন। কারণ ট্রাম্প ইমিগ্রেন্ট পলিসি জটিল করেছে। তাদের ভেতরে এখন একটা আসার সঞ্চার হবে যে, যদি ডেমোক্র্যাটরা পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে হয়তো এই পলিসি অনেকটা সহজ হবে। ট্রাম্পের এই পরাজয় পরে ডেমোক্র্যাট পার্টির একটা বিজয়ের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করছে। আগামী দুই বছর পর যে প্রেসিডেনশিয়াল ইলেকশনটা হবে তার জন্য আমাদের সরকার দুইটা দলের সঙ্গেই সম্পর্ক বৃদ্ধির চেষ্টা করবে। ট্রাম্প প্রশাসন ইউএস এইডসহ নানা সংস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন সহায়তা বন্ধ করেছিল। সেগুলো আবার চালু হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ এসব সংস্থা থেকে জরুরি সব সহায়তা পেত।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান চুক্তিগুলো বিশেষ করে বাণিজ্য চুক্তি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের স্বার্থে পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষে জয়ী হয়েছেন বলেই তারা তাদের স্বার্থ ছেড়ে দেবেন এমন নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক ও সম্পর্কের উন্নয়ন চাইলে রিভিউর মাধ্যমে দুই পক্ষেরই উইন-উইন পর্যায় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মার্কিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কংগ্রেসের দুই কক্ষে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও ফেডারেল শাসন ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা অত্যন্ত শক্তিশালী থাকে। ট্রাম্পের অবশিষ্ট মেয়াদে ট্যারিফ নীতি সংশোধন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনের মতো বিষয়গুলো দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে সমাধান করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আগের মতো কোনো নিয়মনীতি না মেনে তার ক্ষমতার ব্যবহার চালিয়ে যান কিনা সেটি দেখার বিষয়। এর আগে দুবার ট্রাম্পকে অভিশংসনের উদ্যোগ এসেছিল। এবার সেটি আরও জোরালোভাবে হতে পারে।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

মূল কাজ শুরু হবে ২০২৯ সালে তিস্তার দুর্বল শাখা বন্ধের চিন্তা

তিস্তার দুর্বল শাখা বন্ধের চিন্তা

আজ অবিস্মরণীয় ৭ নভেম্বর ‘আমি জিয়া বলছি’

‘আমি জিয়া বলছি’

জামায়াত-এনসিপি টানাপোড়েন দূরত্ব নাকি কৌশল

দূরত্ব নাকি কৌশল

ট্রাম্পের ধস : বাংলাদেশের লাভক্ষতি নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনার সুযোগ

নতুন করে বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনার সুযোগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম